দীর্ঘ ছয় বছরের স্থবিরতা কাটিয়ে অবশেষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন সদ্য সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীব। বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের শিক্ষক সংকট দূর করতে ৩৪টি বিভাগে মোট ১৫৪ জন নতুন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এতে একাডেমিক কার্যক্রমে গতি ফেরার আশা তৈরি হলেও নিয়োগের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা।
অভিযোগ উঠেছে, একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারীদের প্রাধান্য দিয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বজনপ্রীতির অভিযোগও সামনে আসে। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে নিয়োগ বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ, সংবাদ সম্মেলন ও অনশন কর্মসূচিও পালন করা হয়। তবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের সভাপতিরা এসব অভিযোগ সরাসরি নাকচ করেছেন।
বিভাগীয় প্রধানদের দাবি, পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া ছিল স্বচ্ছ এবং মেধার ভিত্তিতেই প্রার্থীদের নির্বাচন করা হয়েছে। একাডেমিক মান বজায় রাখতে কোনো ধরনের আপস করা হয়নি বলেও তারা জানান।
এর আগে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এম আব্দুস সোবহানের বিরুদ্ধে শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা শিথিল করে স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে নিজের মেয়ে ও জামাতাকে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে ২০২০ সালের ১০ ও ১৩ ডিসেম্বর পৃথক ১২টি নোটিশের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে সব ধরনের নিয়োগে নিষেধাজ্ঞা জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
পরবর্তীতে গণ-অভ্যুত্থানের পর অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীব উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আবেদনের ভিত্তিতে সেই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হয়। সংশ্লিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করে নিয়োগ কার্যক্রম চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়। এ সময় প্রথমবারের মতো শিক্ষক নিয়োগে লিখিত পরীক্ষা চালু করা হয়।
২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ভাইভা বোর্ডের মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়। এরপর ধাপে ধাপে ৩৪টি বিভাগে মোট ১৫৪ জন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়।
নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে ইতিহাস বিভাগে ৭ জন, ইংরেজি বিভাগে ৬ জন, আইন ও ভূমি প্রশাসন বিভাগে ৬ জন, গণিত বিভাগে ৪ জন, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে ৭ জন, হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য ব্যবস্থা বিভাগে ৮ জন, সমাজকর্ম বিভাগে ৮ জন, ক্রপ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগে ৮ জন, ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগে ৬ জনসহ বিভিন্ন বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
নতুন শিক্ষক পাওয়ায় স্বস্তি ও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরা। দীর্ঘদিনের শিক্ষক সংকটে ক্লাস ও গবেষণায় যে বিঘ্ন ঘটছিল, তা দূর হবে বলে তারা আশা করছেন। শিক্ষার্থীদের মতে, নতুন শিক্ষকদের পাঠদান পদ্ধতি আধুনিক ও কার্যকর, যা তাদের একাডেমিক উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে অর্থনীতি বিভাগের সভাপতি এ এন কে নোমান বলেন, “অত্যন্ত স্বচ্ছ ও উচ্চমান বজায় রেখেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। মেধাবীদেরই নির্বাচন করা হয়েছে, এখানে অস্বচ্ছতার কোনো সুযোগ নেই।”
ক্রপ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক এম আল বাকী বরকতুল্লাহ বলেন, “আমাদের বিভাগে যারা নিয়োগ পেয়েছেন তারা সবাই মেধার দিক থেকে শীর্ষস্থানীয়। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার ভিত্তিতেই তাদের নির্বাচন করা হয়েছে।”
পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক এফ নজরুল ইসলাম বলেন, “বর্তমান প্রশাসনের অধীনে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকরা বিভাগের সম্পদ। দল-মত নির্বিশেষে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।”
তিনি লিখিত পরীক্ষার প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানান, পরীক্ষার ঠিক আগে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে প্রশ্ন প্রণয়ন করা হয় এবং কোডিং-ডিকোডিং পদ্ধতিতে খাতা মূল্যায়ন করা হয়, ফলে প্রার্থীর পরিচয় গোপন থাকে।
অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক দিল-আরা হোসাইন বলেন, “দীর্ঘদিন পর আমাদের বিভাগে নিয়োগ হয়েছে। যারা নিয়োগ পেয়েছে তারা যোগ্য এবং ইতোমধ্যে ক্লাস নেওয়া শুরু করেছে। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাচ্ছি।”
ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক মো. লতিফুর রহমান সরকার বলেন, “আমাদের বিভাগে এ পর্যন্ত যত নিয়োগ হয়েছে, এবারই সবচেয়ে স্বচ্ছভাবে নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে। নিয়োগপ্রাপ্ত সবাই মেধার দিক থেকে সেরা।”
সার্বিক বিষয়ে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীব বলেন, “দায়িত্ব নেওয়ার পরই বিভিন্ন বিভাগে তীব্র শিক্ষক সংকট দেখতে পান তারা। তাই প্রথমে নিয়োগ নীতিমালা সংস্কার করা হয়, যাতে রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে মেধা প্রাধান্য পায়।”
তিনি বলেন, “অনেক বিভাগে শতাধিক প্রার্থী থাকায় লিখিত পরীক্ষা চালু করা হয়। পরীক্ষার প্রশ্ন বোর্ডে উপস্থিত বিশেষজ্ঞরা তৈরি করেন এবং কোডিং পদ্ধতিতে মূল্যায়ন করা হয়, ফলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়েছে।”
সবশেষে তিনি দাবি করেন, “বিভিন্ন মহল থেকে সুপারিশ এলেও আমরা কোনো রাজনৈতিক বিবেচনায় কাউকে নিয়োগ দিইনি। শুধুমাত্র যোগ্যতার ভিত্তিতেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।”