বিশ্ববিদ্যালয় জীবন; শুনতে যতটা রঙিন, বাস্তবে ততটাই বহুমাত্রিক। ক্লাস, পরীক্ষা আর ফলাফলের গণ্ডি পেরিয়ে এই জীবনের আরেকটি অদৃশ্য অধ্যায় রয়েছে, যা খুব কমই আলোচনায় আসে। বিশেষ করে ঢাকার মতো ব্যস্ত শহরে উচ্চশিক্ষা নিতে আসা শিক্ষার্থীদের জন্য জীবন মানেই এক ধরনের দ্বৈত সংগ্রাম। একদিকে একাডেমিক চাপ, অন্যদিকে জীবিকা কিংবা নিজের দক্ষতা গড়ে তোলার নিরন্তর চেষ্টা।
টিউশন, ফ্রিল্যান্সিং, পার্ট-টাইম চাকরি, এসব এখন আর অতিরিক্ত কিছু নয়; বরং অনেক শিক্ষার্থীর জন্য টিকে থাকার অবলম্বন। এই বাস্তবতার ভেতরেই জন্ম নেয় অদম্য ইচ্ছাশক্তি, দায়িত্ববোধ আর ভবিষ্যৎ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয়।
‘রাত যত গভীর হয়, আমার কাজ তত বাড়ে’
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়-এর গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ফাহিম ইসলাম, নীরব লড়াইয়ের এক প্রতিচ্ছবি। তার দিন শুরু হয় বইয়ের পাতায়, আর শেষ হয় ল্যাপটপের নীল আলোয়। “আমি শুধু একজন ছাত্র নই, আমি স্বপ্নবাজ। নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে পড়াশোনা আর ফ্রিল্যান্সিং—দুটোই একসঙ্গে চালিয়ে যাচ্ছি“, বলেন তিনি।
সকালজুড়ে ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট, প্রেজেন্টেশন, সব সামলে নেওয়ার পরও তার দিন শেষ হয় না। যখন বন্ধুরা আড্ডায় মেতে ওঠে, তখন ফাহিম ব্যস্ত নিজের কাজে। “যেতে ইচ্ছে করে, কিন্তু নিজের প্রতি একটা দায়িত্ব আছে”, বললেন তিনি। দিনের ব্যস্ততা পেরিয়ে রাত নামলেই শুরু হয় তার আরেক জীবন ফ্রিল্যান্সিং। ক্লায়েন্টের বার্তা, ডেডলাইন, নতুন প্রজেক্ট; সব মিলিয়ে যেন অন্য এক জগৎ।
“রাত যত গভীর হয়, কাজ তত বাড়ে। অনেক সময় ভোর হয়ে যায়”, তার কণ্ঠে ক্লান্তির সঙ্গে মিশে থাকে দৃঢ়তা। তবে এই পথ কাঁটাবিহীন নয়। পড়াশোনা আর কাজের ভারসাম্য রাখতে গিয়ে প্রায়ই মানসিক চাপ তৈরি হয়।
“কখনো কাজের জন্য পড়াশোনা, আবার কখনো পড়াশোনার জন্য কাজ, দুটোরই ক্ষতি হয়”, স্বীকার করেন তিনি। ফ্রিল্যান্সিংয়ের স্বাধীনতার পাশাপাশি আছে অনিশ্চয়তাও। অনিয়মিত আয়, দেরিতে পেমেন্ট, সামাজিক ভুল ধারণা, সবকিছু মিলিয়েই তৈরি হয় চ্যালেঞ্জ। তবুও থামতে চান না ফাহিম। “আজকের এই কষ্টই একদিন সাফল্যের ভিত্তি হবে”, এই বিশ্বাসই তাকে এগিয়ে নেয় প্রতিদিন।
‘টিউশনের পথে হেঁটে যাওয়া বাস্তবতা’
একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আকাশ আহমেদ রুপমের জীবন যেন আরো কঠিন বাস্তবতার গল্প। তার প্রতিটি দিন শুরু হয় দায়িত্বের হিসাব কষে। সকালে ঘুম ভাঙতেই মাথায় আসে; কয়টা ক্লাস, কয়টা টিউশন, কত খরচ। অনেক সময় না খেয়েই বের হতে হয় ক্লাসে।
