আধুনিক খাদ্য জগতে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য একটি বৃহৎ জায়গা নিয়ে আছে। বিগত শতাব্দী থেকে বর্তমানে ভোক্তাদের গড়ে উচ্চ প্রক্রিয়াজাত খাদ্য গ্রহণের মাত্রা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ ধরনের খাদ্য সাধারণত অত্যন্ত সুস্বাদু ও প্রায়শই সাশ্রয়ী দামে পাওয়া যায়। এছাড়া রাস্তার পাশের বিভিন্ন দোকান ও রেস্টুরেন্টে এসব অতি সহজলভ্য, তাই মানুষ এ ধরনের খাদ্য অনায়াসেই গ্রহণ করছে।
উনবিংশ শতাব্দীর আগেও মানুষ ঘরের তৈরি খাবার গ্রহণ করত। সেসব চাষকৃত খাদ্যদ্রব্য পরবর্তী সময়ে বাড়ির মধ্যেই প্রক্রিয়াজাতকরণ সম্পন্ন করতো, ফলে তার মধ্যে প্রাকৃতিক সকল উপাদান সংরক্ষিত ছিল। ইদানিং জীবনকে সহজ করতে প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্রতি নির্ভরশীলতা বেড়ে গেছে। চারপাশের অস্বাস্থ্যকর জাঙ্ক ফুডের সহজলভ্যতা দিন দিন আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে।
প্রক্রিয়াজাত খাদ্য বলতে বোঝায় প্রাকৃতিক অবস্থা থেকে পরিবর্তিত কোনো খাবার। এর মধ্যে এমন খাবার অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে যা কেবল কেটে, ধুয়ে, উত্তপ্ত, পাস্তুরিত, টিনজাত, রান্না করা, হিমায়িত, শুকনো, ডিহাইড্রেটেড, মিশ্রিত বা প্যাকেজ করা হয়। এ খাবারগুলোতে সাধারণত সংরক্ষক, পুষ্টি, স্বাদ, রঙ, লবণ, শর্করা বা চর্বি, অন্যান্য সংযোজন যুক্ত এবং তুলনামূলকভাবে অল্প সংখ্যক অক্ষত উপাদান থাকে। তবে বর্তমানে অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের মধ্যে বার্গার, সান্ডউইচ, পেস্ট্রি, কেক, সস, হটডগ, পিজ্জা, সফট ড্রিংকস প্রভৃতি বহুল জনপ্রিয়। এসব খাবারের মধ্যে টারট্রাজিন, কুইনোলিন, ইয়েলো,সানসেট ইয়েলো, কার্মিন, কার্বন ব্ল্যাক ইত্যাদি ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান বিদ্যমান রয়েছে। বিভিন্ন ধরনের চিপস সাধারণত হাইড্রোজেনেটেড তেলে তৈরি হয়। এই তেল শরীরে কোলেস্টরলের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিগত ৪০ বছরে মেদবহুলতার হার ১০ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ইউরোপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, নিউজিল্যান্ড এবং ব্রাজিলের বেশকিছু খাদ্য বিক্রির সমীক্ষায় দেখা গেছে, ভোক্তারা খাদ্য থেকে শক্তি গ্রহণে দৈনন্দিন ২৫ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্রতি বেশি নির্ভরশীল। যা পরবর্তীতে পেটের রোগ, যকৃত ও কিডনি সমস্যা, হৃদরোগ, ডায়েবেটিস, ক্যানসারসহ বিভিন্ন জটিল রোগ সৃষ্টি ও এমনকি মৃত্যুঝুঁকির কারণে পরিণত হচ্ছে। এরূপ খাদ্যগ্রহণ প্রবণতা সম্পর্কিত পূর্ববর্তী জরিপে খাদ্যের বৈশিষ্ট্য ও গুনাগুনই রোগ সৃষ্টির অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সম্প্রতি দুটি গবেষণায় দেখা গেছে, অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের উচ্চ মাত্রায় ভোজন একজনের কোলন ক্যানসার এবং সামগ্রিক মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। গবেষণায় নিয়মিতভাবে হট ডগ, পনির পাফ, সোডা এবং ফ্রেঞ্চ ফ্রাই জাতীয় খাবার খাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু ঝুঁকির কথা তুলে ধরা হয়েছে। প্রথম সমীক্ষা অনুসারে, এই গ্রুপে যারা কম খাবার খেয়েছেন তাদের তুলনায়, যারা পর্যাপ্ত পরিমাণে অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার খেয়েছেন তাদের সামগ্রিকভাবে মৃত্যুর ঝুঁকি এবং হৃদরোগে মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি ছিল, যা ইতালিতে প্রায় ২৪,০০০ প্রাপ্তবয়স্কদের পরীক্ষা করে পাওয়া গেছে।
দ্বিতীয় গবেষণা ২৪ থেকে ২৮ বছর বয়সী ২০০,০০০ মার্কিন স্বাস্থ্যসেবা পেশাদারদের উপর গবেষণা করা হয়েছে এবং আবিষ্কার করা হয়েছে যে, পুরুষরা যারা প্রতিদিন গড়ে নয়টির বেশি অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার খান তাদের কোলোরেক্টাল ক্যানসারের ঝুঁকি ২৯ শতাংশ বেশি ছিল। এই গবেষণার সিনিয়র লেখক টাফ্টস ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ফাং ফাং ঝাং অনুমান করেছেন, যে গোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি এসব খাবার খেয়েছে তারা সেই খাবারগুলো থেকে তাদের দৈনিক ক্যালোরির প্রায় ৮০ শতাংশ পেয়েছে, যা প্রায় জাতীয় গড় ক্যালোরি গ্রহণের ৫৭ শতাংশ।
সাম্প্রতিক দশকগুলোতে, অল্প বয়স্ক ব্যক্তিদের কোলোরেক্টাল ক্যানসারের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। আমেরিকান ক্যানসার সোসাইটির একটি গবেষণা অনুসারে, ১৯৮৯ থেকে ১৯৯০ এবং ২০১২ থেকে ২০২০ এর মধ্যে ৫৫ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে রেকটাল ক্যানসারের প্রকোপ দ্বিগুণ হয়েছে এবং ১৯৮০ এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ২০ থেকে ৩৯ বছর বয়সী মানুষের মধ্যে কোলন ক্যানসারের হার বার্ষিক বৃদ্ধি পেয়েছে। বিজ্ঞানীরা এখনও অতি-প্রক্রিয়াজাত খাদ্য গ্রহণের সুনির্দিষ্ট পরিমাণ নির্ধারণ করছেন, যা একজনের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে।
প্রক্রিয়াজাত খাবার কমানো কিছুটা কঠিন হতে পারে যদি মানুষ এটিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, তাই সময়ের সাথে সাথে সবাইকে পণ্যের লেবেলগুলো ভালো করে পড়ে নিতে হবে। নিজেকে এবং পরিবারের সবাইকে সুরক্ষিত রাখতে এবং একটি সুস্থ জীবনযাপনের জন্য সঠিক রুটিন এবং স্বাস্থ্যকর খাবারে অভ্যস্ত করতে হবে। এসকল দুরারোগ্য ব্যাধি প্রতিরোধ করতে সাধারণভাবে ফাস্ট ফুড, প্রক্রিয়াজাত মাংস এড়ানো, চিনি-মিষ্টিযুক্ত পানীয় শুধুমাত্র কদাচিৎ ব্যবহার করা এবং স্যাচুরেটেড চর্বিযুক্ত খাবার পরিমিতভাবে গ্রহণ করা উচিত। একজন ব্যক্তি সম্পূর্ণ খাদ্য যেমন ভাত, রুটি, ডাল, মাছ, শস্য, বাদাম, বীজ, চর্বিহীন মাংস, ফল, শাকসবজি আহারে তাদের খাদ্যের ভারসাম্য বজায় রাখতে বা এটিকে স্বাস্থ্যকর করে তুলতে পারেন। পরিশোধিত তেল এবং ট্রান্স ফ্যাট এড়ানোর জন্য প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলা সবচেয়ে বড় কৌশল। জলপাই তেল বা নারকেল তেল স্বাস্থ্যকর বিকল্প যা তাদের পরিবর্তে ব্যবহার করা যেতে পারে।
বর্তমানে অস্বাস্থ্যকর খাদ্য আহার ও অনিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপনের ফলে সৃষ্ট বিভিন্ন দুরারোগ্য রোগের চিকিৎসা অনেকাংশে ব্যয়বহুল। এসব চিকিৎসার খরচ বহন করা সাধারণ মানুষের জন্য দুর্বিষহ হয়ে পড়ছে। অনেকেই এ চিকিৎসা চালাতে প্রায় নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। যা থেকে পরিত্রাণ কেবল একটি নিয়মতান্ত্রিক জীবন গঠনের ফলে সম্ভব। সুতরাং একটি সুস্থ রোগমুক্ত জীবন গড়ে তুলতে জনগণকে প্রক্রিয়াজাত খাবার বন্ধ করে প্রাকৃতিক ও স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণে আরো বেশি মনোযোগী হতে হবে। মানুষ যেহেতু এসব লোভনীয় খাবার রেস্টুরেন্টগুলোতে সহজেই পাচ্ছে, তাই এসব জায়গায় স্বাস্থ্যকর খাবারের প্রচলন করা অত্যন্ত জরুরি। সেই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণ ও ভেজাল রোধে আরো বেশি জোরালো অবস্থান এবং কঠোর ভূমিকা পালন করা।
লেখক: শিক্ষার্থী, লোকপ্রশাসন বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়