ক্যাম্পাস

পুরনো সেই দিনের কথা

‘পুরনো সেই দিনের কথা, বলবি কিরে হায়/ও সেই চোখের দেখা, প্রাণের কথা, সে কি ভোলা যায়’! ২০২০ সাল। বলছি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের কথা। বিভাগের নবীন ব্যাচ হিসেবে সদ্য আমরা প্রথম বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষা শেষ করেছি। বাৎসরিক শিক্ষা সফর হিসেবে বিভাগ থেকে বান্দরবান এবং প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনকেই নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়াও এই সফরে বিভাগের বড় ভাই-আপু এবং শ্রদ্ধেয় শিক্ষকরাও অংশ নিয়েছিলেন। 

শিক্ষা সফর বরাবরই আমার জন্য ছিল দুর্লভ একটি বিষয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগে আমি কখনো শিক্ষা সফরে যেতে পারিনি। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুতে এমন একটা সুযোগ পেয়ে যাবো ভাবতে পারিনি। বান্দরবান আর সেন্টমার্টিন বরাবরই আমার একটি পছন্দের জায়গা। নীল পাহাড় আর নীল পানির রাজ্যে লুটপটি খেলা ছিল আমার বহু দিনের শখ। আমাদের প্রথম যাত্রাটা শুরু হয়েছিল বান্দরবানের নীল পাহাড়ের উদ্দেশ্যে। সময়টি বেশ পুরনো। কেটেছে সময়, পেরিয়েছে দিন, তবুও স্মৃতিজুড়ে এখনো সেই মুহূর্তগুলোই বিচরণ করছে। করোনার কারণে দীর্ঘ দিন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস বন্ধ থাকায় গৃহবন্দি জীবনযাপন করতে হচ্ছে। দীর্ঘ দিনের একঘেয়েমি জীবনে যেন কোনো নতুনত্ব নেই। নতুন করে কোনো কিছু ভাবার মতো পরিবেশ নেই। তাই তো অতীতের সেই সোনালী সময়গুলোই নতুন করে লিখতে হচ্ছে স্মৃতির পাতায়।

শিক্ষা সফর শিক্ষা জীবনেরই একটি বড় অংশ। এতে শিক্ষার্থীদের মাঝে নতুন নতুন তথ্য জানার দরজা উন্মোচিত হয়। এমনই নতুন নতুন জ্ঞানের সঞ্চার ঘটাতে আমাদের বিভাগ থেকেও শিক্ষা সফরের আয়োজন করা হয়েছিল। বিভাগের শিক্ষকদের সাথে নবীন ও বিদায়ী শিক্ষার্থীদের এক মৌহময় ভ্রমণ যাত্রা শুরু হয়েছিল। সন্ধ্যার পরে রঙিন বাসে সবাই বসে আছে অজানা এক গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। গহীন রাতে ছুটে চলছে স্বপ্নের ফেরিওয়ালা সেই বাস‌। সবার মধ্যেই বিরাজ করছে এক রোমান্টিক অনুভূতি। কারো কারো প্রথম যাত্রা আবার কারো দ্বিতীয়। সময়ের সান্ধিক্ষণে হৈচৈ আর কোলাহলে মুখরিত বাসটি পৌঁছে গেলো স্বপ্নের ঠিকানায়। 

নীল আকাশের বুকে উঁচু উঁচু পাহাড়গুলো যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে সবাইকে। মেঘ পাহাড়ের মিতালী দেখার ইচ্ছেগুলো যেন মনের অকপটেই পূর্ণ হয়ে গেলো। বিভাগের শিক্ষক থেকে শুরু করে বড় ভাই-আপু এবং ক্লাসের বন্ধুদের সাথে হৈচৈ আর কোলাহলে মেতে ওঠার সেই আবেগঘন মুহূর্তগুলো এখনো মনের মনিকোঠায় জীবন্ত হয়ে রয়ে গেছে। এখনো মনে পড়ে বান্দরবানের সেই হোটেল নাইট হ্যাভেনের করা। পাহাড়ের চূড়ায় রাত্রীযাপন করার অভিজ্ঞতা আমাকে এখনো ভাবায়। একসাথে খাওয়া দাওয়া, একসাথে উনো খেলা, একসাথে রাত্রীযাপন সবই কতই না মজার ছিল। চার চাকার গাড়িতে চড়ে পাহাড়ি রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো, সেইসঙ্গে পাহাড়ের চূড়ায় উঠে খুনসুটি আর সেলফি আড্ডাগুলো যেন আমাকে আবারো কাছে টানে। নীলগিরি, নিলাচল, স্বর্ণমন্দিরের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য আমাদের করেছিল মুগ্ধ। 

অনেক তো হলো নীল পাহাড়ের সাথে কানামাছি খেলা। সন্ধ্যার সোনালী আলোতে বান্দরবান ভ্রমণের পরিসমাপ্তি ঘটলো। এবার সবাই ছুটতে লাগলো নীল পানির রাজ্য খ্যাত সেন্টমার্টিনে। যেখানে নীল পানি আর নীল আকাশ মিলেমিশে একাকার। সেন্টমার্টিন বরাবরই আমার একটি পছন্দের জায়গা। এই সেন্টমার্টিন নিয়ে কতই না স্বপ্ন বুনে ছিলাম মনের গহীনে। কুয়াশা মাখা ভোরে কাঁপতে কাঁপতে সবাই ছুটলো লঞ্চ ঘাটে। নাফ নদীর তীর ঘেঁষে চলতে লাগলো স্বপ্ন পিপাসুর দল। লঞ্চ ভর্তি মানুষের কোলাহলে সমুদ্র যাত্রা বেশ রোমাঞ্চকর হয়ে উঠলো। সমুদ্রের সাদা গাঙচিলগুলোর খাবার খাওয়া আর উড়াউড়ি সমুদ্রের সৌন্দর্যকে করেছিল আরও সুবাসিত। 

বহু প্রতীক্ষার পর অবশেষে স্বপ্নকে ফেরি করা সেই সোনালী লঞ্চটি পৌঁছাল প্রাণের সেন্টমার্টিনে। সবার চোখে মুখে যেন ক্লান্তির ছাপ। সমুদ্রকে কাছে পেয়ে সবাই যেন ভুলেই গেলো ক্লান্তির কথা। সব দুঃখকে বালি চাপা দিয়ে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়লো সমুদ্রের কোলে। এদিকে সমুদ্র যেন নাবিক দলকে আপন করে নিয়েছে অতি সাদরে। সমুদ্রের ধেয়ে আসা ঢেউয়ে সবার মনে যেন শান্তির মহিমা সৃষ্টি করেছে। তীরে দৌড়াদৌড়ি যেন আর থামছে না কারো। 

অন্য সবার চেয়ে আমি একটু বেশি উৎসাহীত ছিলাম। সমুদ্রকে কাছে পেয়ে ভুলেই গিয়েছিলাম আমার সব দুঃখ। সাগরের বিশাল জলরাশির সাথে আমার যেন বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল। সমুদ্রের সাথে প্রকৃতির সেই অপরূপ খেলা আমার মনে সৃষ্টি করে এক ভিন্ন অনূভুতি ও এক ভিন্ন আমেজ। সাগরের নীল পানির সৌন্দর্য মানুষকে যেন হাতছানি দিচ্ছে অনবরত। বাহারি জীববৈচিত্র্যের সাথে  প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ মহিমা দ্বীপটিকে করেছে অনন্য। বালুকাময় সৈকত আর বিরামহীন গর্জন সমুদ্রের বুকে তৈরি করে এক ভিন্ন সিনেম্যাটিক দুনিয়া। যে দুনিয়ার সাক্ষী হতে প্রতিনিয়ত মানুষ ছুটছে সেন্টমার্টিনের প্রাণে। 

ভোর হলেই বেরিয়ে পরতাম সমুদ্রের বুকে। ভাটা থাকায় নৌকাগুলো খোলা বালির মধ্যে পানি বিহীন ভাসতো। সেই চমৎকার দৃশ্যগুলো এখনো চোখের মণিতে লিপিবদ্ধ। প্রবাল পাথরের উপর বসে সমুদ্রের বিশালতা দেখে চোখ জুড়িয়ে যেত।  দল বেঁধে সবাই যেন বেরিয়ে পড়তাম সমুদ্র অঙ্গনে নতুন কিছু আবিষ্কার করবো বলে। সারা দিনের দীর্ঘ ব্যস্ততা শেষে নীল আকাশের সোনালী সূর্য যেন ঘুমিয়ে পড়তো রাতের নির্জীব অন্ধকারে। সন্ধ্যার জোয়ারের সময় সমুদ্রের সৌন্দর্য ছিল মনোমুগ্ধকর। সমুদ্রের গর্জন আর ঠান্ডা শীতল হাওয়ায় মন জুড়িয়ে যেত।

সন্ধ্যার গৌধূলিতে বন্ধুদের সাথে খালি পায়ে নীল পানির স্বচ্ছতার স্বাদ নিতাম। কেউ বা আবার সমুদ্রের দখিণা বাতাসে দোল খেত মহানন্দে। খোলা আকাশের নিচে সামুদ্রিক মাছ আর ভাত খাবার উৎসব কতই না মজার ছিল। রিসোর্টে নাইট আউটে সাথে মুরগির বারবিকিউ যেন এখনো সবার মুখে লেগে আছে। সামুদ্রিক মাছের বারবিকিউ খাওয়ার সুযোগ হয়েছিল বন্ধুদের সাথে। সেন্টমার্টিন দ্বীপে রয়েছে অসংখ্য শুঁটকি মাছের বাজার। বাহারি সব সামুদ্রিক মাছের শুঁটকি দেখার সুযোগ হয়েছিল সবার। 

সেন্টমার্টিন যেন তরুণ মনে প্রেমের সৃষ্টি করেছিল। সাগরের বিশালতা যেন সবার মন ছুঁয়েগেছিল। বহুকাঙ্ক্ষিত সেই তরমুজ কাপ ফুটবল খেলা এখনো মনে পড়ে সবার। দিনটি কতই না মজার ছিল। দুপুরে বালুকাময় সমুদ্র তীর হয়ে উঠেছিল ইউরোপের কোনো ফুটবল আসর। সেখানে মেসি কিংবা সোনার তৈরি কাপ ছিল না ঠিকই, তবে ছিল কিছু ভালোবাসার গল্প, ভালোবাসার অনুভূতি। 

অতীতের সুখকর সেই সময়গুলো এখন শুধুই স্মৃতি। দীর্ঘ দিনের একঘেয়েমি জীবনে অতীতের সেই সুখগুলোই নতুন করে আবার রচনা করলাম। আবারো হয়তো আসবে সেই দিন, যেদিন সবার হৈচৈ আর কোলাহলে জীবন্ত হয়ে উঠবে শিক্ষা সফরের নতুন দিন। 

লেখক: শিক্ষার্থী, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।