সারা বাংলা

খুমেক হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ড: বন্ধ অপারেশন, ঝুঁকিতে রোগীরা 

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পোস্ট অপারেটিভ স্টোরে আগুন লাগার ১২ দিন পরও শুরু হয়নি মেরামত কাজ। বন্ধ রয়েছে অপারেশন। ফলে প্রতিদিন শত শত রোগী ও তাদের স্বজনরা চরম অনিশ্চয়তা ও দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। যেসব রোগী দীর্ঘদিন অপেক্ষা করে অস্ত্রোপচারের তারিখ পেয়েছিলেন, তাদের অনেকের অপারেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত হয়ে গেছে। চিকিৎসকরা বলছেন, সময়মতো অস্ত্রোপচার না হওয়ায় অনেক রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটছে। 

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, আগুনের ঘটনায় অপারেশন থিয়েটার এবং পোস্ট অপারেটিভ ইউনিটের অক্সিজেন লাইনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওই দিন থেকে হাসপাতালে জরুরি এবং চোখের অপারেশন থিয়েটার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়, এছাড়া অক্সিজেন বন্ধ থাকায় ব্যবহার অনুপোযোগী হয়েছে পোস্ট অপারেটিভ ইউনিট। ফলে শত শত মুমূর্ষু রোগী অপারেশনের অপেক্ষায় মৃত্যুঝুঁকিতে রয়েছে। 

আরো পড়ুন: খুলনা মেডিকেলে আগুন, ১০ ইউনিটের চেষ্টায় নিয়ন্ত্রণে 

সোমবার (১ জুন) হাসপাতালের সার্জারি, নিউরোসার্জারি, ইউরোলজি, বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগ ঘুরে দেখা যায়, শত শত রোগী এখানে অপারেশনের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন। প্রতিদিন অসংখ্য রোগী অপারেশনের জন্য হাসপাতালে আসছেন। কিন্তু ওটি সচল না থাকায় তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে কিংবা নতুন তারিখের আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে অনেক রোগী দূর-দূরান্তের জেলা থেকে এসেছেন।

রোগীদের কেউ জমি বিক্রি করে, কেউ ধারদেনা করে চিকিৎসার খরচ জোগাড় করেছেন। হাসপাতালের বেডে বা বারান্দায় শুয়ে থেকে সব টাকা শেষ হয়ে গেছে তাদের। এখন অপারেশনের ওষুধ কেনার টাকা অনেকের হাতে নেই।

সাতক্ষীরা থেকে আসা শহিদুল ইসলাম বলেন, ‍“দুই মাস আগে অপারেশনের তারিখ পেয়েছিলাম। সব প্রস্তুতি নিয়ে হাসপাতালে আসার পর জানতে পারি অপারেশন হবে না। কবে হবে কেউ বলতে পারছে না। শরীরের অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে।”

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি ওয়ার্ড

দেড় মাস আগে বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ থেকে ব্রেন টিউমারের অপারেশন করতে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এছার জোমাদ্দার (৩৫) বলেন, “অপারেশন তো হয়নি বরং মুমূর্ষু অবস্থায় এখন রেফার্ড করা হয়েছে ঢাকা মেডিকেলে।” তিনি জানান, চিকিৎসা খরচ তো দূরের কথা অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় নেওয়ার ভাড়াও নেই দিনমজুর বাবা তোফাজ্জাল জোমাদ্দারের কাছে। ফলে কি করবেন- ভেবে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। 

অপরদিকে, রামপাল থেকে নাইচ নার্ভের অপারেশন করাতে এক মাসেরও বেশি সময় আগে ভর্তি হওয়া রোগী সুলতানা আক্তার বলেন, “তিন বছরের শিশু সন্তান নিয়ে আমার স্বামীও বাড়িঘর ছেড়ে হাসপাতালে থাকছেন। অপারেশনের তারিখ নির্ধারিত ছিল ২০ মে বুধবার। সেইদিনই হাসপাতালে আগুন লাগায় অপারেশন কবে হবে, তা বলতে পারছে না কেউ। ফলে কি করব বুঝতে পারছি না।” 

এভাবে শুধু এছার, জোমাদ্দার বা সুলতানা নয়, অপারেশনের অপেক্ষায় রয়েছেন শতাধিক রোগী। 

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এনেস্থেশিয়া বিভাগের বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. দিলিপ কুন্ডু বলেন, “অপারেশন থিয়েটার ঠিকই আছে খুব বেশি ক্ষতি হয়নি। শুধু অক্সিজেনের পাইপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যার লাইনও বাইরে থেকে নেওয়া, দেয়ালের ভিতর থেকে না।” 

এতো সময় লাগবে কেন এমন প্রশ্ন তুলে তিন বলেন, “একটা অপারেশন থিয়েটার চালু আছে, কিন্তু পোস্ট অপারেটিভ চালু না থাকায় আইসিইউ থেকে মোট ছয়টি বেড নিয়ে পোস্ট অপারেটিভ হিসাবে চালাচ্ছি। এতে আইসিইউ রোগীদের সংকট তৈরি হয়েছে।”

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান আবু বক্কর সিদ্দিকী বলেন, “আমরা প্রতিনিয়ত হাসপাতাল পরিচালককে জানিয়েছি যে, অপারেশন করতে পারছি না। তারা আমাদের গণপূর্তের কথা  বলেন। কবে রোগীদের অপারেশন করতে পারব তাও বুঝতে পারছি না। এতে অনেক রোগীর অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে।”

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. কাজী আইনুল ইসলাম বলেন, “আমরা গণপূর্ত অধিদপ্তরের সঙ্গে কথা বলেছি। এখনো আমি নির্বাহী প্রকৌশলী দুইজনের সঙ্গে কথা বলেছি, তাদে একজন বললো, অ্যাসেসমেন্ট শেষ শিগগিরি কাজ শুরু হবে।” 

খুলনা গণপূর্ত বিভাগ-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল হালিম বলেন, “মঙ্গলবার থেকে কাজ শুরু হবে। আমাদের অ্যাসেসমেন্ট সব শেষ হয়েছে। আশা করছি, খুব দ্রুত কাজ শেষ করে অপারেশন থিয়েটার চালু করতে পারব।”

গত ২০ মে খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালের প্রধান ভবনের তৃতীয় তলায় (অপারেশন থিয়েটার সংলগ্ন স্টোররুমে) অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এ সময় তাড়াহুড়ো করে রোগী সরানোর সময় এক আইসিইউ রোগীর মৃত্যু হয়। এছাড়া তীব্র ধোঁয়ার কারণে অক্সিজেন লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সব সার্জিক্যাল অপারেশন সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়।