প্রকৃতির নিয়মানুযায়ী আবারও বর্ষাকাল এসে কড়া নেড়েছে আমাদের ভূবনে। জানান দিচ্ছে হঠাৎ করে আকাশ কালো মেঘে ছেয়ে যাওয়া, আর তার বজ্রকণ্ঠের ধ্বনি। এক ফোটা, আধ ফোটা কিংবা ঝিরিঝিরি বৃষ্টি, কখনও বা ঝুম বৃষ্টি তার উদাহরণ।
এ সময় হৈ-হুল্লোড় পড়ে যায় পাড়ায়, ছোট ছেলেমেয়েরা এদিক সেদিক দৌড়াদৌড়ি করে, মা বলে বাইরে থেকে তাড়াতাড়ি হাঁস মুরগী আর ছাগল নিয়ে আয়। আর অন্য দিকে দুষ্টু ছেলেমেয়েরা টায়ার এবং রিং ঘোরাতে ব্যস্ত কাদাই মাখামাখি করে। তাদের দেখে মনে হচ্ছে বর্ষাকাল আসার সাথে সাথে তাদের খেলাধুলার দিকটাও পূর্ণতা পেলো আজ। অপর দিকে বর্ষাকালে প্রকৃতি ফিরে পায় তার প্রাণ। গাছে গাছে ফুল-ফলে ভরে ওঠে চারদিক।
বর্ষাকাল যেমন চারপাশের পরিবেশকে প্রাণবন্ত করে তোলে, তেমন অপর দিকে দুঃখ বয়ে আনে অনেক। বর্ষাকাল যখন তার সবটুকু দিয়ে চারদিক ভরিয়ে তুলে গ্রামবাংলা কিংবা শহুরে জীবনকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে, তখনও কেন জানি আমার মন বিষণ্নতায় ভোগে। সারাক্ষণ বৃষ্টির দিনে মন খারাপ থাকে। বর্ষার অপরূপ দৃশ্য যেমন মনে কুহক জাগায়, তেমনি ঠিক উল্টো দিকে বিষাদ এনে দেয় মনে। বর্ষা যেমন নতুন শিহরণে জাগরিত করে, আবার ডুবাতেও পারে তার উদারতায়।
হয়তো বর্ষা তার এই মুগ্ধতার কারণে অন্যান্য ঋতু থেকে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে বেশি। যার মায়াবি রূপ আমাদের মোহিত করে, আন্দোলিত করে, করে শিহরিত। এর দর্শনে আমাদের হৃদয়-মন পুলকিত হয়। বিশেষ করে বর্ষায় নদীতে উথালি-পাথালি ঢেউ আমাদের বিমোহিত করে।
এই বর্ষায় আমরা কখনো হারিয়ে যাই সপ্নলোকে, আবার কখনো প্রিয় মানুষের দর্শনলাভে উদগ্রীব হয়ে উঠি। আবার কখনো বা প্রিয়তমার বিচ্ছেদের ব্যথায় বর্ষার বৃষ্টির মতো চোখের জল ঝরতে থাকে কপোল বেয়ে। তখন যেন প্রকৃতি প্রেমিক রবীন্দ্রনাথের সেই গানটি মনে পড়ে ‘এমন দিনে তারে বলা যায়, এমন ঘনঘোর বরিষায়, এমন মেঘস্বরে বাদল ঝরে ঝরে, তপনহীন ঘন তমসায়’।
তেমনি আমার আজি এ বর্ষার দিনে মনে পড়ে তার কথা, একবার শুধু দর্শন লাভ করতে চাই তার মুখখানি। কিন্তু বর্ষার বৃষ্টি যেন কিছুতেই থামে না, তার সাথে যেন আমার আখি-জল একাত্বতা প্রকাশ করেছে।
আমি হয়তো কোনো দিনও আমার প্রিয় মানুষকে না পারবো মহাকবি কালিদাসের মেঘদূত কাব্যের মতো সাজাতে, আর না পাররবা রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দের কবিতা নাটোরের বনলতা সেন কবিতার মতো সাজাতে।
অনেক সময় কবিরা বর্ষাকালকে বিরহের কাল বলেছেন। কারণ বর্ষা নামার সঙ্গে সঙ্গে যেমন মাঠ, ঘাট, প্রান্তর বর্ষার জলে ডুবে যেতো। চলাচলের জন্য সব রাস্তাঘাট বন্ধ হয়ে যেত। প্রবাসী স্বামীরা তাড়াতাড়ি ছুটি নিয়ে ঘরে ফিরে আসত। বণিকেরা ও তাই করতো। নয়তো তাদের অনেকে অনেক দিন পর্যন্ত বাড়ি ফিরতে পারতো না।
বর্ষাকে উপজীব্য করে লেখা হয় অনেক প্রেম-বিরহের গল্প, কবিতা। কিন্তু আমি কোনো গল্প-কবিতা লিখতে না পারার ব্যর্থতার জন্য আমার প্রিয় মানুষকে আমি বর্ষার দিনে মিস করি পল্লী কবি জসীমউদ্দিনের কবিতায়, ‘বেনুবনে বায়ু নাড়ে এলোকেশ, মন যেন কারে চায়।’
