মোরগের ডাকে, ভোরের আলো ফোটারও আগে যার দিন শুরু হয়, আর সন্ধ্যার অন্ধকার নামার পরও যার কাজ থামে না; তিনি একজন গৃহিণী মা। আমার এই গল্প এমন এক মায়ের, যিনি কোনো অফিসে যান না, তবুও সারাদিন কর্মব্যস্ত থাকেন। নেই কোনো বেতন, নেই কোনো ছুটি, নেই কোনো স্বীকৃতির দাবি, তবুও নিঃশব্দে একটি পুরো পরিবারকে আগলে রাখেন ভালোবাসা আর পরিশ্রম দিয়ে।
আমার মা হামিদা বেগম, একজন গৃহিণী। আমাদের পরিবার কৃষিনির্ভর। তাই সংসারের কাজের পাশাপাশি ফসলের সঙ্গেও তার এক অদৃশ্য সম্পর্ক গড়ে উঠেছে বছরের পর বছর ধরে। ঘুম ভাঙার পরই শুরু হয় তার দিনের প্রথম যুদ্ধ, চুলায় আগুন জ্বালানো, সকালের খাবার তৈরি, সবার খাওয়ার ব্যবস্থা করা। তারপর গরুর দেখাশোনা, গোয়াল পরিষ্কার, খড় জোগাড়, সব যেন তার একার দায়িত্ব।
মাঠ থেকে ফসল ঘরে আসে, কিন্তু সেই ফসল ঘরে ওঠার পেছনেও থাকে মায়ের ঘাম মেশানো পরিশ্রম। মাড়াই-ঝাড়াই, শুকানো, তোলা, সব কাজেই তার হাতের ছোঁয়া। আর ফসল ঘরে তোলার পরও কাজ শেষ হয় না; বরং শুরু হয় আরেক অধ্যায়। পরিষ্কার করা, বাছাই করা, যত্ন করে সংরক্ষণ করা, এসব সূক্ষ্ম কাজেও মায়ের নিপুণতা আলাদা করে চোখে পড়ে।
আমাদের বাড়ির উঠোনটাই যেন তার কর্মক্ষেত্র। সেই উঠোনেই তিনি নিঃশব্দে গড়ে তোলেন সংসারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। কোনো হিসাবের খাতায় যার মূল্য লেখা থাকে না, অথচ সংসারের সবচেয়ে বড় ভরসাগুলোর একটি হয়ে থাকেন তিনিই।
সারাদিনের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর, ক্লান্ত শরীর নিয়েও মা আবার ফিরে যান চুলোর পাশে। রাতের খাবার তো তৈরি করতে হবে। ঘর-দুয়ার পরিষ্কার করা থেকে শুরু করে পরিবারের সবার দেখাশোনা, এ বাড়ির প্রতিটি কাজ যেন তার কাঁধেই এসে জমা হয়। কাজের যেন শেষ নেই, তবুও কখনো তাকে অভিযোগ করতে দেখিনি। আরো আশ্চর্যের বিষয়, এসব কিছুর জন্য তিনি আলাদা করে কোনো প্রশংসাও চান না।
এত কষ্ট, এত দায়িত্ব, এত অবিরাম শ্রমের পরও কিসের এক অদ্ভুত মায়ায় তিনি জড়িয়ে আছেন এই বাড়ির সঙ্গে! কীসের বিনিময়ে মা এই কষ্টের পাহাড় বয়ে নিয়ে চলেন; সেই প্রশ্নের উত্তর হয়তো কোনোদিন পুরোপুরি জানা হবে না।
এক নিঃস্বার্থ গৃহবধূকে নিমগাছের সঙ্গে তুলনা করে কথাশিল্পী বনফুল লিখেছিলেন তার বিখ্যাত ছোটগল্প নিমগাছ—‘কেউ ছালটা ছাড়িয়ে নিয়ে সিদ্ধ করছে; পাতাগুলো ছিঁড়ে শিলে পিষছে কেউ; কেউবা ভাজছে গরম তেলে।’
এত কিছুর পরও নিমগাছটা বাড়ি ছেড়ে কোথাও চলে যেতে পারে না। কারণ, ‘মাটির ভিতরে শিকড় অনেক দূর চলে গেছে।’ হয়তো আমার মা-ও ঠিক সেই নিমগাছটির মতো। সংসারের মাটি ভেদ করে তার মায়ার শিকড়ও অনেক গভীরে পৌঁছে গেছে। তাই শত ক্লান্তি, শত না-পাওয়া, শত অবহেলার পরও তিনি থেকে যান, একটি পরিবারের ছায়া হয়ে, নীরব ভালোবাসার আরেক নাম হয়ে।
লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা