সময়ের স্রোতে প্রজন্ম বদলায়, কিন্তু কিছু প্রতিষ্ঠান প্রতিদিনই নতুন অর্থে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। রাজশাহী কলেজ তেমনই এক বিদ্যাপীঠ, যেখানে অতীতের গৌরব, সংগ্রামের ইতিহাস এবং বর্তমানের প্রাণচাঞ্চল্য মিলেমিশে গড়ে তুলেছে এক জীবন্ত ঐতিহ্য।
১৮৭৩ সালের ১ এপ্রিল প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু হয় এই প্রতিষ্ঠানের। মাত্র ছয়জন শিক্ষার্থী নিয়ে শুরু হওয়া পথচলা আজ প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখর। পদ্মা নদীর তীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা লাল ইটের ভবনগুলো যেন প্রতিদিনই শোনায় অতীতের সংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প।
রাজশাহী কলেজ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে উত্তরাঞ্চলে শিক্ষাবিপ্লবের সূচনা হয়। দুবলহাটির রাজা হরনাথ রায় চৌধুরী এবং দীঘাপতিয়ার রাজা প্রমথনাথ রায়ের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠান দ্রুতই শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেয়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়ে উত্তরবঙ্গে প্রথম বিএ কোর্স চালুর মাধ্যমে কলেজটি পথপ্রদর্শক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
ঢাকা কলেজ ও চট্টগ্রাম কলেজের পর দেশের তৃতীয় প্রাচীনতম কলেজ হিসেবে রাজশাহী কলেজের অবস্থান সময় ও গৌরব, উভয় দিক থেকেই অনন্য।
শিক্ষার পাশাপাশি জাতীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি অধ্যায়েও রয়েছে এই প্রতিষ্ঠানের সক্রিয় উপস্থিতি। ভাষা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং মহান মুক্তিযুদ্ধ—সবখানেই শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
১৯৫২ সালে শহীদদের স্মরণে দেশের প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল এই ক্যাম্পাসেই, যা পরদিন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ধ্বংস করে। বর্তমানে সেই স্থাপনাটি মুসলিম ছাত্রাবাসের পাশে অবস্থিত।
রাজশাহী কলেজের প্রতিটি ভবন যেন ইতিহাসের একেকটি দলিল। ১৮৮৪ সালে নির্মিত প্রশাসনিক ভবন, হাজি মুহাম্মদ মহসীন ভবন ও ফুলার ভবনের দেয়ালে এখনো ব্রিটিশ স্থাপত্যশৈলীর ছাপ স্পষ্ট। সবুজে ঘেরা খোলা প্রাঙ্গণ কলেজটিকে দিয়েছে আলাদা সৌন্দর্য। এই বিদ্যাপীঠ থেকে শিক্ষা নিয়েছেন এবং শিক্ষকতা করেছেন অসংখ্য গুণীজন। জ্যোতি বসু, ঋত্বিক ঘটক, এ কে খন্দকার, হাবিবুর রহমানসহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের পদচারণায় সমৃদ্ধ হয়েছে এই ক্যাম্পাস, যা আজও নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে।
সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেকে আধুনিক করে তুলেছে রাজশাহী কলেজ। মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, ওয়াই-ফাই সুবিধা, সিসি ক্যামেরা নিরাপত্তা, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার এবং আধুনিক কম্পিউটার ল্যাবসহ এখানে গড়ে উঠেছে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ। একই সঙ্গে বিতর্ক, নাটক, সংগীতসহ প্রায় অর্ধশতাধিক সহশিক্ষা সংগঠন শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব ও সৃজনশীলতা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ইয়াসির আরাফাত বলেন, “১৫৪ বছর পার করে এই প্রতিষ্ঠান আজ যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, তা আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা। আমরা চাই, আগামী প্রজন্ম আরও উন্নত পরিবেশ পাক, বড় স্বপ্ন দেখুক। রাজশাহী কলেজ এমন একটি জায়গা হয়ে উঠুক, যেখানে শুধু ভালো ফল নয়, ভালো মানুষ তৈরি হয়। এই কলেজের নাম আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও আরো উজ্জ্বলভাবে উচ্চারিত হোক, সেই লক্ষ্যেই আমরা কাজ করতে চাই।”
কলেজের অধ্যক্ষ ইব্রাহিম আলী বলেন, “রাজশাহী কলেজের প্রতিষ্ঠা দিবস শুধু কলেজের নয়, সমগ্র রাজশাহীবাসীর জন্যই গৌরবের। ১৮৭৩ সালে এই কলেজ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে পূর্ব বাংলা তথা উত্তরাঞ্চলে উচ্চশিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছিল। সে সময় ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে পড়তে আসতেন, যা প্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্যকে আরো সমৃদ্ধ করেছে।”
তিনি আরো বলেন, “এই গৌরবময় ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রাখতে আমরা নিরলসভাবে কাজ করছি। বর্তমান সময়ে শিক্ষার্থীদের শুধু একাডেমিক জ্ঞান নয়, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতাও জরুরি। তাই আমরা আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ১৫৪তম প্রতিষ্ঠা দিবসকে সামনে রেখে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার বিস্তার ঘটানোই আমাদের অঙ্গীকার।”
১৫৪ বছরের দীর্ঘ পথচলায় রাজশাহী কলেজ নিজেকে আলোকবর্তিকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এখানে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হয়ে গড়ে তুলেছে নিজেদের স্বপ্ন ও সম্ভাবনার দিগন্ত।
অতীতের গৌরব, সংগ্রামের প্রেরণা এবং আধুনিকতার সমন্বয়ে আজও সমান প্রাসঙ্গিক এই বিদ্যাপীঠ। সময়ের সঙ্গে রূপ বদলালেও এর ঐতিহ্য অটুট রয়েছে।
[প্রতিবেদনটি লিখেছেন রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থী সু্শ্রী সরকার]