ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) অনুষ্ঠিত হয়েছে ইসরায়েলি হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির গায়েবানা জানাজা।
রবিবার (১ মার্চ) রাত সাড়ে ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি চত্বরে এ জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় ইমামতি করেন ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম।
জানাজা শেষে ডাকসুর নেতৃত্বে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি ভিসি চত্বর থেকে শুরু হয়ে হলপাড়া ঘুরে টিএসসির সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যে গিয়ে শেষ হয়। পরে সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সমাবেশে ডাকসুর নেতারা বলেন, “দখলদারিত্ব যাদের একমাত্র নীতি, মানুষের অধিকার হরণ এবং অন্যের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাই যাদের লক্ষ্য সেই পশ্চিমা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মুসলিম বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।”
মানবতার মুক্তি, মুসলিম বিশ্বের স্বাধীনতা এবং মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সবাইকে এক কাতারে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তারা।
ডাকসু নেতারা আরো বলেন, “পৃথিবীর যেখানেই গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হয়েছে, সেখানেই আমেরিকা হস্তক্ষেপ করেছে। ইরানের ইসলামী বিপ্লবকে তারা সারা বিশ্বের জন্য একটি ‘রোল মডেল’ হিসেবে উল্লেখ করেন। একটি দেশের সর্বোচ্চ নেতাকে লক্ষ্য করে হামলাকে তারা অ-গণতান্ত্রিক আচরণ।”
ডাকসুর ছাত্র পরিবহন সম্পাদক আসিফ আব্দুল্লাহ বলেন, “দীর্ঘদিনের উপনিবেশবাদী শাসনের অবসান আসন্ন। এশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে পশ্চিমা আগ্রাসনের যে ধারাবাহিকতা চলছে, তার বিরুদ্ধে মুসলিম বিশ্ব ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়াবে। ফিলিস্তিন, ইরান, ইরাকসহ বিভিন্ন দেশে মুসলমানদের ওপর আগ্রাসন ও হত্যাযজ্ঞের বিষয়ে বিশ্ব মিডিয়া ও প্রভাবশালী মহলের নীরবতা প্রশ্নবিদ্ধ। এর বিরুদ্ধে মুসলিম বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।”
একই সঙ্গে বিশ্ব মানবতার পক্ষের সব মানুষকে ইরান ও ফিলিস্তিনের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “পশ্চিমা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এবং বিশ্ব মানবতার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। ভাই-বোনদের রক্তের ন্যায়বিচার না হওয়া পর্যন্ত রাজপথে থাকবো।”
ডাকসুর সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক মোসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ বলেন, “ইমাম খামেনির সংগ্রাম ছিল ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার পক্ষে একটি দৃঢ় ও দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান। তার শাহাদাতের যথাযথ স্বীকৃতি বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয়ভাবে দেওয়া উচিত ছিল।”
তিনি অভিযোগ করেন, সরকার ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে স্পষ্ট নিন্দা জানায়নি। তারেক রহমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইলের পক্ষে আমেরিকার পদলেহন করে বিবৃতি দিয়েছে।
তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “কাল বিলম্ব না করে বাংলাদেশের শান্তিপ্রিয় মানুষের আবেগ ও অনুভূতির প্রতি সম্মান জানিয়ে ইমাম খামেনির শাহাদাতে শোক প্রকাশ করুন এবং মার্কিন ও ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিন। আমরা ইমাম হোসাইনের সন্তান, ইমাম হাসানের সন্তান। আমরা শহীদ হব, কিন্তু মাথা নত করব না। ফিলিস্তিন মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত আমাদের লড়াই চলবে।”
ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, “আল্লাহ বলেছেন তিনি তাদের ভালোবাসেন যারা তার পথে সুশৃঙ্খলভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সংগ্রাম করে—যেন তারা সুদৃঢ় প্রাচীরের মতো। আজ সারা বিশ্বে মুসলমানদের ওপর জুলুম, নির্যাতন ও নিপীড়নের মূল কারণ হলো মুসলিম বিশ্বের বিভাজন। আমি বাংলাদেশ থেকে মুসলিম বিশ্বের যুবসমাজ ও রাষ্ট্রপ্রধানদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানাই। ঢাকা থেকে আমরা মুসলিম বিশ্বের আজাদ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেব, ইনশাআল্লাহ। ফিলিস্তিন মুক্ত হবে, কাশ্মীরের মজলুমরা আজাদী পাবে, রাখাইনের মজলুমরা মুক্তি পাবে, ইরানের মজলুমরা মুক্তি পাবে।”
গত বছরের ১২ দিনব্যাপী ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধ ও পরবর্তী আলোচনা প্রসঙ্গে টেনে তিনি বলেন, “আমরা ভেবেছিলাম কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধ বন্ধ হবে। কিন্তু, আলোচনা চলাকালেই ইসরায়েল ও মার্কিনিরা নিরীহ মানুষের ওপর হামলা চালিয়েছে।”
বছরের পর বছর ফিলিস্তিনে নিরীহ মানুষের ওপর হামলা হয়েছে। গাজা আজ উন্মুক্ত কারাগারে পরিণত হয়েছে। ইসমাইল হানিয়াকে আমরা হারিয়েছি। এখন ইরানেও আগ্রাসন চালিয়ে আমাদের মুক্তি আন্দোলনের নেতা ইমাম খামেনিকে শহীদ করা হয়েছে। তারা ভেবেছিল নেতাদের শহীদ করে আদর্শ থামিয়ে দেওয়া যাবে। কিন্তু সারা বিশ্বের মজলুমরা সেই আদর্শ ধারণ করবে, বলেও জানান সাদিক কায়েম।
সাদিক কায়েম বলেন, “আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ না হই, আজ ইরানে যে হামলা হচ্ছে, কাল তা আমাদের ওপরও আসবে। অন্যায়, জুলুম, আগ্রাসন, সাম্রাজ্যবাদ ও জায়নবাদের বিরুদ্ধে আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে কথা বলতে হবে।”
জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সনদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “তাদের অনেক মানবাধিকার সনদ আছে, আইসিসিসহ নানা কনভেনশন। কিন্তু বাস্তবে নিরীহ মানুষ হত্যা বন্ধ হয়নি। পশ্চিমা আগ্রাসন ও মুসলিমদের ওপর হওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে। আমরা মুসলিম যুবকরা বেঁচে থাকতে বসে থাকব না। অন্যায়, জুলুম ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ লড়াই চলবে। ইনশাআল্লাহ, সারা বিশ্বে ইনসাফ কায়েম হবে।”