গ্রামের মাটির সোঁদা গন্ধ আর মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারের সীমাবদ্ধতার ভেতরেই বেড়ে ওঠা মোঃ আল-মামুনের জীবন ছিল সংগ্রামের গল্পে ভরা। ছোটবেলা থেকেই তিনি দেখেছেন বাবা-মায়ের নিরন্তর পরিশ্রম, স্বপ্ন আর বাস্তবতার টানাপোড়েন। সেই দৃশ্যই তার মনে গেঁথে দেয় এক অদম্য প্রতিজ্ঞা; একদিন বড় হয়ে বাবা-মায়ের সব কষ্ট লাঘব করবেন, পূরণ করবেন তাদের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই তিনি এগিয়ে যান। ফলাফল; ৪৬তম বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারে মেধাতালিকায় ৭০তম স্থান অর্জন করে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন তিনি।
অনুপ্রেরণা ও লক্ষ্য
আল-মামুনের বিসিএস যাত্রার পেছনে অনুপ্রেরণার বড় উৎস ছিলেন তার কাকা, যিনি প্রশাসন ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা। কাকার মুখে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, দুর্নীতিবিরোধী অভিযান ও জনসেবার অভিজ্ঞতার গল্প শুনে তার মনেও দেশসেবার স্বপ্ন জাগে।
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক সম্পন্ন করার পর নিশ্চিত করপোরেট ক্যারিয়ারের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি বিসিএসের প্রস্তুতিতে ঝুঁকে পড়েন। আর্থিক টানাপোড়েন উপেক্ষা করে বেসরকারি চাকরির প্রলোভন এড়িয়ে স্বপ্নের পেছনে ছুটে চলাই ছিল তার জীবনের অন্যতম বড় সিদ্ধান্ত। প্রস্তুতির কৌশল ও শৃঙ্খলা
আল-মামুন বিশ্বাস করতেন ধারাবাহিক ও পরিকল্পিত প্রস্তুতিতে। প্রিলিমিনারি পরীক্ষার জন্য বিগত বছরের প্রশ্ন বিশ্লেষণ করে তৈরি করেছিলেন নিজস্ব স্টাডি প্ল্যান। বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র হয়েও বাংলা সাহিত্যের প্রতি তার গভীর অনুরাগ ছিল, যা পড়াশোনাকে আরো উপভোগ্য করে তুলেছিল।
লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র ও প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা ফজলে রাব্বীর পরামর্শ পান। উত্তরপত্রকে তথ্যবহুল ও উপস্থাপনযোগ্য করতে ডায়াগ্রাম, চার্ট ও পয়েন্ট আকারে লেখার কৌশল রপ্ত করেন। ভাইভা বোর্ডেও তাকে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জিং প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হয়েও কেন পররাষ্ট্র ক্যাডার পছন্দ কিংবা ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন কৌশল কী হতে পারে—এমন প্রশ্নের যুক্তিপূর্ণ ও আত্মবিশ্বাসী উত্তরে তিনি পরীক্ষকদের সন্তুষ্ট করতে সফল হোন।
ব্যর্থতা থেকে প্রত্যাবর্তন
তার সাফল্যের পথ মোটেও মসৃণ ছিল না। ৪৫তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা তাকে হতাশ করলেও দমিয়ে রাখতে পারেনি। এ সময় তিনি বিবাহিত এবং এক সন্তানের বাবা। পরিবার থেকে দূরে থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া ছিল মানসিকভাবে কঠিন এক অধ্যায়। তবে ‘আজকের কষ্টই আগামীর সুখ’এই বিশ্বাসে তিনি দ্বিগুণ উদ্যমে প্রস্তুতিতে মনোনিবেশ করেন।
মানবিক উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎ স্বপ্ন
করোনা মহামারির সময় বন্ধুদের নিয়ে গ্রামে ‘আধুনিক পাঠাগার’ প্রতিষ্ঠা এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা তার দৃষ্টিভঙ্গিতে নতুন মাত্রা যোগ করে। তিনি উপলব্ধি করেন, বৃহত্তর পরিসরে মানুষের সেবা করতে প্রশাসন ক্যাডার কার্যকর মাধ্যম। একজন ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে তার লক্ষ্য হবে গ্রামীণ নারীদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো এবং দুর্নীতিমুক্ত সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কাজ করা। ভবিষ্যতে নিজেকে তিনি একজন দক্ষ ও জনবান্ধব সচিব হিসেবে দেখতে চান।
অনুজদের জন্য বার্তা
নতুন পরীক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে মামুনের পরামর্শ, নিয়মিত পড়াশোনার পাশাপাশি মডেল টেস্ট দেওয়া জরুরি। নিজের দুর্বলতা চিহ্নিত করে তা কাটিয়ে ওঠাই সাফল্যের চাবিকাঠি। পড়াশোনার চাপ সামলাতে তিনি রান্না করতে ভালোবাসেন। সাহিত্যচর্চায় অনুপ্রেরণা পান মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখায়। পাশাপাশি The Shawshank Redemption চলচ্চিত্রের চরিত্র অ্যান্ডি ডুফ্রেইনের মতো তিনিও বিশ্বাস করেন প্রতিকূলতার মধ্যেও আশাকে আঁকড়ে ধরতে হয়।
মামুনের এই অর্জন শুধু একটি ক্যাডার পদ লাভ নয়; এটি অধ্যবসায়, ত্যাগ ও স্বপ্নপূরণের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, যা আগামী প্রজন্মের স্বপ্নবাজ তরুণদের সামনে সাহসের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।