বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (ববি) ২৪ শিক্ষকের পদোন্নতির জটিলতা ঘিরে উপাচার্যকে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফের পূর্ণাঙ্গ শাটডাউন কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন আন্দোলনরত শিক্ষকরা। এতে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে।
সোমবার (১১ মে) সকালে এ শাটডাউন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
সোমবার সকাল ৯টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজের ব্যানারে আন্দোলনরত শিক্ষকরা প্রশাসনিক ভবনের নিচতলায় অবস্থান নিয়ে উপাচার্যকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন। পরে তারা রেজিস্ট্রারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় উপাচার্যকে প্রশাসনিকভাবে অসহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে রেজিস্ট্রারকে কক্ষ ত্যাগের জন্য চাপ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে। পরে তিনি কক্ষ ত্যাগ করলে কর্মচারীদের মাধ্যমে প্রশাসনিক দপ্তরগুলোতে তালা ঝোলানো হয়।
একইভাবে অর্থ ও হিসাব দপ্তরের পরিচালকের কার্যালয়েও চাপ প্রয়োগের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কক্ষ ত্যাগ করলে সেখানেও তালা ঝোলানো হয় বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
তালা ঝোলানোর সময় কয়েকজন কর্মচারী বলেন, শিক্ষকদের নির্দেশনাতেই আমরা তালা ঝুলিয়েছি।
তবে প্রশাসনিক কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক দপ্তরপ্রধান বলেন, “তাদের আন্দোলন সফল হোক, সেটি আমরাও চাই। কিন্তু অফিসে এসে জোরপূর্বক বের করে দিয়ে তালাবদ্ধ করা সমর্থনযোগ্য নয়।”
এদিকে, পদোন্নতি নীতিমালা নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যেই বিভাজনের অভিযোগ উঠেছে। একাধিক শিক্ষকের ভাষ্য অনুযায়ী, অধ্যাপক পদে পদোন্নতি প্রত্যাশীরা নিজেদের জন্য পৃথক নীতিমালার পক্ষে অবস্থান নিলেও সহযোগী ও সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি প্রত্যাশীদের বড় একটি অংশ অভিন্ন নীতিমালায় আপত্তি দেখছেন না। তবে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি প্রত্যাশীদের একটি অংশ পৃথক নীতিমালার দাবিতে অনড় থাকায় শিক্ষক সমাজে মতভেদ তৈরি হয়েছে।
আন্দোলনকারী শিক্ষকরা জানিয়েছেন, পদোন্নতি ইস্যুকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক দায়িত্বেও ভাঙন দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন অনুষদের ডিন, বিভাগীয় চেয়ারম্যান, প্রক্টর, শারীরিক শিক্ষা দপ্তরের পরিচালক এবং এক সিন্ডিকেট সদস্য পদত্যাগ করেছেন।
এর আগে গত ৩০ এপ্রিল উপাচার্য, সিন্ডিকেট সদস্য, বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার ও ডিনদের ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে ৮ মে অনুষ্ঠিতব্য সিন্ডিকেট সভায় বিদ্যমান আইন ও নীতিমালার আলোকে সংকট সমাধানের সিদ্ধান্ত হয় বলে দাবি করেন শিক্ষকরা। তবে তাদের অভিযোগ, ৮ মে রাতে জরুরি ভিত্তিতে এজেন্ডাবিহীন সিন্ডিকেট সভা ডেকে ৯ মে তা আয়োজন করা হয় এবং সেখানে অধিকাংশ সদস্যের মতামত উপেক্ষা করে একক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আন্দোলনকারী শিক্ষক ও ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান সহযোগী অধ্যাপক ধীমান কুমার রায় বলেন, “আমরা উপাচার্যকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছি। তাকে প্রশাসনিকভাবে কোনো সহযোগিতা করবো না। বিভিন্ন প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা শিক্ষকরা পদত্যাগ করছেন। পদোন্নতি বোর্ড বসানোর ৬ মাস পার হলেও বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।”
সদ্য পদত্যাগ করা জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন এবং কোস্টাল স্টাডিজ অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান সহযোগী অধ্যাপক হাফিজ আশরাফুল হক বলেন, “দীর্ঘদিন চেষ্টার পরও সমাধান হয়নি। সর্বশেষ সিন্ডিকেট সভাতেও বিষয়টির নিষ্পত্তি না হওয়ায় শিক্ষকরা কঠোর কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হয়েছেন। সমাধান না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি চলবে। ওনার সঙ্গে থেকে আর কাজ করা সম্ভব নয় বলেই আমি দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেছি।”
তবে, এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ তৌফিক আলম বলেন, “জরুরি সিন্ডিকেট সভায় শিক্ষকদের পাঁচজন প্রতিনিধির উপস্থিতিতে সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, দুই মাসের মধ্যে পদোন্নতি সংক্রান্ত সংবিধি প্রণয়ন করে নিয়মতান্ত্রিকভাবে পদোন্নতির কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে।”
উপাচার্যকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার বিষয়ে তিনি বলেন, “তারা ঘোষণা করতেই পারে। সরকার আমাকে দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছে। সরকার যতদিন দায়িত্বে রাখবে, ততদিন নিয়মতান্ত্রিকভাবে দায়িত্ব পালন করবো।”
প্রশাসনিক কার্যক্রমে বাধা ও কর্মকর্তাদের ওপর চাপ প্রয়োগের বিষয়ে উপাচার্য বলেন, “সব সমস্যার সমাধান আলোচনার মাধ্যমে সম্ভব। শিক্ষার্থীদের ক্ষতি করে এ ধরনের আন্দোলন সমীচীন নয়। কেউ ব্যক্তিগতভাবে কর্মবিরতি পালন করতে পারে, তবে অন্যের কাজে বাধা দেওয়া আইনবিরোধী। এ ধরনের কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”