ক্যাম্পাস

জাবি শিক্ষার্থীদের নির্মিত শর্টফিল্ম ‘দ্য হেইজ’য়ের জয়যাত্রা

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হয় সংস্কৃতির রাজধানী। কিন্তু, এখানকার সংস্কৃতি চর্চা কি কেবল শ্রেণিকক্ষ আর মুক্তমঞ্চের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ? না। এখানকার পিচঢালা পথ, রিকশাচালক, চা-ওয়ালা, শিক্ষক আর শিক্ষার্থী—সবাই মিলেমিশে একাকার হয়ে যে ‘জীবন্ত’ ক্যানভাস তৈরি করে, সেই ক্যানভাস থেকেই জন্ম নেয় এক একটি অসাধারণ গল্প। সেই গল্পেরই এক উজ্জ্বল উদাহরণ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘দ্য হেইজ’ (The Haze)।

জাবির তরুণ শিক্ষার্থীদের সংগঠন ‘বাংলা থিয়েটার’-এর প্রযোজনায় নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি সম্প্রতি গ্রিসে অনুষ্ঠিত ‘এথেন্স ইন্টারন্যাশনাল মান্থলি আর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ২০২৫’-এ সেরা অরিজিনাল স্কোর ও সাউন্ডট্র্যাক বিভাগে ‘অনারেবল মেনশন’ অর্জন করেছে। কিন্তু এই পুরস্কারের পেছনের গল্পটি কেবল একটি ট্রফি জেতার নয়; এটি একটি ক্যাম্পাসের সম্মিলিত সাহসের গল্প।

‘বাংলা থিয়েটার’-এর এই যাত্রায় কোনো ‘স্টার’ নেই, বরং সবাই শিল্পী। ‘দ্য হেইজ’ এর কাস্টিং লিস্টে চোখ রাখলেই তার প্রমাণ মেলে। চলচ্চিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন ক্যাম্পাসের পরিচিত মুখ, রিকশাচালক চান মিয়া। আবার তার সঙ্গেই অভিনয় করেছেন বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তারেক রেজা।

বিষয়টি নিয়ে চলচ্চিত্রটির নির্মাতা ও সম্পাদক নাসির খন্দকার বলেন, “আসলে শিল্পের মাঠে এসে বাংলা থিয়েটার সবাইকে নিয়ে হেঁটেছে। আমাদের এই যাত্রায় ক্যাম্পাসের রিকশাচালক থেকে শুরু করে শিক্ষক-সবাই সমান অংশীদার। দ্য হেইজ-এর সেটে এই মেলবন্ধনই ছিল আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।”

১৬ মিনিটের চলচ্চিত্র ‘দ্য হেইজ’। পুরো ছবি সাদা-কালো। কোনো সংলাপ নেই। কিন্তু সংলাপ নেই বলে কি গল্প থেমে থাকে? নির্মাতা নাসির খন্দকার ও তার দল সেই চ্যালেঞ্জটিই নিয়েছেন। তারা সংলাপের বদলে বেছে নিয়েছেন শব্দ বা মিউজিককে।

একজন চেইন-স্মোকারের মানসিক বিপর্যয়, নিকোটিন ছাড়ার যন্ত্রণা আর হতাশার গল্প এটি। মনস্তাত্ত্বিক এই ভাঙন ফুটিয়ে তুলতে ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরই হয়ে উঠেছে প্রধান ভাষা। আর ঠিক এই জায়গাতেই বাজিমাত করেছে ছবিটি। গ্রিসের উৎসবে পুরস্কার এসেছে সেরা সাউন্ডট্র্যাকের ঝুলিতে।

ছবিটির সংগীত পরিচালক অনিরুদ্ধ হৃদয় বলেন, “আমরা মিউজিককে এখানে সংলাপের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করিনি, বরং মিউজিকই এখানে গল্প বুনেছে। ১৬ মিনিট ধরে দর্শককে শুধু শব্দের জাদুতে আটকে রাখা কঠিন ছিল, কিন্তু আমরা সেই ঝুঁকিটা নিয়েছিলাম।”

