মা মানেই পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। এমন এক ছায়া, যেখানে ক্লান্ত মানুষটাও শান্তি খুঁজে পায়। জীবনের প্রতিটি কঠিন সময়ে, প্রতিটি অসুস্থতার রাতে, প্রতিটি ব্যর্থতার মুহূর্তে একজন মানুষ নিঃশব্দে সন্তানের পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন। সেই মানুষটির নাম আমার আদরিণী মা।
আমি সাতক্ষীরা শহরের এক সাধারণ পরিবারের বড় সন্তান। ছোটবেলা থেকেই আমার পৃথিবীজুড়ে ছিল মায়ের মমতা। প্রাইমারি স্কুলের পরীক্ষা শেষ হলেই ডিসেম্বর মাসে মায়ের সঙ্গে নানার বাড়ি যাওয়া ছিল আমার সবচেয়ে আনন্দের স্মৃতি। ছোট মামার সঙ্গে খেলাধুলা করা, পুরো পথজুড়ে মায়ের হাত শক্ত করে ধরে থাকা—এসবই ছিল আমার ছোটবেলার সুখ। তখন বুঝিনি, সেই হাতটাই একদিন আমার সাহস, আমার নিরাপত্তা আর জীবনের সবচেয়ে বড় নির্ভরতা হয়ে থাকবে।
ছোটবেলা থেকেই আমি বেশ অসুস্থ থাকতাম। অসুস্থতা মানেই ছিল মায়ের ব্যস্ততা। কখনো সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কখনো প্রাইভেট হাসপাতালের দীর্ঘ সিরিয়াল, কখনো সকালবেলা থেকে অপেক্ষা। মা নিজে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতেন, আর আমাকে বসিয়ে রাখতেন যেন আমি ক্লান্ত না হয়ে পড়ি। রক্ত পরীক্ষা, রিপোর্ট সংগ্রহ কিংবা ডাক্তারের কক্ষের সামনে অপেক্ষা—প্রতিটি মুহূর্তে আম্মুই ছিলেন আমার ভরসা।
আজও মনে আছে হাসপাতালের সেই বেঞ্চগুলোতে বসে আমি শুধু মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। তার চোখে ঘুম ছিল না, ক্লান্তি ছিল না; ছিল শুধু সন্তানের সুস্থ হয়ে ওঠার অদৃশ্য প্রার্থনা। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দোয়া বোধহয় একজন মায়ের বুক থেকেই বের হয়।
প্রাইমারি স্কুল পর্যন্ত আমি ভালো শিক্ষার্থী ছিলাম। কিন্তু হাইস্কুলে উঠে কিছুটা ফাঁকিবাজ হয়ে পড়ি। ফলাফল খারাপ হলে মা বকাঝকা করতেন। তখন তার কথাগুলো খারাপ লাগত। মনে হতো, মা বুঝি শুধু রাগই করেন। অথচ আজ বুঝি, সেই বকাঝকার ভেতরেও ছিল সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক মায়ের দুশ্চিন্তা। হয়তো সেই কারণেই একদিন জেদ করে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম—আমাকে ঢাকায় পড়তে হবে, উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে হবে, নিজেকে বদলাতে হবে।
আলহামদুলিল্লাহ, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে আজ আমি ঢাকায় পড়াশোনা করছি। কিন্তু এই ঢাকা শহরে এসে বুঝেছি, স্বপ্ন পূরণের পথ যত বড় হয়, মায়ের থেকে দূরত্বটাও তত গভীর হয়ে যায়।
২০২৪ সালের অক্টোবরে যখন ঢাকায় আসি, মা আমার সবকিছু নিজ হাতে গুছিয়ে দিয়েছিলেন। কাপড়, বই, প্রয়োজনীয় ছোট ছোট জিনিস—এমনকি কোনটা কোথায় রাখলে আমার সুবিধা হবে, সেটাও তিনি ভেবে দিয়েছিলেন। হয়তো ভেতরে ভেতরে কষ্ট পেয়েছিলেন, কিন্তু আমাকে বুঝতে দেননি। কারণ মায়েরা নিজের কষ্ট লুকিয়ে রাখতে জানেন।
ঢাকার এই ব্যস্ত শহরে প্রায় সবার কাছেই তাদের মা আছেন। কেউ অসুস্থ হলে মা পাশে বসে থাকেন, কেউ রাতে ফোন করে জিজ্ঞেস করেন—“খেয়েছো?” কেউ পরীক্ষার আগে মাথায় হাত রেখে দোয়া করেন। আর আমার মা আছেন গ্রামের বাড়িতে, অনেক দূরে। এই দূরত্বটা শুধু পথের নয়, কখনো কখনো সেটা বুকের ভেতর জমে থাকা এক গভীর শূন্যতার নাম।
