মা এক অক্ষরের ছোট্ট একটি শব্দ, অথচ এর গভীরতা যেন সমুদ্রের চেয়েও বিস্তৃত। পৃথিবীর কোনো ভাষা, কোনো উপমা, কোনো অভিধানই হয়তো ‘মা’ শব্দটার পূর্ণ ব্যাখ্যা দিতে পারবে না।
সালটা ২০০৯ । আমি তখন দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ি। ছোট্ট মানুষ, ছোট্ট পৃথিবী। স্কুল, খেলাধুলা, কার্টুন আর আম্মুর আঁচল; এই ছিল আমার পুরো জীবন। গ্রামের এক কোণে আমাদের ছোট্ট টিনের ঘর। চারপাশে গাছপালা, রাত নামলেই ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, দূরে কোথাও শেয়ালের হাঁক, সব মিলিয়ে এক নিস্তব্ধ গ্রামবাংলার রাত।
সেদিনও ছিল তেমনই এক শীতের রাত। ডিসেম্বরের শেষ দিক। কুয়াশা আর ঠান্ডা মিলে চারপাশ জমে গেছে। আমি আর ছোট বোন একটা কম্বলের নিচে গুটিসুটি মেরে ঘুমাচ্ছিলাম। আব্বু তখন বাজারে। ঘরে শুধু আমি, ছোট বোন আর আম্মু। রাত কতটা হয়েছিল জানি না। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। পুরো শরীর কাঁপছিল। মনে হচ্ছিল কেউ যেন আগুনের চুলায় আমাকে বসিয়ে রেখেছে। গলা শুকিয়ে কাঠ, মাথা এত ভারী লাগছিল যে চোখ খুলে রাখতেও কষ্ট হচ্ছিল।
আমি কাঁপা গলায় ডাক দিলাম, “আম্মু”। মায়েরা বোধহয় সন্তানের ডাক ঘুমের মধ্যেও চিনে ফেলেন। আম্মু সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসলেন। কুপির মৃদু আলোয় তার মুখটা হঠাৎ আতঙ্কে ভরে উঠল। কপালে হাত দিতেই তিনি চমকে উঠলেন। “হায় আল্লাহ! তোর তো অনেক জ্বর!”
তার গলার সেই ভয় আজও কানে বাজে। আম্মু তাড়াতাড়ি নলকূপ থেকে পানি এনে গামছা ভিজিয়ে আমার কপালে রাখলেন। তারপর বারবার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। বাইরে শীতল বাতাস বইছিল, অথচ আমার শরীর আগুনের মতো জ্বলছিল। তিনি বার বার বলছিলেন, “কিছু হবে না মা, আমি আছি”। সেই “আমি আছি” কথাটা যেন পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় ছিল।
কিছুক্ষণ পর আব্বু বাড়ি ফিরলেন। রাত তখন প্রায় দুটো। গ্রামে কোনো ডাক্তার নেই, ফার্মেসিও অনেক দূরে। কিন্তু আম্মু-আব্বু এক মুহূর্তের জন্যও ভেঙে পড়লেন না। আম্মু দ্রুত চুলায় আগুন জ্বালিয়ে গরম পানি করলেন। অল্প অল্প করে পানি খাওয়াতে লাগলেন আমাকে।
আমার শরীর তখনো কাঁপছিল। দাঁত কটমট করছিল শীতে আর জ্বরে। আমি কাঁদতে কাঁদতে বললাম, “আম্মু, আমার খুব কষ্ট হচ্ছে”।আম্মু আমাকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরলেন। তার শরীরের সেই শীতল, মমতামাখা গন্ধটা আজও মনে আছে। তিনি মাথায় হাত বুলিয়ে সূরা ফাতিহা, সূরা ইখলাস আর আয়াতুল কুরসী পড়তে লাগলেন।
আমার অবস্থা দেখে ছোট বোনও জোরে কাঁদতে শুরু করেছিল। কান্নার শব্দ শুনে আশেপাশের মানুষজন এসে জড়ো হলো। কিছুক্ষণ পর আব্বু পাশের বাড়ির চাচাকে ডাকতে গেলেন ডাক্তারের নম্বর আনার জন্য।