“সকাল আটটার ক্লাস থাকলে না খেয়েই যেতে হয়। পরে বুঝি, শরীরটাই ঠিক থাকে না”, বললেন তিনি। দিনভর ক্লাস শেষে অন্যদের মতো বিশ্রাম নয়, তার জন্য অপেক্ষা করে টিউশনের পথ। এক বাসা থেকে আরেক বাসায় ছুটে চলা, সময়মতো পৌঁছানো—সবই যেন এক অন্তহীন দৌড়।
“খরচ চালাতে টিউশন ছাড়া উপায় নেই। অনেক সময় হেঁটেই যেতে হয়”, তার কণ্ঠে ক্লান্ত বাস্তবতা। দিন শেষে মেসে ফিরে আবার অনিশ্চয়তা, খাবার থাকবে কি না! “অনেক সময় দেখি রান্না হয়নি। বাইরে খাওয়ার সামর্থ্যও সবসময় থাকে না”, বললেন রুপম।
এই লড়াই শুধু শারীরিক নয়, মানসিকও। “বাইরে থেকে মনে হয় বিশ্ববিদ্যালয় জীবন খুব সহজ। কিন্তু আসলে প্রতিটা দিনই একটা যুদ্ধ”, তিনি যোগ করেন। তবুও থেমে নেই তার পথচলা। কারণ তারও স্বপ্ন আছে, নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা, পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো।
‘নিজের খরচ নিজেই চালাতে চাই’
পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মোকছেদুল ইসলাম সিরাজ বেছে নিয়েছেন আরেক পথ, পার্ট-টাইম চাকরি। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন তিনি, যেখানে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় দিতে হয়। ক্লাস শেষ মানেই বিশ্রাম নয়; বরং শুরু হয় নতুন দৌড়। “ক্লাস শেষে সরাসরি অফিসে যেতে হয়। দেরি হলে যেমন সমস্যা, তেমনি ক্লাস মিস করলেও সমস্যা”, বললেন সিরাজ।
সময় ব্যবস্থাপনাই তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। “কখনো অফিসের কারণে পড়াশোনা হয় না, আবার পরীক্ষার সময় অফিস থেকেও চাপ থাকে”, তিনি বলেন।
কর্মক্ষেত্র সবসময় সহানুভূতিশীলও নয়। “সবাই বোঝে না আমি একজন ছাত্রও। অনেক সময় অতিরিক্ত কাজ করতে হয়”, তার কণ্ঠে চাপের ছাপ। তবুও এই পথ তাকে দিয়েছে আত্মবিশ্বাস। “নিজের খরচ নিজেই চালাতে পারছি, এই অনুভূতিটা আমাকে শক্তি দেয়”, বললেন তিনি। তার কাছে এই চাকরি শুধু আয়ের উৎস নয়; বরং ভবিষ্যতের জন্য নিজেকে তৈরি করার একটি ধাপ।
ফাহিম, রুপম কিংবা সিরাজ, তারা আলাদা কেউ নন। তারা এই সময়ের হাজারো শিক্ষার্থীর প্রতিচ্ছবি। ক্যাম্পাসের বেঞ্চ, টিউশনের পথ, অফিসের ডেস্ক আর ল্যাপটপের স্ক্রিন—এই চার দেয়ালের মাঝেই গড়ে উঠছে এক নতুন প্রজন্ম। নীরবে, ধীরে, কিন্তু অদম্য শক্তিতে তারা লড়ে যাচ্ছে; স্বপ্নের জন্য, নিজের পরিচয়ের জন্য, এক টুকরো স্থিতিশীল ভবিষ্যতের জন্য। হয়তো তাদের গল্পগুলো খুব বেশি শোনা যায় না। কিন্তু, এই অদৃশ্য সংগ্রামই একদিন গড়ে তুলবে আগামী দিনের আত্মনির্ভর, দৃঢ়চেতা প্রজন্ম।