ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই সংবিধিবদ্ধ ও আচার্য কর্তৃক অনুমোদিত থিওলজি অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদের অধীনে দুটি নতুন বিভাগ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখনো সেগুলোর চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। প্রস্তাবিত বিভাগ দুটি হলো আস-সিরাহ আন-নববীয়্যাহ এবং তুলনামূলক তাফসীর বিভাগ। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই ও ইতিবাচক প্রতিবেদন দেওয়ার পরও দীর্ঘদিন ধরে ইউজিসিতে ফাইলটি ঝুলে আছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় আইন ১৯৮০ (১৯৮০ সনের ৩৭ নম্বর আইন) এর ধারা ৩২(৩) ও (৪)-এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সংবিধি ১৯৮৩ (সংশোধিত-২০১১)-এর ৭১(খ) উপ-ধারা অনুযায়ী ইসলামিক ও তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব অনুষদের প্রথম অনুষদীয় সভার সুপারিশের ভিত্তিতে নতুন বিভাগ খোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের ১৩১তম সভার সিদ্ধান্ত (২২-খ) এবং ৩০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেটের ২৭১তম সভার অনুমোদনের মাধ্যমে ২০২৫–২০২৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে অনুষদটির অধীনে তিনটি নতুন বিভাগ চালুর নীতিগত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, নতুন বিভাগ চালুর জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন, সিলেবাস প্রণয়ন, অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল ও সিন্ডিকেটের অনুমোদনসহ অধিকাংশ প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। ইউজিসির বিশেষজ্ঞ দল সরেজমিনে পরিদর্শন করে ইতিবাচক মতামত দিলেও চূড়ান্ত অনুমোদন না পাওয়ায় এখনো পাঠদান শুরু করা যাচ্ছে না।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের থিওলজি অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদ ভবনে নতুন বিভাগগুলোর জন্য অফিস, শ্রেণিকক্ষ, সেমিনার লাইব্রেরি ও ল্যাবের জায়গা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি নির্মাণাধীন দশতলা ‘কবি গোলাম মোস্তফা অ্যাকাডেমিক ভবন’-এর কাজ শেষ হলে অন্যান্য বিভাগ সেখানে স্থানান্তর করা হবে। তখন নতুন বিভাগগুলোর জন্য পর্যাপ্ত একাডেমিক স্থান নিশ্চিত করা যাবে বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
জমিয়তে তালাবায়ে আরাবিয়া ইবি শাখার সাধারণ সম্পাদক মো. শামীম বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও অনুষদের ডিন দীর্ঘদিন ধরে ইউজিসির সঙ্গে যোগাযোগ করছেন অনুমোদনের জন্য। তবুও অনুমোদন না পাওয়া দুঃখজনক। এতে ইউজিসির কিছুটা উদাসীনতা দেখা যাচ্ছে। আমরা আশা করি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিষয়টি আরো গুরুত্ব দিয়ে দেখবে এবং এই সেশন থেকেই ভর্তি কার্যক্রম শুরু করার উদ্যোগ নেবে। পাশাপাশি যদি কোনো ধরনের গড়িমসি বা প্রতিবন্ধকতা থাকে, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বলেন, “প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই নতুন অনুষদ ও বিভাগ চালুর পরিকল্পনা ছিল। বর্তমানে দুটি বিভাগ চালুর জন্য অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল, সিন্ডিকেট ও ইউজিসিতে প্রস্তাবসহ সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। ইউজিসির তিন সদস্যের কমিটিও সরেজমিনে পরিদর্শন করে ইতিবাচক প্রতিবেদন দিয়েছে। কিন্তু সব শর্ত পূরণ হওয়ার পরও কোনো অদৃশ্য কারণে ফাইলটি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে, যা বোধগম্য নয়। এতে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে অযথা বিলম্ব হচ্ছে।”
ধর্মতত্ত্ব অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. সেকেন্দার আলী বলেন, “ইউজিসি থেকে অনুমোদনের চিঠি এখনো না আসায় বিভাগ দুটির সার্কুলার দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এই বছর নতুন দুটি বিভাগের কার্যক্রম শুরু হওয়ার সম্ভাবনাও দেখছি না, কারণ ইউজিসি থেকে গড়িমসি করা হচ্ছে। অনেকদিন অপেক্ষার পর ধর্মতত্ত্ব অনুষদের ভর্তি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। ইউজিসির চিঠি এলে পরে দুটি বিভাগ যুক্ত করে পুনরায় সার্কুলার দেওয়া হবে।”
এ বিষয়ে ইউজিসির পূর্ণকালীন সদস্য অধ্যাপক ড. তানজিমুদ্দিন খান বলেন, “নতুন বিভাগগুলোর বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ যাবতীয় প্রক্রিয়া ও যাচাই-বাছাই সম্পন্ন হয়েছে এবং বিষয়টি বর্তমানে ইউজিসির অনুমোদন প্রক্রিয়ায় রয়েছে। পরিদর্শক দলের প্রতিবেদনেও বিভাগ চালুর পক্ষে ইতিবাচক দিকগুলো উঠে এসেছে।
তিনি আরো বলেন, “কিছু কারিগরি ও প্রশাসনিক বিষয় রয়েছে, যা পরিদর্শক টিমের এখতিয়ারের বাইরে। সেগুলো আমরা পুনরায় যাচাই করছি। নতুন বিভাগ চালুর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সিলেবাস পাস করানোসহ কিছু প্রক্রিয়াগত ধাপ অনুসরণ করতে হয়। সেই প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন হলেই বিভাগ চালুর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে।”
ইসলামী শিক্ষার সঙ্গে আধুনিক শিক্ষার সমন্বয় ঘটিয়ে দক্ষ ও যোগ্য নাগরিক গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে ১৯৭৯ সালের ২২ নভেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। পরে থিওলজি অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ এবং মানবিক ও বাণিজ্য অনুষদের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টির একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয়।