দুই বাংলার সমান জনপ্রিয় লেখক সমরেশ মজুমদারের অসাধারণ এক সৃষ্টি ‘কালবেলা’। এটি বিপ্লব ও প্রেমের সমন্বিত এক উপন্যাস। প্রথমবার এই উপন্যাসটি ১৯৮১-৮২ সালে ‘দেশ’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল, যা পরে বই আকারে বের হয়।
সমরেশ মজুমদার ‘কালবেলা’ উপন্যাসটি লিখেছেন ‘উত্তরাধিকার’ উপন্যাসের ধারাবাহিকতায়। অনিমেষের শৈশব থেকে তারুণ্যে পদার্পণের গল্প ‘উত্তরাধিকার’। আর ‘কালবেলা’ অনিমেষের মধ্যজীবনের চড়াই-উৎরাইয়ের কাহিনী। অনিমেষের রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতিফলন পাওয়া যায় এই বইতেই। ১৯৮৪ সালে এই বইয়ের জন্য লেখক পেয়েছেন সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার। বইটি থেকে ২০০৯ সালে ভারতের জনপ্রিয় পরিচালক গৌতম ঘোষ ‘কালবেলা’ সিনেমা নির্মাণ করেন।
‘কালবেলা’ উপন্যাসের পটভূমি অনেক বিস্তৃত। শুধু রাজনীতি নয়, বলতে গেলে পুরো ভারতবর্ষের প্রতিটি বিষয় জুড়েই এর বিস্তার। কাহিনীর শুরু মূলত অনিমেষ কলকাতায় আসার পরই। শুধু বাবা আর দাদার স্বপ্ন পূরণে নয় নিজের আগ্রহের প্রয়োজনেই স্কুল পাসের পর কলেজে ভর্তি হতে কলকাতায় আসে অনিমেষ।
যখন সে প্রথম এসেছিল এ শহরে, সেই প্রথম দিন আন্দোলনের আগুন জ্বলছিল কলকাতায়। সে মুখোমুখি হলো এক দুর্ঘটনার। প্রথম দিনের দুর্ঘটনাটি শুধু তার শরীরে নয়, তার আসন্ন সমগ্রজীবনে গভীর ক্ষত রেখে গিয়েছিল। তার পড়াশোনার একটা বছরও সেজন্যই বাদ দিতে হয়। রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার আগেই আন্দোলনের ভয়াবহ আচড় আঘাত করে অনিমেষকে। কলেজ জীবনে রাজনীতি থেকে দূরেই ছিল অনিমেষ। সে কখনোই ভাবেনি রাজনীতি বা কোনো আন্দোলনে সক্রিয় অংশ নেবে, কিন্তু পরিস্থিতি নিজের আদর্শ-মূল্যবোধ আর সময়ের চাপে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে নিজের অজান্তেই সে সক্রিয় হয় দোদুল্যমান রাজনীতিতে।
পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে তখন, সদ্য ক্ষমতায় সিপিআই। মার্ক্সবাদী কম্যুনিস্টদের দাপট তখন তুঙ্গে। সেসময় ছাত্র ইউনিয়নের হালচালের ব্যাপারে আনাড়ি অনিমেষের পরিচয় হয় সুবাসের সাথে, অনিমেষের জন্য প্রথম দিকটায় যে ভূমিকা নেয় পথপ্রদর্শকের। সেই স্কুল জীবনেই মন থেকে কংগ্রেস ত্যাগ করা অনিমেষের মনে ছাপ ফেলে কম্যুনিজম নিয়ে সুবাসের মতাদর্শ। সুবাসই অনিমেষকে দলের অন্যদের সাথে দেখা করিয়ে দেয়।
অনিমেষের পরিচয় হয় ইউনিভার্সিটির কম্যুনিস্ট পার্টির নেতা বিমানের সাথে। বিমান পার্টির প্রয়োজনে অনিমেষের শারীরিক ক্ষতটাকে সাধারণ মানুষের সামনে ব্যবহার করেছিল। অনিমেষ যদিও তখন নিজস্ব আদর্শ ইচ্ছা আর চিন্তাধারার উপর ভিত্তি করে নিজেকে কম্যুনিস্টই মনে করছিল, তারপরও প্রায়ই বিমান এবং দলের অন্যদের সাথে তার মতভেদ দেখা দিতো। যেসব কারণে মন থেকে কংগ্রেসের প্রতি আস্থা হারায় সেইসব বিষয়গুলোর ছায়া যেন সে কম্যুনিস্ট পার্টিতেও দেখতে পেত। নিজস্ব মূল্যবোধের সাথে কম্যুনিস্ট পার্টির তাত্ত্বিক মিল থাকলেও প্রয়োগে যে সন্দেহের উৎপত্তি তাতে সক্রিয় হতে তার মনে কোথায় যেনো খুব বাঁধত।
রাজনীতিতে যখন অনিমেষ ধীরে ধীরে গভীরভাবে পা বাড়াচ্ছে ঠিক তখনই তার জীবনে এলো সহপাঠী মাধবীলতা, শুরুতে অনিমেষের কাছে যে ছিল অজানা অচেনা এক দুর্বার আকর্ষণ! যখন তাদের কথা হলো, তখন অনিমেষ উপলব্ধি করল, এ মেয়েটি সহজ নয়। তার নিজস্ব বেশ দৃঢ় আদর্শ ও মতামত রয়েছে এবং সেগুলো প্রকাশে সে প্রচণ্ড স্পষ্ট।
প্রণয়ের আগে বিশেষ করে ছাত্র ইউনিয়নের বিভিন্ন বিক্ষোভ মিছিল বা অন্যান্য কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মাধবীলতা সবসময়ই অনিমেষের দল ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন করতো, বিভিন্ন সন্দেহ প্রকাশ করতো। কিন্তু মনে প্রাণে অনিমেষকে গ্রহণ করার পর অনিবার্য পরিণতি সম্পর্কে অবহিত হওয়ার পরও কখনো অনিমেষের জীবনে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়নি, বাঁধা দেওয়ার কথা ভাবেনি মাধবীলতা। বরং শেকড়ছেড়া অনিমেষকে ভালোবেসে জীবনের সর্বস্ব ত্যাগ করেছিল। মাধবীলতা ছিল এক অনুপ্রেরণার নাম, অনিমেষের এগিয়ে চলার পথে মাধবীলতা হয়ে উঠেছিল সবচেয়ে বড় অবলম্বন। কলকাতার অলিগলি, স্টেশন, লাইব্রেরি, বসন্ত কেবিন, কফি হাউস-প্রতিটি জায়গায় তাদের প্রতিটি সাক্ষাৎ যেন জীবনের নতুন নতুন ধাপের সূচনা করছিল।
রাজনীতির সাথে কোনো সংযুক্তি না থাকার পরও উপন্যাসের অন্যতম শক্তিশালী ও সদা হাস্যোজ্জ্বল চরিত্র পরমহংস- অনিমেষ ও মাধবীলতার সহপাঠী, অনিমেষের পরম বন্ধু। অত্যন্ত সাদামাটা জীবনযাপন করেও যে ছিল অসাধারণ। জীবনের সব সংকটে অনিমেষ যাকে পাশে পেয়েছিল।
ইউনিভার্সিটি ইউনিয়নের ব্যাপারে মতভেদ আর সন্দেহ যখন চরমে তখন তথাকথিত কম্যুনিস্ট পার্টি থেকে সরে গিয়ে অনিমেষের সাক্ষাৎ হয় কম্যুনিস্ট থেকে বিতাড়িত বা কম্যুনিস্ট পার্টি ত্যাগ করা বিপ্লবীদের সাথে। সুবাস এক্ষেত্রেও তার পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করে। উপন্যাসটি হঠাৎ করেই যেন অন্যদিকে মোড় নেয়। রাজনৈতিক উপন্যাস থেকে উত্তেজনায় পূর্ণ অ্যাডভেঞ্চারে পরিণত হয়। নতুন বিপ্লবীরা ধীরে ধীরে গড়ে তোলে বিদ্রোহী গ্রুপ। আদর্শ বিবর্জিত নেতাদের ছেড়ে যুবক অনিমেষ ১৯৭০-এর প্রথমার্ধে সুবাসের সাথে নকশালবাড়ির সশস্ত্র নকশাল আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ে। টানটান উত্তেজনায় একের পর এক পরিকল্পিত কিন্তু ভুলে ভরা অভিযান চালিয়ে অবশেষে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে নির্যাতিত হয়। শুরু হয় তার অনির্দিষ্টকালীন জেলজীবন। অমানুষিক নির্যাতন তাকে শারীরিকভাবে অক্ষম করে দেয়।
অনিমেষের জীবনের উত্থান-পতনের কাহিনী ঘিরে তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক এবং সামাজিক চিত্রের একটি নিখুঁত চিত্র ‘কালবেলা’ উপন্যাসে প্রতিফলিত হয়েছে। একদিকে তৎকালীন প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোর খোলামেলা সমালোচনা করা হয়েছে অন্যদিকে শ্রেণীহীন নতুন ভারতবর্ষ গড়ার আন্দোলনের চিত্র এঁকেছেন সমরেশ মজুমদার।
কিন্তু শেষপর্যন্ত তা শুধু রাজনৈতিক উপন্যাস হয়েই থেমে থাকেনি, রূপ নিয়েছে চরম বাস্তববাদী রাজনীতির সাথে এক অদ্ভুত ভালোবাসার কাহিনীতেও। ভালোবাসা মানেও যে বিপ্লব তার প্রমাণ মাধবীলতা। অপেক্ষার অবসান আদৌ হবে কি না তা না জেনেও নিজের শরীরে অনিমেষের ভালোবাসা বহন করে দিনের পর দিন তার একার যে অপেক্ষা যে সংগ্রাম তাও বিপ্লবের সামিল।
মাধবীলতা ছাড়াও সমরেশ মজুমদারের অন্যান্য বইয়ের মতো এ বইয়েও কিছু শক্তিশালী নারী চরিত্র ছিল, যারা আপাত তথাকথিত বিপ্লব করেনি কিন্তু তাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র বিশ্লেষণে বিপ্লবী বলেই তাদের পরিচয় দেওয়া যায়। তাছাড়া বইতে লেখক আরও স্পষ্ট করেছেন নারীর প্রতি সমাজের বিচিত্র দৃষ্টিভঙ্গি, তৎকালীন নারীদের বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতা।
‘কালবেলা’ বইটি বিপ্লবের একাধিক নতুন রূপের সাথে পরিচয় ঘটায় পাঠকের। প্রতিটি ঘটনার বর্ণনায় লেখক সূক্ষ্মভাবে ছুঁয়ে গেছেন সময়কে, তার সাথে ঘিরে থাকা মানুষকে, তাদের সাথে জুড়ে দিয়েছেন বিপ্লবকে।
অনিমেষসহ অন্যান্য বিপ্লবীরা বহু কাঙ্ক্ষিত ভুল করেছে, যে ভুলগুলোর সত্যি প্রয়োজন ছিল৷ নকশাল আন্দোলনে অনিমেষদের বিপ্লবের ভাবধারা ভুল ছিল না, সমাজের ক্ষমতালোভী সুবিধাবাদী শোষক শ্রেণীর উপর এই হামলার প্রয়োজন অবশ্যই ছিল, কিন্তু তা অবশ্যই নিজেদের অবস্থানের সীমার মধ্যে থেকে। এসব বিপ্লবীরা নিজেদের যোগ্যতার সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে উত্তেজিত হয়ে যেসব ভুল করেছে তাতে তাদের অনেককেই অকাতরে জীবন দিতে হয়েছে, অনেকে বেঁচে থেকেও অর্ধ মৃত হয়ে আছে। কিন্তু এমন জীবন বরণ করে নিয়েও অনিমেষের আফসোস ছিল না এই ভেবে যে, পরবর্তী প্রজন্ম এ ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েই সামনে এগোবে।
রাজনীতি, বিপ্লব, আন্দোলন এসব নিয়ে সমাজের উচ্চবিত্ত মধ্যবিত্ত নিম্নবিত্ত সকল শ্রেণীর মানুষের মন-মানসিকতার সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ আছে এ বইয়ে৷ উপন্যাসটি গভীরভাবে উপলব্ধিতে এ কথা স্পষ্ট হয় যে বিপ্লব অবশ্যই সম্ভব, তবে তা রাতারাতি নয়, তার জন্য সময়ের প্রয়োজন। সমাজতন্ত্রের চেহারা পরিবর্তন করতে হবে পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রেক্ষাপট অনুযায়ী। যাদের জন্য এই বিপ্লব, সেই সাধারণ মানুষের মানসিকতার উপর নির্ভর করে তবেই তাদের একত্রিত করা সম্ভব।
উপন্যাসটিতে মূল বিষয়গুলো ছাড়িয়েও তরুণ জীবনের, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের এমন কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল, যা সত্যিই চমৎকার। কিন্তু এই ক্ষুদ্র পর্যালোচনায় সবকিছু আনা সম্ভব নয়। তরুণরা এই উপন্যাসের আপাদমস্তক আকন্ঠ গ্রহণে বাধ্য। এমন কিছু পার্শ্বচরিত্র আছে, যাদের ভূমিকা উপন্যাস পড়েই বুঝতে হবে। এই উপন্যাস ভালোবাসার অনুভূতি দেয়, অনুভব করায় বহু আত্মত্যাগের। সার্বিকভাবে ‘কালবেলা’কে বলা যায় এক অদম্য জীবনের গল্প।
লেখক: শিক্ষার্থী, লোক প্রশাসন বিভাগ (৩য় বর্ষ), কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।
কুবি/হাকিম মাহি