শুটিংয়ের নেপথ্য গল্প: সীমাবদ্ধতায় সৃজনশীলতা

বিশ্বজয়ের গল্পগুলো সব সময় জাঁকজমকপূর্ণ হয় না, অনেক সময় তা হয় চরম সীমাবদ্ধতার মধ্যেও স্বপ্ন দেখার। ২০২৪ সালের জুন মাস। পকেটে বাজেট নগণ্য। কিন্তু স্বপ্ন আকাশছোঁয়া। গল্পের প্রয়োজনে একটি গাড়ির দরকার। গাড়ি কোথায় পাওয়া যাবে? এগিয়ে এলেন অধ্যাপক তারেক রেজা, শুটিংয়ের জন্য দিলেন নিজের গাড়ি।

ক্যামেরার পেছনে ছিলেন নাবিল মোস্তফা। মীর মশাররফ হোসেন হল, বাংলা বিভাগ আর মুরাদ চত্বরে ঘাম ঝরানো পরিশ্রম শেষে ফুটেজ জমা হলো। এরপর শুরু হলো আরেক যুদ্ধ। টানা চার মাস ধরে চলল মিউজিক কম্পোজিশন। অবশেষে নভেম্বরে তৈরি হলো ফাইনাল কাট।

মূল গল্পের লেখক সজল দাস বলেন, “বাংলা থিয়েটারের কর্মীদের স্বপ্ন আর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের নিরলস পরিশ্রমের ফসল এই ছবি। আমাদের বাজেট ছিল সীমিত, কিন্তু আত্মবিশ্বাস ছিল অটুট।” বাংলা থিয়েটারের গৌরবময় পথযাত্রা

শিল্প, সাহিত্য ও সৃজনশীলতা; এই মন্ত্র নিয়ে ২০২২ সালের পহেলা বৈশাখে যাত্রা শুরু করেছিল ‘বাংলা থিয়েটার’। গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে কিছু করার ‘স্পর্ধা’ তাদের ছিল শুরু থেকেই। মঞ্চে জসীম উদ্দীনের ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’, মধুসূদনের ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ কিংবা চর্যাপদ অবলম্বনে গীতিনাট্য; সবখানেই তারা দেখিয়েছে নিরীক্ষার সাহস। মঞ্চের গণ্ডি পেরিয়ে এখন তারা ভিজুয়াল মিডিয়াতেও সরব। ‘দ্য হেইজ’ ছাড়াও তাদের অপর প্রযোজনা সাজ্জাদুল শুভর ‘হাফ টু ইনফিনিটি’ ইতালি ও ভারতে প্রদর্শিত হয়েছে। ‘দ্য হেইজ’ এর ঝুলিতেও জমা হয়েছে ভারতের ‘সিক্সথ ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল স্টার ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল অ্যাওয়ার্ডস’ এবং কলকাতার ‘আমাদের ইন্টারন্যাশনাল শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল’-এর অফিসিয়াল সিলেকশন।

ভবিষ্যতে যাত্রা

গোলাম ফারুক জয়, উর্মি চক্রবর্তী, জারিন লামিয়া, মো. নুরুজ্জামান, নুসরাত নিপা, রিশা এরিন, আল ইমরান- এরা সবাই বাংলা থিয়েটারের এই স্বপ্নের সারথী। সংগঠনের অন্যতম উদ্যোক্তা ও অভিনেতা গোলাম ফারুক জয় বলেন, “শুরুর সময় আমাদের কোনো বড় পরিকল্পনা ছিল না। ছিল শুধু স্বপ্ন আর সৎ উদ্দেশ্য। আজ এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রমাণ করে- সেই স্বপ্নগুলো বৃথা যায়নি।”

নির্মাতা নাসির খন্দকার শেষ করলেন আশার কথা শুনিয়ে। তিনি বলেন, “আমাদের স্লোগান- দৃশ্যে গাঁথি শিল্পের সুর, মুক্ত করি প্রাণ। এই অর্জন আমাদের দায়িত্ব বাড়িয়ে দিল। আমরা বিশ্বাস করি, ক্যাম্পাসভিত্তিক এই শিল্প আন্দোলন একদিন বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নাম আরও উজ্জ্বল করবে।”

আন্তর্জাতিক সম্মাননা জয়ের মধ্য দিয়ে লাল ইটের দালান আর সবুজ প্রকৃতির ক্যাম্পাস জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল তরুণ শিক্ষার্থী প্রমাণ করলেন- গল্প যদি শক্তিশালী হয়, আর পাশে যদি থাকে সতীর্থদের কাঁধ, তবে সাফল্যের পথে বাজেট বা সরঞ্জামের অভাব কোনো কিছুই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।