ক্যাম্পাস

১৪ বছর নিখোঁজ ইবির দুই শিক্ষার্থী, বিচারের দাবিতে মানববন্ধন

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) দুই শিক্ষার্থী নিখোঁজের ঘটনার ১৪ বছর পার হলেও আজও শেষ হয়নি তাদের পরিবারের অপেক্ষা। গুম হওয়া দুই শিক্ষার্থী হলেন দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের মো. ওয়ালিউল্লাহ এবং আল-ফিকহ অ্যান্ড ল বিভাগের আল মুকাদ্দাস। দীর্ঘদিন ধরেই তাদের সন্ধান ও বিচার দাবিতে ক্যাম্পাসে মানববন্ধন, ধর্মঘটসহ নানা কর্মসূচি পালন করে আসছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

এরই ধারাবাহিকতায় বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী মানববন্ধন করেন।

মানববন্ধনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা ‘ওলি ভাই ফিরবে কবে, গুম কমিশন জবাব দে’, ‘মুকাদ্দাস ভাই ফিরবে কবে, ইন্টারিম জবাব চাই’, ‘আমার ভাই গুম কেন, জবাব চাই জবাব চাই’, এমন নানা স্লোগান দেন।

এ সময় আল-ফিকহ অ্যান্ড ল বিভাগের শিক্ষার্থী ও শাখা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি রাশেদুল ইসলাম বলেন, “২০১২ সালে ঢাকার সাভার এলাকা থেকে ওয়ালিউল্লাহ ও আল মুকাদ্দাস ভাইকে গুম করা হয়। ৫ আগস্টের পর ভেবেছিলাম হয়তো আমাদের ভাইরা ফিরে আসবেন, কিন্তু সেই অপেক্ষার অবসান হয়নি। গত ১৭ বছরে ওয়ালিউল্লাহ ও মুকাদ্দাস ভাইসহ যতজন গুম হয়েছেন, তাদের সবার বিচার নিশ্চিত করতে হবে। বিচার না হলে দেশে আবারো গুম-খুনের সংস্কৃতি চালু হতে পারে। এই সংস্কৃতি বন্ধ করতে হলে অবশ্যই বিচার করতে হবে, নইলে আমরা আপনাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াব।”

২০১২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ক্যাম্পাসে ফেরার উদ্দেশ্যে ঢাকা কল্যাণপুর থেকে হানিফ পরিবহনের একটি বাসে ওঠেন ওয়ালিউল্লাহ ও মুকাদ্দাস। রাত সাড়ে ১১টায় বাসটি যাত্রা শুরু করে। আনুমানিক রাত ১টার দিকে সাভারের নবীনগরে পৌঁছালে বাসটি হঠাৎ থামানো হয়। এ সময় র‍্যাব-৪ লেখা একটি কালো গাড়ি থেকে র‍্যাবের পোশাক পরিহিত ৮–১০ জন সদস্য ও কয়েকজন সাদা পোশাকধারী ব্যক্তি বাসে ওঠেন। তারা নিজেদের র‍্যাব ও ডিবি পরিচয় দিয়ে যাত্রীদের মাঝ থেকে ওয়ালিউল্লাহ ও মুকাদ্দাসকে নামিয়ে নিয়ে যান। এরপর থেকে তাদের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

ঘটনার কয়েক দিন পর, ৮ ফেব্রুয়ারি মুকাদ্দাসের পরিবার ঢাকার আশুলিয়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন এবং পরে হাইকোর্টে রিটও দায়ের করা হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গোপন বন্দিশালা থেকে অনেক গুম হওয়া ব্যক্তিকে উদ্ধার করা হলেও ওয়ালিউল্লাহ ও মুকাদ্দাসের সন্ধান আজও মেলেনি।

তারা কোথায় আছেন, বেঁচে আছেন নাকি হত্যা করা হয়েছে, এই প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর আজও রাষ্ট্রপক্ষ দিতে পারেনি। দীর্ঘ অপেক্ষার পরও কোনো অগ্রগতি না থাকায় সবার মনে প্রশ্ন উঠছে, তারা কি আর কখনো ফিরবেন না? এ বিষয়ে তথ্য অনুসন্ধানের জন্য পূর্বে গঠিত ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি পুনর্গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কমিটিকে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে জানা গেছে।

এদিকে সন্তান ফেরার আশায় ১৪ বছর ধরে দিন গুনছেন ওয়ালিউল্লাহর বাবা-মা। ঝালকাঠির কাঁঠালিয়া উপজেলার পশ্চিম শৌলজালিয়া গ্রামের বাসিন্দা ওয়ালিউল্লাহ ছিলেন সাত ভাইবোনের মধ্যে পঞ্চম। তিনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স শেষ করে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত ছিলেন। পাশাপাশি শাখা ছাত্রশিবিরের অর্থ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার পরিবার ধারণা করছে, হয়তো তাদের সন্তানকে হত্যা করা হয়েছে।

মুকাদ্দাস পিরোজপুর সদর উপজেলার খানাকুনিয়ারী গ্রামের মাওলানা আবদুল হালিম ও আয়শা সিদ্দিকার জ্যেষ্ঠ সন্তান। তিনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আল-ফিকহ অ্যান্ড ল বিভাগের অনার্স চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন এবং শাখা ছাত্রশিবিরের সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। নিখোঁজ সন্তানের সন্ধানে তার পরিবার একাধিকবার ঢাকায় ‘মায়ের ডাক’ কর্মসূচিতেও অংশ নেন, তবে কোনো ফল মেলেনি।

মুকাদ্দাসের বাবা বলেন, “গুম বা নিখোঁজ হওয়া সন্তানের সন্ধান দেওয়া রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। আমার ছেলের কী অপরাধ ছিল? সে আজ মৃত না জীবিত, এটা জানার অধিকার কি আমাদের নেই?”