শীতের গভীর রাত। চারপাশ নিস্তব্ধ। দরজার বাইরে কুয়াশা জমে আছে। আধো জ্বরের ঘোরে আমি দেখলাম, আম্মু খালি পায়ে দৌড়ে যাচ্ছেন লেবু আনতে। কিছুক্ষণ পর চাচা সাইকেল নিয়ে বাজারে ওষুধ আনতে গেলেন। আর আম্মু আমার পাশে বসে রইলেন। এক মুহূর্তের জন্যও সরলেন না। কখনো কপালে পানি দিচ্ছেন, কখনো মাথা টিপে দিচ্ছেন।
জ্বরের ঘোরে আমি অদ্ভুত সব স্বপ্ন দেখছিলাম। কখনো মনে হচ্ছিল আমি কোথাও হারিয়ে গেছি, কখনো মনে হচ্ছিল চারপাশে আগুন জ্বলছে। কিন্তু যতবার চোখ খুলেছি, ততবার দেখেছি—আম্মু আমার পাশেই বসে আছেন। তার চোখে ঘুম নেই, শুধু দুশ্চিন্তা আর মায়া।একসময় দেখলাম, আম্মু চুপচাপ জায়নামাজে বসে দোয়া করছেন। কুপির ক্ষীণ আলোয় তার চোখের পানি চিকচিক করছিল। তিনি আল্লাহর কাছে শুধু একটাই কথা বলছিলেন “আল্লাহ, আমার মেয়েটাকে সুস্থ করে দাও।”
সেই দৃশ্যটা আজও আমার হৃদয়ের গভীরে গেঁথে আছে। ভোরের দিকে ডাক্তার এলেন। জ্বর মেপে দেখলেন ১০৫। ওষুধ দিলেন। আম্মু আমাকে কোলে তুলে বসালেন। কষ্ট করে ওষুধ খাওয়ালেন। তারপর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “আর একটু সহ্য কর মা, সব ঠিক হয়ে যাবে।”
ধীরে ধীরে জ্বর কমতে শুরু করল। মসজিদ থেকে ফজরের আজান ভেসে এলো। কুয়াশার ভেতর নতুন সকাল নামছিল ধীরে ধীরে। আমি ক্লান্ত চোখে দেখলাম, আম্মু তখনও জেগে আছেন। সারারাত একফোঁটা ঘুমাননি। আমি আস্তে করে তার হাতটা ধরলাম। হাতটা খুব ঠান্ডা ছিল—হয়তো শীতের কারণে, হয়তো সারারাত জেগে থাকার ক্লান্তিতে।
আম্মু মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করলেন, “এখন কেমন লাগছে?” আমি দুর্বল গলায় বললাম, “আলহামদুলিল্লাহ, ভালো।” সেই মুহূর্তে তার মুখে যে শান্তির হাসি ফুটেছিল, সেটাই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর হাসি।
আজ অনেক বছর কেটে গেছে। জীবনে অনেক মানুষ এসেছে, অনেক সম্পর্ক বদলেছে। কিন্তু সেই রাতটা আমি কখনো ভুলতে পারিনি। কারণ সেদিন আমি বুঝেছিলাম, ‘মা’ শুধু একটা শব্দ নয়। মা মানে পৃথিবী, নির্ঘুম রাত, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর সন্তানের কষ্ট নিজের ভেতরে বয়ে বেড়ানো এক অসীম মমতা।
এখনো যখন অসুস্থ হই, তখন সেই রাতটার কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে কুপির আলো, শীতের কুয়াশা আর আমার কপালে আম্মুর ঠান্ডা হাতের স্পর্শ। পৃথিবীতে হয়তো অনেক মানুষ ভালোবাসতে জানে, কিন্তু মায়ের মতো করে কেউ কখনো ভালোবাসতে পারে না। কারণ পৃথিবীর সব অসুখ আজও তোমার আঁচলেই শান্ত হয়ে যায়।
লেখক: শিক্ষার্থী, তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃত ইন্সটিটিউট (চতুর্থ বর্ষ) জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা