আজ ১৩ মার্চ, শহীদ রাজু দিবস। ১৯৯২ সালের এই দিনে বসন্তের এক উত্তপ্ত দুপুরে অস্ত্রের ঝনঝনানি আর বারুদের গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাস। সেই অস্থির সময়েই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন এক তরুণ মঈন হোসেন রাজু। তার আত্মত্যাগের তিন দশক পেরিয়ে গেলেও আজও টিএসসির মোড়ে সগৌরবে দাঁড়িয়ে থাকা ‘সন্ত্রাসবিরোধী রাজু স্মারক ভাস্কর্য’ শিক্ষার্থীদের সাহস জোগায়।
রক্তাক্ত দুপুরের প্রেক্ষাপট
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতি এক অস্থির সময় পার করছিল। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের পর গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে আসার কথা থাকলেও, বিভিন্ন ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের দাপট বাড়তে থাকে।
১৯৯২ সালের ১৩ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তৎকালীন ছাত্রদল ও ছাত্রলীগের মধ্যে প্রকাশ্য বন্দুকযুদ্ধ শুরু হয়। এতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে পড়ে।
সে সময় ছাত্র ইউনিয়নের নেতা মঈন হোসেন রাজু ক্যাম্পাসে সন্ত্রাস ও অস্ত্রের রাজনীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। চারদিকে গুলির শব্দে যখন শিক্ষার্থীরা আতঙ্কে ছুটছিলেন, তখন রাজুর নেতৃত্বে একদল তরুণ সন্ত্রাসবিরোধী স্লোগান নিয়ে মিছিল বের করেন।
মিছিলটি টিএসসির সামনে পৌঁছালে সন্ত্রাসীদের ছোড়া একটি গুলি রাজুর কপালে বিদ্ধ হয়। মুহূর্তেই তিনি লুটিয়ে পড়েন। সেই রক্তাক্ত ঘটনাই পরে সন্ত্রাসমুক্ত ক্যাম্পাসের স্বপ্নকে নতুনভাবে সামনে নিয়ে আসে।
প্রতিবাদের স্মারক: রাজু ভাস্কর্য
রাজুর মৃত্যুর পর পুরো ক্যাম্পাসে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা তার স্মৃতিকে ধরে রাখতে একটি ভাস্কর্য নির্মাণের দাবি তোলেন। নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে ১৯৯৭ সালে ভাস্কর্য নির্মাণের কাজ শুরু হয়।
শিল্পী শ্যামল চৌধুরীর নকশায় তৈরি এই ভাস্কর্যে ফুটে ওঠে আটটি মানব অবয়ব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অর্থায়নে এটি নির্মিত হয়।
১৯৯৭ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক এ কে আজাদ চৌধুরী ভাস্কর্যটির উদ্বোধন করেন। এর পেছনে রাজুর ভাই ও তৎকালীন ছাত্র ইউনিয়ন নেতাদের উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ ছিল।
স্থাপত্যে প্রতীকী বার্তা
রাজু ভাস্কর্য কেবল একটি স্থাপনা নয়, এটি প্রতিবাদ ও ঐক্যের এক প্রতীক।
সম্মিলিত শক্তি: ভাস্কর্যের আটজন নারী-পুরুষ শিক্ষার্থী হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছেন, যা ঐক্যের শক্তিকে তুলে ধরে।
গতিশীলতা: ভঙ্গিতে মনে হয় তারা সামনে এগিয়ে চলেছেন, অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে এগিয়ে যাওয়ার প্রতীক।
অসাম্প্রদায়িকতা: শিক্ষার্থীদের পোশাক ও ভঙ্গিতে ফুটে উঠেছে বাংলার সাধারণ ছাত্রসমাজের চিত্র।
দৃঢ়তা: প্রতিটি অবয়বে দৃঢ় সংকল্পের প্রকাশ, ভয়কে অগ্রাহ্য করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর বার্তা।
প্রতিবাদের কেন্দ্রবিন্দু টিএসসি