গত বছর ফাইনাল পরীক্ষার সময় আমি ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হই। শরীর খুব দুর্বল ছিল, তবু পরীক্ষা দিতে হয়েছে। অসুস্থ শরীর নিয়ে একা একা মহাখালী ডিএনসিসি করোনা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়েছিলাম। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে নিজেই রক্ত পরীক্ষা করিয়েছি, রিপোর্ট নিয়েছি, আবার ডাক্তার দেখিয়েছি। চারপাশে তাকিয়ে দেখেছি, সবার সঙ্গে তাদের বাবা-মা কিংবা প্রিয়জন আছেন। কেউ সন্তানের মাথায় হাত রেখে সাহস দিচ্ছেন, কেউ প্রয়োজনীয় জিনিস এনে দিচ্ছেন, কেউ পরীক্ষার পর বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন।
অসুস্থ অবস্থায় একাডেমিক পরীক্ষা দিতে গিয়ে দেখলাম, অনেক শিক্ষার্থীর সঙ্গে তাদের মায়েরা এসেছেন। কেউ সন্তানের ব্যাগ ধরে দাঁড়িয়ে আছেন, কেউ বারবার বলছেন, “ভয় পাস না, ভালো করে পরীক্ষা দে।” দৃশ্যগুলো খুব সাধারণ ছিল, কিন্তু সেদিন সেগুলো আমার বুকের ভেতর গভীর কষ্ট হয়ে জমেছিল। মনে হচ্ছিল, এই শহরে আমি সত্যিই একা। তখন খুব করে মাকে মনে পড়ছিল। কারণ জীবনে কখনো একা হাসপাতালে যেতে হয়নি। সবসময় আম্মুই হাত ধরে নিয়ে গেছেন।
আজকাল ক্লাস কিংবা কোনো শিক্ষামূলক কাজ শেষে যখন ঢাকার বাসায় ফিরি, তখন সবচেয়ে বেশি মায়ের অভাব অনুভব করি। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলে হঠাৎ মনে হয়, মা থাকলে হয়তো ভাত বেড়ে রাখতেন। হয়তো বলতেন, “হাত-মুখ ধুয়ে খেতে বসো।” হয়তো কাপড়গুলো পরিষ্কার করে গুছিয়ে রাখতেন। মাথায় তেল দিয়ে দিতেন। ছোট ছোট বিষয়গুলো নিয়ে আমাকে ভাবতে হতো না। এখন নিজের কাপড় নিজেকেই ধুতে হয়, অসুস্থ হলেও নিজেকেই ওষুধ খেতে মনে রাখতে হয়। জীবনকে গুছিয়ে নিতে গিয়ে মাঝে মাঝে বুঝতে পারি, মা শুধু একজন মানুষ নন; তিনি একটি পূর্ণ পৃথিবীর নাম। মা পাশে থাকলে এলোমেলো জীবনটাও অদ্ভুতভাবে গুছিয়ে যায়।
অনেক রাতে ক্লান্ত শরীরে বিছানায় শুয়ে যখন গ্রামের বাড়ির কথা মনে পড়ে, তখন বুকের ভেতর অদ্ভুত এক শূন্যতা তৈরি হয়। মনে হয়, পৃথিবীর সব ব্যস্ততা, সব স্বপ্নের চেয়েও মূল্যবান ছিল মায়ের সেই নিঃস্বার্থ যত্নগুলো।
আজ আমি যতটুকু পথ চলছি, তার প্রতিটি ধাপে আমার মায়ের ত্যাগ মিশে আছে। পরিবারের বড় সন্তান হিসেবে আমি জানি, আমার স্বপ্নের চেয়েও বড় স্বপ্ন দেখেন আমার মা। নিজের কষ্ট, ক্লান্তি আর অপূর্ণ ইচ্ছাগুলো আড়াল করে তিনি শুধু চেয়েছেন, আমি যেন মানুষের মতো মানুষ হতে পারি।
হয়তো কোনোদিন তার ঋণ শোধ করতে পারব না। তবু জীবনের প্রতিটি সফলতার পেছনে আমি শুধু একজন মানুষের মুখই দেখি—যিনি নিঃশব্দে নিজের সবটুকু দিয়ে আমাকে আগলে রেখেছেন, তিনি আমার মা।
পৃথিবীর সকল মায়ের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও অফুরন্ত ভালোবাসা। পৃথিবীর প্রতিটি মা সুস্থ থাকুক, ভালো থাকুক, সন্তানের মুখে হাসি দেখে বেঁচে থাকুক বহু বছর। আর আল্লাহ তাআলা যেন আমাকে এমন তৌফিক দান করেন, যাতে আমি আমার মায়ের জন্য, আমার পরিবারের জন্য নিজের সর্বোচ্চটুকু দিতে পারি। কারণ একজন মায়ের ভালোবাসার কাছে পৃথিবীর সবকিছুই ছোট হয়ে যায়।
লেখক: শিক্ষার্থী, সরকারি তিতুমীর কলেজ, ঢাকা