ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মেঘালয়ে টানা মাঝারি থেকে ভারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একইসঙ্গে সিলেট অঞ্চলে গত ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাতে আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বন্যা হলেও এটি দীর্ঘস্থায়ী হবে না বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
মেঘালয়ের আবহাওয়া অফিসের তথ্যানুসারে, গত ২৪ ঘণ্টায় রাজ্যটির বিভিন্ন স্থানে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে সোহরা (চেরাপুঞ্জি) এলাকায় ৭২ দশমিক ২ মিলিমিটার। শিলংয়ে ২১ দশমিক ৬ মিলিমিটার এবং বারাপানিতে ১৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
ভৌগলিকভাবে মেঘালয়ের সোহরা ও খাসি পাহাড়ি অঞ্চলের টানা বৃষ্টি সিলেটের নদ-নদী ব্যবস্থার জন্য সরাসরি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ উজান থেকে নেমে আসা পানি সুরমা, কুশিয়ারা ও অন্যান্য পাহাড়ি নদীর প্রবাহ দ্রুত বাড়িয়ে দেয়, যা স্বল্প সময়ে আকস্মিক বন্যার পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। সেখানের আবহাওয়া পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২৬ ও ২৭ মে মেঘালয়ের অধিকাংশ এলাকায় মাঝারি ধরনের বৃষ্টি হতে পারে। কোথাও কোথাও ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার বেগে দমকা হাওয়াসহ বজ্রপাত এবং ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। ২৮ ও ২৯ মে পর্যন্তও বিভিন্ন এলাকায় বজ্রসহ বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে।
অন্যদিকে, গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেট জেলায় সর্বোচ্চ ১১১ দশমিক ২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস। তাছাড়া পাউবোর দেয়া জেলাভিত্তিক তথ্যনুযায়ী, হবিগঞ্জে ৮২ মিলিমিটার, সুনামগঞ্জে ৬৫ মিলিমিটার এবং মৌলভীবাজারে ৪৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়।
এদিকে সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের মঙ্গলবার (২৬ মে) দুপুর ৩টার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সিলেট জেলার বিভিন্ন নদ-নদীর পানি ক্রমাগত বেড়েই চলতেছে। সুরমা নদীর কানাইঘাট পয়েন্টে পানি ১১ দশমিক শূন্য মিটার রেকর্ড করা হয়েছে, যেখানে বিপৎসীমা ১২ দশমিক ৭৫ মিটার। একই নদীর সিলেট পয়েন্টে পানি ৮ দশমিক ৪৭ মিটার, বিপৎসীমা ১০ দশমিক ৮০ মিটার। কুশিয়ারা নদীর অমলশীদ পয়েন্টে পানি ১২ দশমিক ৬৪ মিটার, বিপৎসীমা ১৫ দশমিক ৮০ মিটার। শেওলা পয়েন্টে পানি ১০ দশমিক ৪৩ মিটার, বিপৎসীমা ১৩ দশমিক ০৫ মিটার। ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে পানি ৮ দশমিক ৬১ মিটার, বিপৎসীমা ১০ দশমিক ৮৫ মিটার। শেরপুর পয়েন্টে পানি ৭ দশমিক ৪৮ মিটার, বিপৎসীমা ৮ দশমিক ৫৫ মিটার।
সারিগোয়াইন নদীর সারিঘাট পয়েন্টে পানি ৮ দশমিক ৯০ মিটার, বিপৎসীমা ১২ দশমিক ৩৫ মিটার। পিয়াইন নদীর জাফলং পয়েন্টে পানি ৮ দশমিক ১০ মিটার, বিপৎসীমা ১৩ দশমিক শূন্য মিটার। গোয়াইনঘাট পয়েন্টে পানি ৭ দশমিক ৮৬ মিটার, বিপৎসীমা ১০ দশমিক ৮২ মিটার। লোভাছড়া নদীর লোভাছড়া পয়েন্টে পানি ১১ দশমিক ৪২ মিটার এবং ধলা নদীর ইসলামপুর পয়েন্টে পানি ৭ দশমিক ২৯ মিটার রেকর্ড করা হয়েছে। তবে এখনো কোনো নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি।
স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড ও আবহাওয়া কর্মকর্তারা বলছেন, উজানের মেঘালয় থেকে নেমে আসা ঢল এবং সিলেটের অভ্যন্তরীণ ভারী বৃষ্টি একসঙ্গে মিলিত হলে আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়তে পারে। এতে সিলেটের সীমান্তবর্তী নিচু এলাকা, হাওরাঞ্চল এবং নদীতীরবর্তী গ্রামগুলোতে জলাবদ্ধতা ও আকস্মিক বন্যা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
সিলেট আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল মুঈদ বলেন, সিলেটে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা অব্যাহত থাকবে এবং উজানের মেঘালয় থেকে নেমে আসা পানির কারণে নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ২৬ মে থেকে ৩০ মে পর্যন্ত সিলেট বিভাগে মাঝারি থেকে ভারি বৃষ্টির পাশাপাশি কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে বজ্রপাত ও দমকা হাওয়ার ঘটনাও ঘটতে পারে।
সিলেট পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ দাস বলেন, ভারতের উজানের ভারি বৃষ্টিপাতের জন্য পাহাড়ি ঢল সিলেট অঞ্চলের নদীগুলোতে এসে পড়ছে, তাছাড়া সিলেটেও টানা বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। এতে করে যদি উজানে ঢল আর বৃষ্টিপাত চলমান থাকে তাহলে সিলেটে আকস্মিক বন্যা শঙ্কা রয়েছে।
তিনি জানান, আকস্মিক বন্যা হলেও এটি হবে স্বল্পমেয়াদি, পানি নেমে যাবে দ্রুতই।