আর্সেনিক বললেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে চর্মরোগ বা ক্যানসারের মতো ভয়াবহ কিছু ব্যাধির ছবি। কিন্তু, গবেষণাগারের সাম্প্রতিক এক চাঞ্চল্যকর তথ্য আমাদের হৃদযন্ত্রের সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে ভাবাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞান সাময়িকী 'কিমোস্ফিয়ার' (Chemosphere)-এ প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্র বলছে, পানীয় জলের আর্সেনিক কেবল বাহ্যিক রোগ নয়, সরাসরি হানা দিচ্ছে আমাদের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ায়। এমনকি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) নির্ধারিত মাত্রার চেয়েও কম আর্সেনিক শরীরের দীর্ঘমেয়াদী উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশনের প্রধান কারণ হতে পারে।
গবেষণার নেপথ্যে জাপানের জিচি মেডিকেল ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক, যার নেতৃত্বে ছিলেন ড. মো. শিবলুর রাহমান; যিনি দীর্ঘদিন ধরে আর্সেনিক ও উচ্চ রক্তচাপের এই যোগসূত্র নিয়ে কাজ করেছেন। তারা মূলত এটি বোঝার চেষ্টা করেছেন, আর্সেনিক কীভাবে শরীরের অত্যন্ত জটিল এক ফিজিওলজিক্যাল সিস্টেম 'রেনিন-অ্যাঞ্জিওটেনসিন সিস্টেম' (RAS)-কে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এই সিস্টেমটিই আমাদের শরীরে রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখার মূল কারিগর।
আমাদের শরীরে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের দুটি দিক বা 'অক্ষ' রয়েছে। একটি হলো 'ক্লাসিক্যাল অ্যাক্সিস', যা রক্তচাপ বাড়াতে সাহায্য করে। অন্যটি হলো 'ভাসোপ্রোটেক্টিভ অ্যাক্সিস', যা রক্তচাপ কমিয়ে ভারসাম্য রক্ষা করে।
বিজ্ঞানীদের মতে, আর্সেনিক শরীরে প্রবেশ করার পর এই রক্ষাকারী বা ভাসোপ্রোটেক্টিভ অক্ষের 'ACE2' নামক একটি এনজাইমের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। এর ফলে রক্তচাপ কমানোর প্রক্রিয়াটি থমকে যায় এবং অন্যদিকে রক্তচাপ বাড়ানোর জন্য দায়ী এনজাইমগুলো দ্বিগুণ উৎসাহে কাজ শুরু করে। ফলে শরীর তার স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উচ্চ রক্তচাপের শিকার হয়।
গবেষণাটিতে দেখানো হয়েছে দীর্ঘমেয়াদী অল্প মাত্রার আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করাও কতটা বিপজ্জনক হতে পারে। গবেষণাটি করা হয়েছে ইঁদুরের ওপর এবং একই সাথে মানুষের রক্তনালীর কোষ (HUVECs) ব্যবহার করে।
পরীক্ষায় দেখা গেছে, পানিতে মাত্র ৮ পিপিবি (parts per billion) আর্সেনিক থাকলেও তা রক্তচাপ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পানীয় জলে আর্সেনিকের সর্বোচ্চ সহনীয় মাত্রা নির্ধারণ করেছে ১০ পিপিবি। অর্থাৎ, নিরাপদ মাত্রার নিচে থাকা পানিও দীর্ঘদিন পানে শরীরে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
আর্সেনিক কেবল হরমোনের ভারসাম্যই নষ্ট করে না, এটি রক্তনালীর কোষে এক ধরণের 'অক্সিডেটিভ স্ট্রেস' বা বিষক্রিয়া তৈরি করে। এর ফলে রক্তনালীতে প্রদাহ (inflammation) শুরু হয় এবং রক্তনালীর স্থিতিস্থাপকতা নষ্ট হয়ে যায়। সহজ কথায়, রক্তনালীগুলো আগের মতো সংকুচিত বা প্রসারিত হতে পারে না, যা শেষ পর্যন্ত হৃদরোগের ঝুঁকি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।
এই গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাপত্রটির মৌলিকতা ও জনস্বাস্থ্যগত গুরুত্বের কারণে ২০২৪ সালে জাপানের জিচি মেডিকেল ইউনিভার্সিটি থেকে Most Valuable Paper Award অর্জন করেছে।
বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশের কয়েক কোটি মানুষ এখনো আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করছে। আগে ধারণা করা হতো আর্সেনিকের প্রভাব কেবল চামড়ায় বা ক্যানসারে সীমাবদ্ধ। কিন্তু, এই গবেষণা প্রমাণ করছে যে, অসংক্রামক রোগ যেমন উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের বাড়বাড়ন্তের পেছনে মাটির নিচের এই বিষাক্ত মৌলটির বড় ভূমিকা রয়েছে।
গবেষকরা বলছেন, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের প্রচলিত ওষুধগুলো হয়তো সবার ক্ষেত্রে কার্যকর নাও হতে পারে, যদি শরীরে আর্সেনিকের বিষক্রিয়া থেকে যায়। তাই পানীয় জলের গুণমান নিশ্চিত করা এবং আর্সেনিকমুক্ত পানি পান করাই হলো এই মরণফাঁদ থেকে বাঁচার একমাত্র উপায়। একই সাথে, শরীর থেকে আর্সেনিকের প্রভাব দূর করতে পারে এমন নতুন ধরণের থেরাপি নিয়ে আরও নিবিড় গবেষণার ওপর জোর দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
মাটির নিচের এই 'নীরব ঘাতক' রুখতে জনসচেতনতা এবং উন্নত পানি ব্যবস্থাপনাই হতে পারে আমাদের আগামী দিনের রক্ষাকবচ।
তথ্যসূত্র: https://doi.org/10.1016/j.chemosphere.2023.137911