একদিন যে ক্যাম্পাস ছিল স্বপ্ন গড়ার প্রথম ঠিকানা, আজ সেই ক্যাম্পাসই হয়ে উঠেছে দায়িত্ব আর নেতৃত্বের নতুন অধ্যায়। সীমাবদ্ধতা, সংগ্রাম আর অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়েই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মেধাবী তরুণরা নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (নোবিপ্রবি) নিজেদের তৈরি করছিলেন ভবিষ্যতের জন্য। আধুনিক সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি থাকলেও তাদের শক্তি ছিল অদম্য আত্মবিশ্বাস, অধ্যবসায় আর অসাধ্যকে সাধন করার দৃঢ় প্রত্যয়।
সেই নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রম ও স্বপ্নের বাস্তব রূপ আজ স্পষ্ট—নোবিপ্রবির ৪ সাবেক শিক্ষার্থী ফিরে এসেছেন নিজ বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষক হয়ে। শিক্ষার্থী থেকে শিক্ষক হওয়ার এই যাত্রা কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্ভাবনা, তার শিক্ষার্থীদের সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গড়ে ওঠার জীবন্ত দলিল।
সম্প্রতি নোবিপ্রবিতে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেছেন—পরিসংখ্যান বিভাগের ২০১৬–১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী কবির হোসেন, তথ্য বিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগের ২০১৭–১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সাবিহা তাসমিম, অ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রি অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০১২–১৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী জাহিদুল হাসান এবং কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০১৭–১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. জুবায়ের আলম রাফি। নিজ বিভাগে শিক্ষক হিসেবে ফিরে আসার অনুভূতি, একাডেমিক সংগ্রাম, গবেষণার অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে কথা হয় রাইজিংবিডি ডটকমের সঙ্গে। এই বিশেষ প্রতিবেদনটিতে উঠে এসেছে তাদের সেই সংগ্রাম, সাহস আর স্বপ্নের কথা।
স্বপ্নের জায়গায় দায়িত্বের আসনে
কবির হোসেন: প্রভাষক, পরিসংখ্যান বিভাগ
আমি কবির হোসেন। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশব্বিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের ২০১৬-১৭ সেশনের শিক্ষার্থী। আমি ৪ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে পরিসংখ্যান বিভাগে প্রভাষক হিসেবে জয়েন করেছি।
নিজ ক্যাম্পাসে শিক্ষক হিসেবে ফিরে আসাটা আমার জন্য অত্যন্ত গর্বের ও আবেগের বিষয়। যে প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষার্থী হিসেবে স্বপ্ন গড়েছি, আজ সেই প্রতিষ্ঠানেই শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সুযোগ পাওয়া আল্লাহর বিশেষ নেয়ামত বলে মনে করি। এই যাত্রায় পরিবার, শিক্ষকমণ্ডলী ও শুভানুধ্যায়ীদের দোয়া ও অনুপ্রেরণা সবসময় আমাকে এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে। ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান উন্নয়ন, গবেষণা কার্যক্রম ও শিক্ষার্থীদের দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যেতে চাই-এই প্রত্যয় থেকেই আজকের পথচলা।
সাবিহা তাসমিম: প্রভাষক, তথ্য বিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগ
নিজ বিভাগে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হওয়া আমার জীবনের এক গভীর অর্থবহ ও স্মরণীয় মুহূর্ত। যে শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার্থী হিসেবে জ্ঞানার্জনের সূচনা হয়েছিল, আজ সেই একই পরিসরে শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ, এটি নিঃসন্দেহে গর্বের, পাশাপাশি দায়িত্ববোধকে নতুনভাবে উপলব্ধি করার উপলক্ষ। এই দায়িত্বকে আমি কেবল একটি ব্যক্তিগত অর্জন হিসেবে নয়, বরং নিজ বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভাগের সার্বিক অগ্রগতিতে সক্রিয়ভাবে ভূমিকা রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে দেখি।
শিক্ষকতা আমার কাছে একটি মহৎ ও মানবিক দায়িত্ব। একজন শিক্ষক শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদানেই সীমাবদ্ধ নন; গবেষণা, চিন্তাচর্চা ও জ্ঞান সৃষ্টির মধ্য দিয়ে তিনি একটি প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেন। সেই উপলব্ধি থেকেই আমি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও গবেষণাভিত্তিক শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে আগ্রহী।
নতুন শিক্ষক হিসেবে আমার প্রধান লক্ষ্য হবে আধুনিক জ্ঞান, গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা ও বাস্তবমুখী দক্ষতার সমন্বয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাসী ও ভবিষ্যতমুখী করে গড়ে তোলা। একই সঙ্গে আমি নিজেও নিয়মিত গবেষণায় যুক্ত থেকে আন্তর্জাতিক মানের জার্নালে প্রকাশনার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিচিতি ও গবেষণার পরিসর সম্প্রসারণে সহযোগিতা করতে চাই। সহকর্মীদের সঙ্গে সমন্বিতভাবে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা এবং বিভাগীয় একাডেমিক উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী করাও আমার অগ্রাধিকারের মধ্যে থাকবে।
ভবিষ্যতে উচ্চতর গবেষণা, জ্ঞান সৃষ্টির ধারাবাহিকতা এবং শিক্ষার্থীদের গবেষণামুখী করে গড়ে তোলাকে আমি বিশেষ গুরুত্ব দিতে চাই। ব্যক্তিগত একাডেমিক উন্নয়নের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের মানোন্নয়ন, গবেষণা সংস্কৃতি বিকাশ এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরিচিতি বৃদ্ধিতে নিজের সর্বোচ্চ শ্রম ও নিষ্ঠা নিবেদন করাই আমার দৃঢ় প্রত্যয়।
এই পথচলায় সর্বাগ্রে কৃতজ্ঞতা জানাই মহান স্রষ্টার প্রতি। গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানাই আমার পরিবারকে, যাদের অবিচল সমর্থন ও অনুপ্রেরণা আমাকে এই অবস্থানে পৌঁছাতে সহায়তা করেছে। আমার সব শ্রদ্ধেয় শিক্ষক, সহকর্মী এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা, তাদের আস্থা, দিকনির্দেশনা ও সহযোগিতাই আমাকে আজকের এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণের সুযোগ করে দিয়েছে।
জাহিদুল হাসান: প্রভাষক, অ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রি অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ
আমি ২০১২–১৩ শিক্ষাবর্ষের ৮ম ব্যাচের একজন শিক্ষার্থী ছিলাম। অনার্স-মাস্টার্স উভয় পর্যায়েই প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেছি। অনার্সে আমার সিজিপিএ ছিল ৩.৮৮ এবং মাস্টার্সে ৩.৯৪। এ পর্যন্ত আমার দুটি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।
২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে আমি জাপানে দুই সপ্তাহব্যাপী একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের সুযোগ পাই। আমার থিসিস গবেষণা সম্পন্ন করেছি বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনে। পরবর্তীতে বেক্সিমকো ফার্মার রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট টিমে টানা পাঁচ বছর কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। আলহামদুলিল্লাহ, বর্তমানে আমি প্রভাষক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছি।
এটি এক অসাধারণ অনুভব—যা কেবল সেই মানুষটিই পুরোপুরি বুঝতে পারবেন, যার জীবনে এই অর্জন এসেছে। আমার আন্তরিক প্রত্যাশা, বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আসবে, তারা এসব দেখে আরো অনুপ্রাণিত হবে। গবেষণায় এগিয়ে আসবে, ভালো ফলাফল অর্জনের পাশাপাশি গবেষণার ক্ষেত্রেও নিজেদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখবে। ইনশা আল্লাহ, ভবিষ্যতে নোবিপ্রবি সব দিক থেকেই আরো সমৃদ্ধ ও গৌরবময় হয়ে উঠবে।
মো. জুবায়ের আলম রাফি: প্রভাষক, ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজি
এই ক্যাম্পাসে প্রথম দিন পা রাখার স্মৃতিটা আজও খুব স্পষ্ট। একজন নতুন শিক্ষার্থী হিসেবে বুকভরা স্বপ্ন আর অজানা ভয় নিয়ে আমি তখন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুমে ঢুকেছিলাম। প্রতিদিন শিক্ষকের সামনে বসে ভাবতাম আমি কি পারব! আমি কি নিজেকে প্রমাণ করতে পারব! সময়ের সঙ্গে সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই গড়ে উঠেছে আমার পথ। এই বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দেয়নি, দিয়েছে আত্মবিশ্বাস, শিখিয়েছে অধ্যবসায় আর দায়িত্ব নিতে। ল্যাবে রাত কাটানো, গবেষণার জন্য লড়াই, ব্যর্থতা থেকে আবার দাঁড়ানো, এসবের মধ্য দিয়েই আমি ধীরে ধীরে নিজেকে প্রস্তুত করেছি। ছাত্রজীবনে যাদের দিকে তাকিয়ে অনুপ্রাণিত হয়েছি, আজ তাদের পাশেই দাঁড়িয়ে কাজ করছি এ অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
শিক্ষার্থী থেকে শিক্ষক হওয়ার এই যাত্রা আমার কাছে কেবল একটি পেশাগত পরিবর্তন নয়, এটি এক ধরনের ঋণ শোধ করার সুযোগ। যে বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে গড়ে তুলেছে, আজ সেই বিশ্ববিদ্যালয়েই ফিরে এসে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন দেখাতে পারা আমার জন্য এক গভীর দায়িত্ব ও ভালোবাসার বিষয়।
আজ যখন একই ক্লাসরুমে শিক্ষক হিসেবে দাঁড়াই, তখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে নিজের ছাত্রজীবনের দিনগুলো। মনে হয়, আমি যেন আমারই পুরোনো স্বপ্নগুলোর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি।
ক্যাম্পাস বদলায়নি, দেয়ালগুলো একই আছে কিন্তু বদলেছে আমার পরিচয়, আর বহুগুণ বেড়েছে দায়বদ্ধতা। নিজের ক্যাম্পাসে শিক্ষক হতে পারা আমার জীবনের সবচেয়ে আবেগঘন অধ্যায়গুলোর একটি। এটি আমাকে প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয় স্বপ্ন সত্যি হয়, যদি মানুষ নিজের শেকড় ভুলে না যায়।
ক্যাম্পাস বদলায়নি, দেয়ালগুলো একই আছে—শুধু বদলেছে পরিচয়, আর বহুগুণ বেড়েছে দায়বদ্ধতা। নোবিপ্রবির এই চার সাবেক শিক্ষার্থীর শিক্ষক হয়ে ফেরা তাই শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; স্বপ্নের পথে আর এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া।