শীত এলেই বাঙালির জীবনে এক বিশেষ উষ্ণতা ফিরে আসে—পিঠা-পুলির উষ্ণতা। শীত আর পিঠা-পুলির সম্পর্ক যেন অদৃশ্য এক সুতোয় বাঁধা। বছরের অন্য সময় যত আধুনিক খাবারই আসুক, শীতের পিঠা-পুলির আবেদন কখনো ম্লান হয় না। কারণ, পিঠা শুধু খাবার নয়; এটি স্মৃতি, আবেগ আর বাঙালির সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ছোটবেলায় শীত মানেই ছিল পিঠা-পুলির মৌসুম। শীত এলেই ঘরে শুরু হতো এক আলাদা ব্যস্ততা। মা, ঠাকুমা, পিসি, কাকিমা কিংবা পাড়া-প্রতিবেশীরা একসঙ্গে বসে পিঠা বানানোর প্রস্তুতি নিতেন। সেই প্রস্তুতির মধ্যেই লুকিয়ে থাকত আনন্দ, উৎসব আর পারিবারিক মিলনের উষ্ণ অনুভব।
শীতকাল মানেই নতুন ধান কাটা। মাঠজুড়ে সোনালি ফসলের হাসি আর ঘরে ঘরে নতুন চালের গুঁড়া। সেই নতুন চালের গুঁড়ায় তৈরি ভাপা পিঠা, চিতই পিঠা কিংবা পুলি পিঠার স্বাদ ছিল অনন্য। প্রতিটি পিঠার মধ্যেই যেন লুকিয়ে থাকত শীতের নিজস্ব গল্প।
পৌষ সংক্রান্তির কথা মনে হলেই আজও মনটা ভরে যায়। এই দিনের জন্য কত যে অপেক্ষা করতাম! উঠোনে বসত মাটির চুলা, মাটির হাঁড়িতে জ্বাল দেওয়া হতো দুধ আর খেজুরের গুড়। পিঠার ঘ্রাণে ভরে উঠত পুরো বাড়ি। তখন পিঠা খাওয়া শুধু খাওয়া ছিল না—এটা ছিল পরিবারের সবাই মিলে একসঙ্গে বসে সময় কাটানোর আনন্দ।
মায়ের হাতের পিঠার স্বাদ ছিল তুলনাহীন। আজ শহরের রেস্টুরেন্টে নানা রকম পিঠা পাওয়া গেলেও সেই স্বাদ আর অনুভূতি আর ফিরে আসে না। কারণ, মায়ের হাতের পিঠায় উপকরণের চেয়ে বেশি মিশে থাকত ভালোবাসা, যত্ন আর সংসারের উষ্ণতা।
শীতের সকালগুলোও ছিল আলাদা। ঘন কুয়াশার ভেতর গরম ভাপা পিঠা হাতে বসে থাকা—এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। বাইরে ঠান্ডা আর কুয়াশা, ভেতরে গরম পিঠা আর পরিবারের হাসি—এই মিলনই শীতকে এত আপন করে তোলে।
পিঠা-পুলি শুধু খাবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি সামাজিক সম্পর্কেরও অংশ। শীত এলেই এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে পিঠা পাঠানো হতো। আত্মীয়স্বজন আর প্রতিবেশীদের সঙ্গে পিঠা ভাগাভাগি করার মধ্যেই তৈরি হতো সৌহার্দ্য আর আন্তরিকতা। পিঠা যেন মানুষে মানুষে সম্পর্কের সেতু হয়ে উঠত।
আজ জীবন অনেক বদলে গেছে। ব্যস্ততা বেড়েছে, পারিবারিক সময় কমে গেছে। অনেক বাড়িতেই আর আগের মতো পিঠা বানানোর চল নেই। তবুও শীত এলেই কোথাও না কোথাও পিঠার কথা মনে পড়ে। কেউ স্মৃতিচারণ করে, কেউ আবার সময় বের করে পুরোনো রীতিটুকু আঁকড়ে ধরে।
শীতের পিঠা-পুলি আমাদের শিকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। মনে করিয়ে দেয় আমাদের বেড়ে ওঠা, আমাদের সংস্কৃতি আর পারিবারিক বন্ধনের কথা। আধুনিকতার ভিড়েও পিঠা-পুলি আজও বাঙালির হৃদয়ে শৈশব, পরিবার আর সংস্কৃতির গল্প জাগিয়ে রাখে।
শীত যতদিন থাকবে, পিঠা-পুলির এই মিষ্টি গল্প ততদিন বাঙালির জীবনে বেঁচে থাকবে।
লেখক: বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।