বাংলা ভাষা বাঙালির গর্ব। এ ভাষা তারুণ্যের অহঙ্কার। কারণ, এ ভাষা রক্ষায় একমাত্র প্রাণ দিয়েছিল তরুণরাই। সেই তরুণরাই ভাষা আন্দোলনের ৬৯ বছর পর কী ভাবছেন, এ সম্পর্কে তাদের মতামত লিখে পাঠিয়েছেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ক্যাম্পাস সাংবাদিক কেএম হিমেল আহমেদ।
প্রয়োজন শুদ্ধ বাংলা ভাষা চর্চা
উম্মে কুলসুম ইভা, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, বাংলা ভাষা আমাদের অহঙ্কার। বাঙালি একমাত্র জাতি, যারা এই ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে। বিন্দু বিন্দু রক্তের বিনিময়ে কিনেছি, আমরা আমাদের গর্ব, আমাদের বাংলা ভাষা। বাংলা মিশে আছে আমাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ইতিহাসে, যা আমরা রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনুভব করি। কিন্তু এই সোনার ‘বাংল’ ভাষার যখন অপব্যবহার ঘটে, তখন খুব কষ্ট হয়, শ্রুতিকটু লাগে। এই একবিংশ শতাব্দীতে অনেক জনপ্রিয় একটি ভাষা বাংলিশ (বাংলা+ইংলিশ=বাংলিশ)। কিছু ব্যক্তিবর্গ এই ভাষার ব্যবহার করে নিজেকে অতি-আধুনিক প্রতিপন্ন করবার চেষ্টা করে। আমি অক্লেশে বলতে পারি, এটা কিছুতেই আধুনিক নাম পাওয়ার দাবিদার হতে পারে না।
আবার বিশেষ বিশেষ কিছু জায়গায় যেমন জাতীয় সংসদ, আলোচনা অনুষ্ঠান, সভা-সেমিনার, উপস্থাপনা ইত্যাদিতে আঞ্চলিকতার প্রভাব দেখা যায়, অথচ সেখানে প্রমিত বাংলা ভাষা ব্যবহার হওয়া উচিত। যা প্রমিত বা মান বাংলা ভাষাকে কলুষিত করছে। যদিও স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শুদ্ধ বাংলা ভাষা চর্চার কোনো নির্দিষ্ট সংস্থাপন বা সন্নিবেশ নেই। কিন্তু আমরা নিজেদের চেষ্টায় শুদ্ধ বাংলা ভাষার চর্চা করতে পারি। এই ভাষার মাসেই শুরু হোক আমাদের শুদ্ধ বাংলা ভাষার চর্চা। আঞ্চলিকতাদোষ মুক্ত হোক আমাদের বাংলা ভাষা। আমাদের সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে শুদ্ধ বাংলা ভাষার চর্চা করতে হবে। শুদ্ধ বাংলা ভাষা চর্চার পাশাপাশি সুস্থ-সুন্দর উপভোগ্য মানসিকতা গড়ে তুলি।
ভাষার প্রতি আমাদের ভালোবাসা
মনিকা জাহান, রোকেয়া কলেজের শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, ১৯৫২ সাল, যে সময় আমরা আমাদের মাতৃভাষায় কথা বলতে পারতাম না, ছিল না সে অধিকার, ছিল না রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। কথা বলতে হবে উর্দুতে, বাংলার দামাল ছেলেরা থেমে থাকেনি। মাকে ভালোবেসে মায়ের মুখের ভাষাকে ভালোবেসে বাংলাকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠে। নেমে পড়ে রাজপথে, আন্দোলন শুরু করে ভাষার দাবিতে। ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সালে ভাষার দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলে। বাঙালির এ অধিকার সচেতনতা দমিয়ে রাখতে উক্ত আন্দোলনে পুলিশ বাধা দেয়। গুলি করা হয় বাংলার দামাল ছেলেদের ভীতসন্ত্রস্ত করার জন্য। কিন্তু তবুও তারা থামেনি, ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে বুকের রক্তে রঞ্জিত করে রাজপথ। এই আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলা ভাষা স্থান করে নেয় দেশের বুকে, পৃথিবীর বুকে।
২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যারা জীবনকে তুচ্ছজ্ঞান করে মৃত্যুকে আপন করে নেন, তারাই হচ্ছেন ভাষা শহীদ। রফিক, বরকতসহ আরো অনেক ভাষা সৈনিক যাদের অমর কৃতি আমাদের মুখের ভাষাকে কেড়ে নিতে দেয়নি, বরং ফিরিয়ে দিয়েছে মায়ের মুখের ভাষা। তাদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা দিবস, ভাষা শহীদ হিসেবে উদযাপন করা হয়। পরে ইউনেস্কো স্বীকৃতি প্রদান করলে তা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে ভাষা শহীদের স্মরণে। আমরা গর্বিত যে, আমরাই প্রথম জাতি, যে জানি ভাষার জন্য প্রাণ দিয়ে নিজেকে সংগ্রামী হিসেবে বিশ্ব দরবারে উপস্থাপন করেছে। রফিক, বরকতসহ আরো অনেকের প্রাণের বিনিময়ে কেনা এ বাংলা ভাষা সাহিত্য সমৃদ্ধি অর্জন করুক।
ব্যানার, ফেস্টুন ও সাইনবোর্ডগুলোর ব্যবহার হোক বাংলায়
নাহিদুজ্জামান নাহিদ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর প্রায় প্রতিটি দেশেই উচ্চশিক্ষা দেওয়া হয় তাদের নিজস্ব ভাষায়। তেমনি আমাদের প্রায় হাজার বছরের বাঙালি সাহিত্য-সংস্কৃতি ও সভ্যতার পরিস্ফুটন ঘটে বাংলা ভাষায়। ইংরেজি ভাষা বা বিদেশি ভাষার স্থান যেখানে বাংলা ভাষার পরে রাখার কথা, সেখানে আমাদের দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ইংরেজিকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে যাচ্ছে। অথচ দেশের অনেক উচ্চশিক্ষিতরা বাংলা শব্দের সঠিক উচ্চারণটা পর্যন্ত করতে পারেন না।
সমাজের উঁচু শ্রেণির অধিকাংশ মানুষই আজ ইংরেজিমুখী। শুধু তাই নয়, ইংরেজিমুখী এই মনোভাব আজ উঁচু শ্রেণি থেকে নিম্ন শ্রেণি পর্যন্ত ক্রমাগত ছড়িয়ে পড়ছে। দেশের ইংলিশ মাধ্যম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অবাধে বিদেশি ভাষায় শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে, যেখানে উপেক্ষা করা হচ্ছে মাতৃভাষা বাংলাকে। ফলে দেশি শিক্ষার বিপরীতে ছাত্রছাত্রীরা শিখছে বিদেশি শিক্ষা ও সংস্কৃতি।
আজকাল পথ-ঘাট, দোকান-পাট, ব্যানার-ফেস্টুন, সাইনবোর্ড ইত্যাদিতে অবাধে ইংরেজির বিচরণ দেখা যায়। যেটুকু আবার বাংলাকে উপস্থাপন করা হয় তাও বিকৃতরূপে। এমনকি আইনভবন অর্থাৎ সংসদেও সমানতালে চলছে ভাষা দূষণ। হাইকোর্ট-সুপ্রিমকোর্টেও এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠা করা যায়নি দেশীয় ভাষার সম্পূর্ণ ব্যবহার। অন্তত সাইনবোর্ডের ভাষাটাও বাংলা মাধ্যম হয়নি।
অতএব, এসব সমস্যা থেকে বের হয়ে আসতে না পারলে ধীরে ধীরে বাংলা ভাষা ও বাঙালি জাতিসত্তা হবে প্রশ্নবিদ্ধ এবং দেশ হয়ে পড়বে বিদেশি ভাষা নির্ভর। বাংলা ভাষা হয়ে পড়বে স্বকীয়তাহীন, একইসঙ্গে আমরা হারিয়ে ফেলবো বাঙালির হাজারো বছরের পুরনো সাহিত্য-সংস্কৃতি ও ইতিহাস-ঐতিহ্য। এতে বাংলা ভাষা তার অস্তিত্ব সংকটে পতিত হবে। সুতরাং ভাষার এই অস্তিত্ব সংকট, অপব্যবহার ও ভাষার দূষণ থেকে বাংলা ভাষাকে রক্ষা করতে চাইলে দেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে বাংলা ভাষাকে পৌঁছে দিতে রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
বাংলা একাডেমিকে ভাষা ও সাহিত্যের ব্যাপারে সদা সতর্ক থাকতে হবে, যেন সাহিত্য-সংস্কৃতিতে ভাষার অপব্যবহার ও অসচ্ছ ব্যবহার না হয়। এছাড়া আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে অচিরেই বাংলা ভাষা আনায়ন করতে হবে। দোকান-পাটের নাম, ব্যানার-ফেস্টুন-সাইনবোর্ড, পোস্টার-লিফলেট ইত্যাদিতে ইংরেজি ভাষা ও বিদেশি ভাষা দূরীকরণে ‘শুদ্ধ ভাষা আন্দোলন’ জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি একযোগে দেশের উচ্চশ্রেণী থেকে নিম্নশ্রেণী পর্যন্ত সবাইকে ‘সঠিক মাতৃভাষা শিক্ষা’র শপথ গ্রহণ করে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। তবেই না বাংলা ভাষার মান সুপ্রতিষ্ঠিত হবে এবং ভাষা শহীদদের মর্যাদার যথাযথ সংরক্ষণ হবে।
ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে নাটক-সিনেমা নির্মাণ করা হোক
তানজিরুল ইসলাম সামি, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, ভাষা আন্দোলন আমাদের অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে আছে। এ আন্দোলনে সাহস শক্তি ও প্রেরণার উৎস জুগিয়েছেন বাংলার যে সাহসী সন্তানরা তাদের সম্পর্কে আমাদের আগামী প্রজন্মের কাছে সঠিকভাবে তুলে ধরাটা অনেক বড় দায়িত্ব বলে আমি মনে করি।
কিন্তু দীর্ঘ ৬৯ বছর পার হয়ে গেলেও ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তেমন কোনো নাটক, সিনেমা, গান তৈরি করা হয়নি। যদিও মুক্তিযোদ্ধাভিত্তিক সিনেমা নাটক রয়েছে। কিন্তু ভাষা নিয়ে তেমনটা নেই। ভাষা আন্দোলন নিয়ে নাটক সিনেমা না তৈরি করা হলে বর্তমান তরুণ প্রজন্মের কাছে অজানা থেকে যাবে। আমি মনে করি, ভাষা শুদ্ধির আন্দোলন হোক।