ঢাকার ব্যস্ত নগরজীবনের ভিড়, শব্দ আর অনিশ্চয়তার মাঝেই প্রতিদিন নিজের স্বপ্ন আঁকড়ে লড়াই করে যাচ্ছেন অসংখ্য শিক্ষার্থী। তাদেরই একজন গাইবান্ধার প্রত্যন্ত গ্রাম বিষ্ণুপুর থেকে উঠে আসা অলোকা রানী সরকার। সামাজিক বাধা, আর্থিক সংকট ও নিরাপত্তাহীনতা পেরিয়ে তিনি এখন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের একজন মেধাবী শিক্ষার্থী। ২০২৩-২৪ সেশনের এই শিক্ষার্থী বর্তমানে ৩.৭১ সিজিপিএ নিয়ে বিভাগে প্রথম স্থানে রয়েছেন।
অলোকা’র পথচলা শুরু উত্তরবঙ্গের এক সাধারণ পরিবারে। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি ছিল তার গভীর আগ্রহ। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে কখনো টিউশন, কখনো সেলাইয়ের কাজ করে নিজের পড়াশোনার খরচ চালিয়েছেন। এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এবং এইচএসসিতে মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ ৫ অর্জন করে তিনি তার মেধার পরিচয় দেন। পরে স্থানীয়ভাবে কোচিং করে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পান।
তবে, এই যাত্রা শুধু একাডেমিক চ্যালেঞ্জেই সীমাবদ্ধ ছিল না, ছিল সামাজিক বাধাও। “মেয়ে হয়ে ঢাকায় পড়তে যাওয়ার দরকার নেই”, এমন মন্তব্য বারবার শুনতে হয়েছে তাকে ও তার পরিবারকে। কিন্তু পরিবারের সমর্থন আর নিজের দৃঢ় মনোবল নিয়ে সব বাধা পেরিয়ে ঢাকায় আসেন তিনি। সেখান থেকেই শুরু হয় নতুন সংগ্রাম।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরই সামনে আসে আবাসন সংকট। মেয়েদের জন্য সীমিত আসন থাকায় শুরু থেকেই তিনজন সহপাঠীর সঙ্গে একটি ছোট রুমে থাকতে হয়। সীমিত জায়গা, বেশি ভাড়া আর নতুন পরিবেশ; সব মিলিয়ে শুরুটা ছিল বেশ কঠিন। রান্না, বাজার ও ঘরের কাজ সামলে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হয়েছে তাকে।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় আর্থিক চাপ। শুরুতে কোনো টিউশন না থাকায় বাসা ভাড়া ও দৈনন্দিন খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। একজন মেয়ে হিসেবে বাইরে কাজের সুযোগও সীমিত ছিল। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর টিউশন শেষে ফেরার সময় নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তা সবসময়ই ভর করত। অনেক সময় একা বাসায় থাকতেও ভয় পেতেন তিনি।
হলের সুবিধা না থাকায় প্রতিদিনের জীবন আরো কঠিন হয়ে ওঠে। সকালে ক্লাস, দুপুরে ফিরে রান্না, এরপর টিউশন—এই ব্যস্ততার মধ্যে পড়াশোনার জন্য আলাদা সময় বের করা সহজ ছিল না। ক্লান্ত শরীর নিয়ে রাতে পড়তে বসা যেন প্রতিদিনের এক নতুন লড়াই। নিজের খরচ চালাতে শুরু থেকেই টিউশনের চেষ্টা করেছেন অলোকা। কিন্তু পুরান ঢাকায় একজন মেয়ের জন্য এটি সহজ ছিল না। নানা প্রতিবন্ধকতা ও নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যেও তিনি থেমে থাকেননি। তবে এর প্রভাব পড়েছে পড়াশোনায়; সময় ও মনোযোগের সংকট ছিল স্পষ্ট।
তার প্রতিদিনের জীবন যেন এক নিরন্তর দৌড়। সকাল সাড়ে ৮টায় ক্লাস দিয়ে দিন শুরু। কখনো নাস্তা করার সুযোগ মেলে, কখনো না খেয়েই বের হতে হয়। ক্লাস শেষে বাসায় ফিরে রান্না ও খাওয়া, এরপর আবার টিউশনে যাওয়া। সন্ধ্যায় ফিরে কিছুটা বিশ্রাম নিয়েই আবার পড়তে বসা—ক্লান্তি আর মানসিক চাপ নিয়েই এগিয়ে চলা।
ঢাকায় আসার শুরুর দিনগুলো ছিল সবচেয়ে কঠিন। নতুন শহর, অচেনা মানুষ আর আর্থিক অনিশ্চয়তায় অনেক সময় মনে হয়েছে ফিরে যাওয়া উচিত। তবে পরিবারের মানসিক সমর্থনই তাকে শক্তি জুগিয়েছে।
ভালো ফল ধরে রাখতে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে তাকে। বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো বা ঘোরাঘুরি, সবকিছু সীমিত করে পড়াশোনায় মনোযোগ দিয়েছেন। পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাবে শারীরিক সমস্যাও দেখা দিলেও থেমে থাকেননি। তার এই নিরলস পরিশ্রমের ফল, বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন।
অলোকা মনে করেন, আবাসন সংকট শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৈষম্য তৈরি করছে। আর্থিকভাবে সচ্ছলরা তুলনামূলক ভালো পরিবেশে থাকতে পারলেও অন্যরা পিছিয়ে পড়ছে। বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও চলাচলের সীমাবদ্ধতার কারণে এই বৈষম্য আরো প্রকট।
ঢাকার পরিবেশের সঙ্গেও মানিয়ে নেওয়া সহজ ছিল না। বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, যানজট ও পানির সমস্যাসহ নানা কারণে শারীরিক ও মানসিক চাপ বেড়েছে। একা চলাফেরা, বাজার করা ও নিরাপত্তা নিয়ে ভাবনাগুলোও ছিল নতুন অভিজ্ঞতা।
তবে, এত প্রতিকূলতার মাঝেও তার স্বপ্ন অটুট। তিনি নিজেকে একটি সম্মানজনক অবস্থানে দেখতে চান এবং সমাজের জন্য কাজ করতে চান। পাশাপাশি ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য কিছু করার ইচ্ছাও রয়েছে তার।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে তার প্রত্যাশা, আবাসন সংকটের দ্রুত সমাধান, শিক্ষার উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির উন্নয়ন।
প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে যারা উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় আসতে চান, তাদের উদ্দেশে অলোকা’র বার্তা, স্বপ্ন দেখতে হবে, তবে প্রস্তুতি নিয়েই আসতে হবে। কঠোর পরিশ্রম, মানিয়ে নেওয়ার মানসিকতা এবং আর্থিক প্রস্তুতি ছাড়া এখানে টিকে থাকা কঠিন। বিশেষ করে মেয়েদের নিজের নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি।