ক্যাম্পাস

অপ্রকাশিত বাস্তবতা: চার দেয়ালের ভেতর মা

মা শুধু একটি শব্দ নয়, এক অমূল্য সম্পদ। একটি জাতি, একটি সমাজব্যবস্থা, একটি গোষ্ঠী, এমনকি একটি সভ্যতার সূচনাতেও নিঃশব্দে জড়িয়ে থাকে মা নামের এই বিস্ময়। পৃথিবীর সবচেয়ে নির্মল অনুভূতিগুলোর একটি হলো মা। অথচ জীবনের এতটা পথ পেরিয়েও কখনো শুদ্ধ ভাষায়, স্পষ্ট করে, মাকে জড়িয়ে ধরে বলা হয়নি, “মা, বড্ড ভালোবাসি তোমায়।”

ছোটবেলায় কাঁদতে ইচ্ছে করলে নির্দ্বিধায় মাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করা যেত। তখন সমাজের হিসাব ছিল না, বাস্তবতার কঠিন দেয়ালও ছিল না। শিশুমনের সব অভিমান, সব ভয় গিয়ে আশ্রয় নিত মায়ের বুকেই। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ কেমন যেন বদলে যায়। এখন নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে নিঃশব্দে চোখ ভিজে যায়, তবুও মাকে জড়িয়ে ধরে বলার সাহস হয় না “মা, আমার খুব কষ্ট হচ্ছে।”

আজও ইচ্ছে করে মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদি। কিন্তু সেই সাহস আর হয়ে ওঠে না। মন খারাপের অনুভূতিগুলো এখন চার দেয়ালের মাঝেই বন্দি হয়ে থাকে। চারপাশে সবাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মা দিবস পালন নিয়ে ব্যস্ত। ছবি, স্ট্যাটাস, আবেগ; সবই প্রকাশিত হচ্ছে প্রকাশ্যে। অথচ বাস্তবতার গভীরে আমার মা আজও নিঃশব্দে নিজের ইচ্ছেগুলো বিসর্জন দিয়ে যাচ্ছেন শুধুমাত্র সন্তানের জন্য।

প্রতিদিন শুধু নিজের আবদারগুলোই তার সামনে তুলে ধরেছি। কিন্তু তার মনের ভেতর লুকিয়ে থাকা ছোট ছোট স্বপ্নগুলোর খোঁজ নেওয়া হয়নি কোনোদিন।

আমাদের বর্তমান সমাজে এক অদ্ভুত মানদণ্ড তৈরি হয়েছে। সার্টিফিকেটধারী, উচ্চশিক্ষিত মায়েদের নিয়ে গর্ব করা হয়; কিন্তু যে মা হয়তো কোনো ডিগ্রি অর্জন করেননি, অথচ জীবনভর ত্যাগ করে সন্তান মানুষ করেছেন তাদের অনেক সময় সেই সম্মান দেওয়া হয় না। কথিত সভ্য সমাজ জনসম্মুখে সেই মায়েদের গল্প তুলে ধরে না।

কী অদ্ভুত এই সমাজব্যবস্থা! যে মা মৃত্যুযন্ত্রণার ঝুঁকি নিয়ে সন্তান জন্ম দেন, রাত জেগে লালন করেন, নিজের জীবন বিসর্জন দেন, শেষ বয়সে সেই মায়ের ঠিকানা হয় বৃদ্ধাশ্রম।

মানুষ হওয়া কি শুধু দু’হাত, দু’পা, দু’চোখ আর দু’কান থাকার নাম? বাহ্যিক রূপ কি মানুষের সৌন্দর্য নির্ধারণ করে? না, মানুষের প্রকৃত সৌন্দর্য প্রকাশ পায় তার মানসিকতায়, তার মানবিকতায়। আর একজন সন্তানের মনন, ব্যক্তিত্ব, মূল্যবোধ ও সমাজবোধ গড়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান থাকে একজন মায়ের।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দূরত্বও যেন বেড়ে গেছে। মন খারাপের দিনগুলোয় এখন আর মাকে জড়িয়ে ধরে বলা হয় না “মা, আমি ভালো নেই।” এখন মা আর নিজের হাতে খাবার খাইয়ে দেন না। আমি নাকি অনেক বড় হয়ে গেছি। ব্যস্ততাও বেড়েছে জীবনের সঙ্গে সঙ্গে। আর এদিকে ডাক্তারের দীর্ঘ ওষুধের তালিকাই এখন মায়ের নিত্যসঙ্গী।

লেখক: শিক্ষার্থী, মার্কেটিং বিভাগ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা