ক্যাম্পাস

শ্রমিক দিবসে ন্যায্য মজুরি ও মর্যাদার প্রত্যাশা রাবি কর্মচারীদের

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ক্যাম্পাসে দিন শুরু হয় হাজারো শিক্ষার্থীর পদচারণা, ক্লাস-পরীক্ষা আর সাংস্কৃতিক ব্যস্ততায়। কিন্তু এই দৃশ্যমান জীবনের আড়ালেই আরেকটি জীবন নীরবে চলে; যেখানে আলো পড়ে না সহজে, তবুও থেমে থাকে না কাজ। পরিচ্ছন্নতা কর্মী, নিরাপত্তা প্রহরী, হল স্টাফ কিংবা লেবার সেক্টরের কর্মীরা, তারা ক্যাম্পাসের সেই নীরব স্থপতি, যাদের শ্রমে গড়ে ওঠে একটি পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও সচল বিশ্ববিদ্যালয়।

এই মানুষগুলো সাধারণত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন না। কিন্তু একটি দিনের বাস্তবতা বুঝতে গেলে তাদের উপস্থিতি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। রাবির প্রতিটি করিডোর, সড়ক, হল আর প্রশাসনিক ভবনের পেছনে রয়েছে তাদের নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রম। তাদের সেই অদেখা জীবনের গল্প; যেখানে শ্রম আছে, কিন্তু স্বীকৃতি কম; দায়িত্ব আছে, কিন্তু আলোচনায় জায়গা কম।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোর সাপোর্ট স্টাফরাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের খাবার পরিবেশন থেকে শুরু করে দৈনন্দিন নানা কাজে তারা যুক্ত থাকেন। তাদের প্রত্যাশা, ন্যায্য মজুরি ও কাজের পরিবেশের উন্নয়ন।

স্টুয়ার্ড শাখার পরিচ্ছন্নতা কর্মী শ্রী অষ্টম কুমার বাহার বলেন, “আমরা সকাল নয়টা থেকে কাজ শুরু করি। কোথাও কোনো পশুপাখি মারা গেলে; যেমন গতকাল পশ্চিম পাড়ায় একটি কুকুর ড্রেনে পড়ে ছিল, তখন আমরা গিয়ে পরিষ্কার করি, মাটি চাপা দিই। এছাড়া, হল বা শিক্ষকদের বাসায় পানির লাইন বা ড্রেন বন্ধ হয়ে গেলে সেটাও ঠিক করি। অনেক ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয়, কিন্তু আমাদের কষ্ট খুব একটা কেউ দেখে না। বেতনটা একটু বাড়লে পরিবার নিয়ে ভালোভাবে চলতে পারতাম।”

ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দিন-রাত পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করেন নিরাপত্তা প্রহরীরা। মোখলেসুর রহমান বলেন, “আমরা স্টুয়ার্ড শাখার অধীনে কাজ করি। সার্বক্ষণিক সতর্ক থাকতে হয়। রাতের ডিউটি সবচেয়ে কষ্টকর, তবুও দায়িত্ববোধ থেকেই কাজ করি। দ্রব্যমূল্যের এই সময়ে যদি পে-স্কেলটা আরেকটু বাড়ানো যেত, তাহলে পরিবারের খরচ চালানো সহজ হতো।”

স্টুয়ার্ড শাখার উপ-রেজিস্টার মো. সোহরাব হোসেন জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে তাদের কর্মীরা কাজ করছেন। “প্রায় দেড়শত নিরাপত্তা প্রহরী একাডেমিক ভবন, গেট ও আবাসিক এলাকায় দায়িত্ব পালন করছেন। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমেই তারা ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছেন’, বললেন তিনি।

পরিচ্ছন্নতা নিয়েও সমান গুরুত্ব দেন তারা। “আবাসিক এলাকা, একাডেমিক ও প্রশাসনিক ভবনসহ পুরো ক্যাম্পাস নিয়মিত পরিষ্কার রাখা হয়। পাশাপাশি লেবার সেক্টরের কর্মীরা জঙ্গল, ঘাস ও লতাপাতা পরিষ্কার করেন, রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে”, যোগ করেন তিনি। তবে বাস্তবতা হলো, সব কর্মী সমান সুবিধা পান না। “স্থায়ী কর্মচারীরা নির্ধারিত বেতন-ভাতা পেলেও পূর্ণ চিকিৎসা সুবিধা থেকে বঞ্চিত। আর মাস্টার রোল বা দৈনিক মজুরির কর্মীরা আরো বেশি অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকেন”, বলেন তিনি। মহান মে দিবস উপলক্ষে এসব শ্রমিকের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর দাবি জানান তিনি এবং সবার প্রতি তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার আহ্বান জানান।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ মাঈন উদ্দীন বলেন, “এই কর্মচারীরাই বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। তাদের কল্যাণে প্রশাসন সচেষ্ট রয়েছে এবং ধাপে ধাপে তাদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।” ক্যাম্পাসের প্রতিটি পরিচ্ছন্ন করিডোর, নিরাপদ পরিবেশ আর সুশৃঙ্খল দৈনন্দিন জীবনের পেছনে রয়েছে এই মানুষগুলোর অদৃশ্য শ্রম। তারা সামনে থাকেন না, কিন্তু তাদের কাজ ছাড়া একটি দিনও স্বাভাবিকভাবে চলা কঠিন।

তাই এই শ্রম শুধু দায়িত্ব নয়, এটি একটি অবদান, যা স্বীকৃতি পাওয়ার দাবি রাখে। বিশ্ববিদ্যালয় যেমন জ্ঞানের জায়গা, তেমনি মানবিকতা শেখারও জায়গা। আর সেই মানবিকতার শুরু হতে পারে এই নীরব শ্রমিকদের প্রাপ্য সম্মান ও মর্যাদা দেওয়ার মধ্য দিয়েই।