সারা বাংলা

রংপুরে কোরবানির হাটে বিক্রেতাদের হাহাকার: ভিড় আছে, ক্রেতা নেই

ঈদুল আজহা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে জমে উঠেছে রংপুর বিভাগের কোরবানির পশুর হাটগুলো। জেলার বড় বড় হাটগুলোতে শেষ সময়ে এখন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে ক্রেতা-বিক্রেতাদের দরদাম, হাঁকডাক আর পশু দেখার ভিড়। দেশি, শংকর ও বিভিন্ন উন্নত জাতের গরু-ছাগলে ভরে উঠেছে হাটের মাঠ।

তবে আর দুদিন পরে ঈদ। এই সময়ে হাটগুলোতে মানুষের উপস্থিতি ও পশুর আমদানি বাড়লেও গত বছরের তুলনায় বেচাকেনা কম বলে জানিয়েছেন খামারি ও ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে উত্তরাঞ্চলে কৃষিতে লোকসান, আলুর দামে ধস এবং বৈরী আবহাওয়ায় এই অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতির দুর্বলতার প্রভাব এবার সরাসরি পড়েছে কোরবানির বাজারে।

রংপুরের ঐতিহ্যবাহী লালবাগ, বেতগাড়ি, পাওটানা, পালিচড়া, বুড়িরহাট ও শঠিবাড়ি হাট ঘুরে দেখা গেছে, পশুর সারি আর মানুষের ভিড়ে জমজমাট পরিবেশ তৈরি হলেও কাঙ্ক্ষিত বেচাকেনা হচ্ছে না। অনেকে দাম যাচাই করছেন, আবার অনেকে উৎসুক জনতা হিসেবে পশু দেখতেই স্বাচ্ছন্দবোধ করছেন। এতসব মানুষের ভিড়ে প্রকৃত ক্রেতার সংখ্যা খুবই কম।

হাটগুলোতে গরু নিয়ে আসা খামারিদের মতে, কৃষিভিত্তিক উত্তরাঞ্চলের মানুষের বড় একটি অংশ গেল এক বছর ধরে অর্থনৈতিক চাপে রয়েছে। বিশেষ করে আলুর বাজারে ধস নামায় অনেক কৃষক বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এর প্রভাব পড়েছে কোরবানির সক্ষমতার ওপরও।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও খামার সংশ্লিষ্টরা জানান, এবার কৃষি অর্থনীতিতে মূল্য ধসের কারণে রংপুর অঞ্চলের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ কোরবানি দেওয়ার সক্ষমতা হারিয়েছেন। ফলে হাটে ভিড় থাকলেও প্রকৃত ক্রেতার সংখ্যা শেষ মুহূর্তেও তুলনামূলক কম। যারা গরুর দরদাম করছেন তাদের অধিকাংশ মানুষ চাকরিজীবী কিংবা ব্যবসায়ী।

মঙ্গলবার (২৬ মে) বিকেলে রংপুরের গংগাছড়া উপজেলার সর্ববৃহৎ পশুর হাট বেতগাড়ি ঘুরে দেখা গেছে, হাটটিতে প্রায় চার থেকে পাঁচ হাজার কোরবানির পশু উঠেছে। জমজমাট হাটটিতে গত কয়েকদিনের তুলনায় আজকে বেচা-কেনা কিছুটা বেশি, তবে গেল বছর তুলনায় রেশিও হারে অনেক কম বলে জানা যায়।

এই হাটে আসা নগরীর আজমল নামে এক ব্যবসায়ী বলেন, “মানুষ হাটে আসছে, গরু দেখছে; কিন্তু আগের মতো কিনছে না। অনেকেই বাজেট কমিয়ে ছোট গরুর দিকে ঝুঁকছেন। বাড়িতে পালন করা কোরবানির জন্য প্রস্তুতকৃত তিনটি গরু নিয়ে এসেছেন, এখনো একটিও বেচা হয়নি বলে জানান তিনি। গো-খাদ্যের দামের তুলনায় গরুর কাঙ্ক্ষিত মূল্য মিলছে না বলে দাবি তার।

অন্যদিকে ক্রেতাদের দাবি, গত বছরের তুলনায় এবারে কোরবানির পশুর দাম অনেক বেশি। তাই সামর্থের মধ্যে অনেক যাচাই করেও মিলছে না গরু। তাই ঘুরছেন সময় নিয়ে। 

এদিকে, রংপুরের তিস্তা নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলগুলোতে পরিস্থিতি আরো কঠিন। স্থানীয়দের মতে, এসব এলাকায় মানুষের আয় কমে যাওয়ায় কোরবানি দেওয়ার সক্ষমতা নেমে এসেছে প্রায় ৫ শতাংশে। 

চরাঞ্চলের এক বাসিন্দা বলেন, “আগে প্রতি বাড়িতে কোরবানি হতো। এখন কয়েকটি পরিবার মিলে একটি গরু দিচ্ছে। অনেকের ঘরে খাবার চালাতেই কষ্ট হচ্ছে।”

বেতগাড়ি হাট ইজারাদার স্বপন মিয়া জানান, চড়া দামে কোরবানির হাট ইজারা নিয়ে এবার কাঙ্ক্ষিত আয় হবে কিনা তা নিয়ে শঙ্কিত তিনি। তার মতে, গত বছর কোরবানির হাটের ১৫ দিনে বেচাবিক্রি ছিল বেশ ভালো। কিন্তু এবারে কোরবানির ঈদের শেষ মুহূর্তেও হচ্ছে না কাঙ্ক্ষিত বেচাকেনা। হাটগুলোতে বিগত সময়ের তুলনায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেচাকেনা কমেছে বলে দাবি তার।

রংপুর বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ আব্দুল হাই সরকার জানান, রংপুর অঞ্চলের চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত থাকবে সাড়ে পাঁচ লাখের বেশি পশু। এসব পশু দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হচ্ছে। তার মতে, কোরবানির পশু বেচা-কেনাকে কেন্দ্র করে এবার রংপুর বিভাগের অর্থনীতিতে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা যুক্ত হতে পারে।