ক্যাম্পাস

নিঃশব্দ রাতে মায়ের সেই মায়াভরা ডাক

রুমের দেয়ালে ঝুলে থাকা ঘড়ির সেকেন্ডের কাঁটা অবিরাম ছুটে চলেছে। সময় তখন রাত প্রায় ২টা। পুরো ক্যাম্পাস অনেক আগেই নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। জানালার বাইরে হালকা বাতাসে গাছের পাতাগুলো নড়ে উঠছে, দূরে কোথাও কুকুরের ক্ষীণ ডাক ভেসে আসছে। আর আমি টেবিলের সামনে চুপচাপ বসে আছি, শুধু সময়ের শব্দ শুনে।

হঠাৎ খেয়াল হলো সারাদিন ভাতই খাওয়া হয়নি। সকাল থেকে ক্যাম্পাসে দৌড়ঝাঁপ, ক্লাস, বন্ধুদের সাথে ব্যস্ততা, সব মিলিয়ে খাওয়ার কথা মনেই আসেনি। দুপুর গড়িয়ে বিকেল, মাঝে সামান্য নাস্তা। তারপর সন্ধ্যার পর টিউশন, ফিরে এসে অ্যাসাইনমেন্টের চাপ। কাজের ভিড়ে শরীরের ক্লান্তি টের পাইনি, কিন্তু রাত গভীর হতেই পেটের ক্ষুধা যেন নীরবে জেগে উঠল।

আশ্চর্যের বিষয়, সেই ক্ষুধাটা শুধু পেটের ছিল না। বুকের ভেতরেও হঠাৎ এক অদ্ভুত শূন্যতা নেমে এলো। মনে হলো, আমি যেন শুধু খাবারের জন্য না; কারো মায়াভরা ডাকার জন্য অপেক্ষা করছি। বাসায় থাকলে ‘মা’ কখনোই আমাকে না খাইয়ে ঘুমাতে দিত না। রাত যতই হোক, দরজার ফাঁক দিয়ে আলো এসে পড়ত রুমে। তারপর সেই চিরচেনা কণ্ঠ, “চল, একটু হলেও খেয়ে নে, না খেয়ে ঘুমানো যায় নাকি?” তারপর শুরু হতো সেই পরিচিত উপদেশের ধারা, না খেলে গ্যাস্ট্রিক হবে, শরীর দুর্বল হয়ে যাবে, মাথা ব্যথা করবে। মাঝে মাঝে মনে হতো, না খেয়ে ঘুমানোর এত ক্ষতির কথা ডাক্তাররাও বুঝি জানেন না!

তখন বিরক্ত লাগত। মনে হতো, খাবার নিয়ে মানুষ এত কথা কেন বলে! কিন্তু আজ এই দূরের ক্যাম্পাসে, রাতের নিঃশব্দ রুমে বসে বুঝতে পারি, সেই কথাগুলো আসলে বিরক্তি ছিল না, ছিল ভালোবাসার আরেকটা ভাষা। যত্নের সবচেয়ে নরম প্রকাশ।

এখানে কেউ জোর করে খেতে ডাকে না। কেউ অপেক্ষা করে থাকে না আমি খেয়েছি কি না জানার জন্য। অসুস্থ হলে নিজের ওষুধ নিজেকেই খুঁজে নিতে হয়, ক্লান্ত হলে নিজের খেয়াল নিজেকেই রাখতে হয়। বড় হয়ে যাওয়ার সবচেয়ে নীরব কষ্ট বোধহয় এটাই; একদিন হঠাৎ বুঝে ফেলা, পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃস্বার্থ যত্নটা আমরা ঘরের দোরগোড়ায় ফেলে এসেছি।

আজ খুব ইচ্ছে করছে, দরজার ওপাশ থেকে আবার কেউ ডাকুক, ‘দুমুঠো খেয়ে নে বাবা’। আজ হয়তো খাবার না থাকলেও চলবে, শুধু সেই মায়াভরা ডাকটা একবার শুনতে চাই।

লেখক: শিক্ষার্থী, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, নোয়াখালী