একটি অক্ষরের ছোট্ট শব্দ ‘মা’, কিন্তু এর গভীরতা মারিয়ানা ট্রেঞ্চের চেয়েও বেশি। মা মানে শান্তি, মা মানে আদর-সোহাগ, মা মানেই এমন এক ভালোবাসা, যার তুলনা এই মহাবিশ্বে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। সৃষ্টিকর্তার এই বিশাল মহাবিশ্বে, মহাকাশের বিশালতায় পৃথিবীর বুকে মা আমাদের জীবনের এক উজ্জ্বলতম নক্ষত্র। এই নক্ষত্রের আলো যতদিন পৃথিবীতে বিরাজ করবে, ততদিন কোনো ঝড়ই এই মহাবিশ্বে আমাদের ছুঁতে পারবে না।
মায়ের প্রতি আমাদের যে ঋণ, তা এই পৃথিবীতে কোনো দিনই শোধ করা সম্ভব নয়। আমাদের জন্মের পর জীবনের প্রথম শিক্ষকই হলেন মা। তিনিই প্রথম আশ্রয়, যেখানে ভয় নেই, দুশ্চিন্তা নেই, হতাশা নেই—আছে কেবল নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর শান্তি। পৃথিবীর সব সম্পর্ক বদলাতে পারে, কিন্তু মায়ের ভালোবাসা চিরন্তন, অবিনশ্বর ও অমলিন।
আমাদের শৈশবের স্মৃতিময় দিনগুলো কতই না সুখময় ছিল! শৈশবে ঘুমানোর সময় আম্মার কোলে মাথা রাখলে তিনি ছড়া ও রূপকথার গল্প শোনাতেন এবং তাঁর স্নেহময় হাতে মমতার স্নিগ্ধ পরশ বুলিয়ে দিতেন আমার মাথায়। প্রতিটি সন্তানের জন্য মায়ের কোলই হলো এই পৃথিবীর বুকে এক টুকরো স্বর্গ।
আমাদের শৈশবের সবচেয়ে সুন্দর ও মধুর স্মৃতি মায়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। মনে পড়ে দেড়-দুই দশক আগের কথা, যখন আমি এই পৃথিবীর এক অবুঝ নবীন শিশু। তখন আমি মায়ের কোলে ঘুমাতাম। প্রতি ভোরে আম্মা আমাকে ডেকে তুলতেন মক্তবে যাওয়ার জন্য। নীরব, নিস্তব্ধ সকালে আম্মা ঘুম থেকে উঠে কলপাড়ে গিয়ে মগ ভর্তি পানি নিয়ে কুলি করতে করতে ওজু করতেন। নামাজ শেষে আম্মা আমাকে আদর করে ডেকে তুলে মক্তবে পাঠানোর জন্য প্রস্তুত করতেন। কত আনন্দের ছিল দিনগুলো! ভাই-বোনদের হাত ধরে তাদের সঙ্গে মক্তবে যাওয়ার আগে আম্মাকে আবদার করে যেতাম, “আজ যেন খিচুড়ি রান্না হয়।” আম্মা হাসিভরা মুখে বলতেন, “তুমি মক্তব শেষ করে এসো, আমি তোমার জন্য রান্না করছি।”
শৈশবের সেই সময়টাতে আম্মা আমার ওপর রাগ করতেন শুধু আমার না পড়ার কারণে। যখন আম্মা খুব বেশি রাগ করতেন, তখন তাঁর রাগ কমানোর একটা কৌশল ছিল আমার কাছে। আমি পড়া না পারার ভান করে তাঁকে জিজ্ঞেস করতাম। তখন আম্মা সব রাগ ভুলে আমাকে আদর করে বুঝিয়ে দিতেন। আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক আম্মা। তাঁর মতো সহজ-সরল ভাষায় পৃথিবীর কোনো শিক্ষক আজও আমাকে বুঝাতে পারেননি।
পৃথিবীর সব মায়েরা তাঁদের আঁচলতলে নিজের সন্তান এবং নিজের জীবনের সব শখ-আহ্লাদ, দুঃখ-কষ্ট লুকিয়ে রাখেন। মায়েরা চান, তাঁদের সন্তান যেন হাসি-আনন্দে চিরসুখে জীবন কাটায়। মা এক অনন্ত মহাকাব্যের নাম, যার ত্যাগ-তিতিক্ষা, মায়া ও মমতা দিয়ে রচিত হতে পারে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মহাকাব্য।
আমার আম্মা দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চ রক্তচাপজনিত সমস্যায় ভুগছেন। ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময় একদিন সকাল সাড়ে ৯টার দিকে হঠাৎ আম্মার বুকে তীব্র ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। সে সময় বাসায় ওষুধ খাওয়ানো ও মাথায় পানি দিয়েও ব্যথা কমছিল না। তাই দ্রুত আমি ও বাবা তাঁকে আল হেরা হাসপাতালে নিয়ে যাই।
বলে রাখা ভালো, তখনও আমি সকালের নাস্তা করিনি। হাসপাতালে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই ডাক্তাররা আম্মার অবস্থা দেখে তাঁকে অক্সিজেন দেন। নার্স তখন আম্মার রক্তচাপ পরীক্ষা করছিলেন। আমি আম্মার মাথার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তিনি বুকের ব্যথায় কাতরাচ্ছিলেন। আমার চোখের কোণে অশ্রু ঝলমল করছিল। আম্মা আমার মুখের দিকে কয়েকবার তাকিয়ে বুকে তীব্র ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট নিয়েই হঠাৎ অক্সিজেন মাস্ক খুলে শান্তভাবে বললেন, “আমি ঠিক আছি, তোমরা বিপ্লবকে নিয়ে নাস্তা করাও।” সেই মুহূর্তে চোখের জল আর মানল না, অঝোরে ঝরে পড়ল। মমতাময়ীর মমতার তুলনা পৃথিবীতে সত্যিই অতুলনীয়।
পুরান ঢাকার কবি নজরুল সরকারি কলেজে পড়ার সুবাদে ২০২২ সালে ঘর ছেড়ে, মাকে ছেড়ে ঢাকায় আসি। আম্মাকে ছেড়ে ঢাকা আসার সময় প্রতিবারই তিনি এগিয়ে দিতে এসে অশ্রুভেজা চোখে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকেন, কিন্তু আমি পেছন ফিরে তাকাই না। আম্মার অশ্রুভেজা চোখ দেখার ক্ষমতা আমার নেই। ঢাকায় আম্মার স্মৃতি বলতে এখন আমার সঙ্গে আছে একমাত্র আম্মার হাতে তৈরি কাঁথা, যার মধ্যে মিশে আছে তাঁর স্নেহ আর সুগন্ধ। নগরীর শীতের শিশিরঝরা ভোর, নরম রোদেলা দুপুর, কোলাহলময় হিমেল হাওয়াভরা বিকেল থেকে সন্ধ্যা ও রাত্রি—আম্মার সুগন্ধিযুক্ত, তাঁর বোনা আদুরে রুপালি কাঁথা এ শহরে দিবানিশি আমায় আদরে জড়িয়ে রেখেছে।
মা, তোমার মুখের কোণে হাসি না থাকলে, তোমার মলিন মুখখানি দেখলে আমার হৃদয় গভীর বিষণ্নতায় ডুবে যায়। মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করি, তুমি শতায়ু হও। তুমি না থাকলে এই দুনিয়ায় আমার সব শান্তি অশান্তিতে পরিণত হবে। তুমি যে আমার সুখ-শান্তির একমাত্র উৎস।
আজ বিশ্ব মা দিবসে পৃথিবীর সকল মায়ের সুস্বাস্থ্য, সুখ ও দীর্ঘায়ু কামনা করছি। পাশাপাশি মহান সৃষ্টিকর্তার নিকট প্রার্থনা করি, প্রত্যেক সন্তান যেন তার মায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, যত্নশীল ও দায়িত্ববান হতে পারে। জীবনের শেষ বয়স পর্যন্ত যেন তারা মায়ের পাশে থেকে তাঁর মুখে হাসি ফোটাতে পারে। পৃথিবীর কোনো মা যেন কখনো অবহেলা বা কষ্টের শিকার না হন। পৃথিবীর সকল মায়ের প্রতি রইল গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা।
শিক্ষার্থী, স্নাতক (সম্মান) চতুর্থ বর্ষ বাংলা বিভাগ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, ঢাকা