গত তিন দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি মোড় এবং রাজু ভাস্কর্য দেশের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
কোটা সংস্কার আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন কিংবা নারী নির্যাতনের বিচারের দাবিসহ নানা ইস্যুতে শিক্ষার্থীদের সমাবেশ ও প্রতিবাদের সূচনা হয়েছে এখান থেকেই।
একজন প্রবীণ শিক্ষক বলেন, “রাজু আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়। আজ তিনি নেই, কিন্তু এই ভাস্কর্য প্রতিটি শিক্ষার্থীর ভেতর একজন রাজুকে জাগিয়ে তোলে।”
আদর্শ কি বিস্মৃতির পথে
প্রতি বছর ১৩ মার্চ ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হলেও অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, রাজুর আদর্শ কতটা ধারণ করা হচ্ছে? তার সহযোদ্ধারা মনে করেন, রাজু কেবল একটি ভাস্কর্য হয়ে থাকার জন্য প্রাণ দেননি। তিনি চেয়েছিলেন এমন এক শিক্ষাঙ্গন, যেখানে মেধার চর্চা হবে, অস্ত্রের নয়।
বর্তমান ছাত্র রাজনীতিতে পেশিশক্তির প্রভাব বাড়লে সেই আদর্শ কিছুটা ম্লান হওয়ার আশঙ্কাও দেখা দেয়। তবে শিক্ষার্থীরা যখনই অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হন, তখনই প্রমাণিত হয়, রাজু এখনো তাদের চেতনায় বেঁচে আছেন।
সংরক্ষণেও প্রয়োজন উদ্যোগ
সময়ের সঙ্গে রাজু ভাস্কর্যের গায়ে মলিনতার ছাপ পড়েছে। রোদ-বৃষ্টি ও ধুলোবালির কারণে এর রং ও টেক্সচার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক সময় বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানার-ফেস্টুনও এর নান্দনিকতা নষ্ট করে।
শিক্ষার্থীরা মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত এই স্মারকটির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৭-১৮ সেশনের শিক্ষার্থী মামুন অর রশিদ বলেন, “রাজু ভাস্কর্যের পাশ দিয়ে গেলে মনে পড়ে এই মাটির জন্যই একজন বড় ভাই জীবন দিয়েছেন। তার আত্মত্যাগ আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখায়।”
লোক প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী এইচ এম খালিদ হাসান বলেন, “রাজু ভাই যে ক্যাম্পাসের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেখানে অস্ত্রের ঝনঝনানি থাকার কথা ছিল না। আজ আমরা যখন অধিকার নিয়ে কথা বলি, তখন তার স্মৃতি আমাদের সাহস দেয়।”
টিএসসিতে আড্ডারত শিক্ষার্থী সৈকত বলেন, “দেশে কোথাও অন্যায় হলে আমাদের পা যেন নিজে থেকেই রাজু ভাস্কর্যের দিকে চলে আসে। এটি এখন প্রতিবাদের এক ধরনের ‘গুগল ম্যাপ’ হয়ে উঠেছে।”
বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী সিদরাতুল মুনতাহা আলিফ বলেন, “রাজু ভাস্কর্য আমাদের আবেগের জায়গা। কিন্তু, এখানে যত্রতত্র পোস্টার লাগিয়ে এর সৌন্দর্য নষ্ট করা হয়। প্রশাসনের উচিত এর পবিত্রতা বজায় রাখতে আরো কঠোর হওয়া।”
শহীদ মঈন হোসেন রাজু কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি একটি আদর্শের নাম। সন্ত্রাসবিরোধী রাজু স্মারক ভাস্কর্য সেই আদর্শেরই দৃশ্যমান প্রতীক।
যতদিন অন্যায়, বৈষম্য ও সন্ত্রাস থাকবে, ততদিন রাজুর আত্মত্যাগ স্মরণ করিয়ে দেবে, সত্য ও ন্যায়ের লড়াই কখনো শেষ হয় না।