কখনো বা বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথের, ‘বর্ষার শেষ দিনে বেজেছিল বেদনার সুর, নীল বেদনায় নুয়ে পড়েছিলো আমার হৃদয়।’ তাহাকে সংজ্ঞায়িত করার মহৎ ব্যর্থ চেষ্টা থেকে যায়, তবুও খুব মিস করি তাকে এ বাদল দিনে, কখনো বা তাকে মিস করি কাজী নজরুলের কবিতায়, ‘আজি বাদল ঝরে মোর একেলা ঘরে, কিংবা শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে।’
দিন দিন বর্ষা তার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জানান দিচ্ছে প্রকৃতিও তার সাথে তাল মিলাচ্ছে। যেমনটি মনে হয় আমার টিনের চালে বৃষ্টির ফোটা এক অনিন্দ্য সুন্দর সুরে ছন্দের সৃষ্টি করেছে।
সময় গেলে সাধন হবে না, ঠিক কিন্তু সময় ঠিকই চলে যাচ্ছে, বর্ষাকালও চলে যাবে তার সময় ফুরিয়ে গেলে। আকাশ থেকে বৃষ্টি না ঝরলেও, আমার চোখের জল ঝরতে থাকবে তখনও। তারপরেও খুব মিস করবো আমার প্রিয় মানুষ, আর ভালোবাসবো নাগরিক কবি সামসুর রাহমানের সেই কবিতারই ভাষায়। তিনি বলেছেন, ‘বর্ষাকে আমি ভালোবাসি প্রিয়জনের মতো করে’।
বর্ষার সময় অতিবাহিত হবে ঠিকই, আমি তখনও হয়তো আমার প্রিয় মানুষকে নিয়ে একটা কবিতাও লিখতে পারবো না। আর কোনো দিনও বড় বড় কবি, সাহিত্যিকদের মতো ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষে পরিণত হতে না পারলেও মন চায় আমার প্রিয়াকে বলতে, হুমায়ূন আহমেদের মতো করে সেই বিখ্যাত গানের সুরে, ‘যদি মন কাঁদে তুমি চলে এসো কোনো এক বর্ষায়।’
কেন জানি বর্ষা বিরহ বাড়ায়! মন আকুল হয়ে ওঠে তোমার কথা ভেবে। খুব ইচ্ছে করে তারে একবার দেখি। একবার তারে বলতে ইচ্ছে করে খুব ভালোবাসি। কিন্তু তার আর আমার মাঝে অনেক বাঁধা বিপত্তি, আর বলা হবে না ভালোবাসি। বিরহের সময় মন পুড়ে যায় আমার। কী লিখি তোমায় আর পাই না খুঁজে কিছু। এমন সময় আবারো বৃষ্টি এসেছে, যে সময় আমার চোখেও এসেছে বারি। শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবি, ওস্তাদ নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরীর গান, ‘আজ এই বৃষ্টির কান্না দেখে মনে পড়ল তোমায়, অশ্রুভরা দুটি চোখ তুমি ব্যথার কাজল লুকিয়ে মেখেছিলে ঐ মুখ।’ খুব মনে পড়ে তোমায়।
যাইহোক সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না নিয়েই আমাদের এ জীবন। সব কিছুর তো শুরু আছে আবার শেষও হয়ে যাবে। কিন্তু প্রিয়াকে আমার মিস করা কখনো হবে না। বর্ষাকালও ঠিক তার মহাসমারোহের যাত্রা শেষ করবে। একটা সময়পর আকাশ আবার হবে পরিষ্কার, উঠবে সোনালী সূর্য।
আসবে নতুন ঋতু, তাই আমি বৃষ্টির দিনে তোমাকে খুব মিস করলেও রবী ঠাকুরের কথার সুরে সুর মিলিয়ে আমাকে বলতে হচ্ছে তার সেই কালজয়ী বিখ্যাত গান, ‘বাদল ধারা হলো সারা বাজে বিদায় সুর/গানের পালা শেষ করে দেরে যাবি অনেক দূর’। খুবই মনে পড়ে তাহারে বৃষ্টির দিনে।
লেখক: শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
ইবি/হাকিম মাহি