ক্যাম্পাস

৩ হাজার নবীন শিক্ষার্থীকে বরণ করে নিল ঢাবি শিবির

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষেরপ্রায় তিন হাজার শিক্ষার্থী নবীন শিক্ষার্থীকে বরণ করে নিতে দিনব্যাপী নবীনবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।

শনিবার (১৬ মে, ২০২৬) বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি অডিটোরিয়ামে দিনব্যাপী এ নবীনবরণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। সকাল, দুপুর ও সন্ধ্যায় তিনটি পৃথক স্লটে বিভিন্ন অনুষদের শিক্ষার্থীদের নিয়ে আয়োজনটি সম্পন্ন করা হয়।

সকাল ৯টা ৩০ মিনিটে কলা, আইন ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রথম সেশন, দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে বিজ্ঞান অনুষদ ও সংশ্লিষ্ট ইনস্টিটিউটসমূহের শিক্ষার্থীদের নিয়ে দ্বিতীয় সেশন এবং সন্ধ্যা ৭টায় ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের শিক্ষার্থীদের নিয়ে তৃতীয় সেশন অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিটি সেশনেই নবীন শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে টিএসসি অডিটোরিয়াম কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। শিক্ষার্থীরা পূর্বনির্ধারিত গুগল ফর্মের মাধ্যমে নিবন্ধন করে ডেলিগেট কার্ড সংগ্রহের মাধ্যমে অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

সকালের সেশনে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম। শহীদ ওসমান হাদীর রুহের মাগফিরাত কামনা করে তিনি বলেন, “ইউনিভার্সিটি রেগুলার স্টুডেন্টদের জায়গা হোক, এখানে কোনো ‘আদু ভাইয়ের’ জায়গা না হোক। এই স্বপ্ন নিয়েই ডাকসুতে আমরা শিক্ষার্থীদের কাছে কমিটমেন্ট দিয়েছিলাম। শিক্ষার্থীরা সেই কমিটমেন্টের ওপর আস্থা রেখেছে এবং আমরা তা বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর।”

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ডাকসুর ভিপি ও ছাত্রশিবিরের প্রকাশনা সম্পাদক মো. আবু সাদিক কায়েম বলেন, “জুলাই বিপ্লবের আগে এই ক্যাম্পাস ছিল নিপীড়নের ক্যাম্পাস। গণরুম-গেস্টরুমের সংস্কৃতির কারণে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার সময়ই পেত না। ৫ আগস্টের পর আমরা সেই ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার কবর রচনা করেছি।”

তিনি আরো বলেন, “নবীন শিক্ষার্থীরা যদি নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকে, তাহলে এই ক্যাম্পাসে আর কখনো গণরুম-গেস্টরুম সংস্কৃতি ফিরবে না। শিক্ষার্থীদের এ দাবিতে আমরা জীবন দিয়েও পাশে থাকব।”

ডাকসুর কার্যক্রম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “প্রশাসনিক অসহযোগিতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে অনেক সময় উন্নয়নমূলক কাজ ব্যাহত হচ্ছে।”

সকালের সেশনে প্যানেল আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শিশির মনির, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক শিব্বির আহমেদ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ বিলাল হোসেন এবং ছাত্রশিবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ও ডাকসুর এজিএস মুহা. মহিউদ্দিন খান।

শিশির মনির বলেন, “দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, মেধাবীদের একটি বড় অংশ দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। কে কোন ধর্মের, কে হিজাব পরে বা পরে না, কে কোন রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাস করে এসব বড় বিষয় নয়। বাংলাদেশের দরকার দক্ষ ও সৎ জনশক্তি।”

দুপুরের বিজ্ঞান অনুষদের সেশন ক্বারী আব্দুল্লাহ আল জাওয়াদের কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে শুরু হয়। পরে সংগীত পরিবেশন করে প্রবাহ সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংসদ।

স্বাগত বক্তব্যে ছাত্রশিবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক মু. সাজ্জাদ হোসাইন খান বলেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল গণরুম-গেস্টরুমের বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু আন্দোলনের পর আমরা নতুন একটি বিশ্ববিদ্যালয় পেয়েছি।”

তিনি আরো বলেন, “কেউ যদি শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন নষ্ট করতে চায়, আমরা তাদের পাশে থাকব। কাউকে শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন বিনষ্ট করতে দেওয়া হবে না।”

ডাকসুর জিএস ও ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক এস এম ফরহাদ বলেন, “এই ক্যাম্পাসে ভালো এবং খারাপ হওয়ার সব উপকরণই আছে। সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের নিতে হবে।”

তিনি দাবি করেন, “ডাকসুর সফলতা হলো—নির্বাচনের পরও কেউ হল দখল করতে পারেনি। আমরা ছাত্রীদের জন্য আলাদা জিমনেশিয়াম, শনিবারের বাস সার্ভিস, মসজিদ সংস্কার, রিডিংরুমে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও মাতৃত্বকালীন ছুটি চালু করেছি।”

বিজ্ঞান অনুষদের সেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা বলেন, “জুলাইয়ের ১৬ তারিখ সারা দেশ থেকে গণরুম-গেস্টরুম সংস্কৃতি বিতাড়িত হয়েছে। কেউ যদি আবার এটি ফিরিয়ে আনতে চায়, তাকে ছাত্রশিবিরের রক্তের ওপর দিয়ে যেতে হবে।”

তিনি আরো বলেন, “আবরার ফাহাদকে যারা হত্যা করেছিল, তারাও ভালো শিক্ষার্থী ছিল। নষ্ট রাজনীতি তাদের খুনি বানিয়েছে। আমরা তোমাদের জন্য একটি সুন্দর ক্যাম্পাস রেখে যেতে চাই।”

ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও পরিকল্পনাবিদ সিরাজুল ইসলাম বলেন, “আমরা চাই, তোমাদের হাত ধরেই প্রাচ্যের অক্সফোর্ড আবারো বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করুক।”

বিজ্ঞান অনুষদের সেশনে প্যানেল আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক মো. আব্দুর রব, বুয়েটের অধ্যাপক মো. ফখরুল ইসলাম এবং মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির খণ্ডকালীন শিক্ষক মো. শরফুদ্দিন।

অধ্যাপক আব্দুর রব বলেন, “গবেষণা ছাড়া কোনো বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ণতা পায় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে সমাজ, রাষ্ট্র, ধর্ম ও দর্শন সম্পর্কে জ্ঞান থাকতে হবে।”

অধ্যাপক ফখরুল ইসলাম বলেন, “উন্নত হতে হলে আমাদের নিজেদের ব্র্যান্ড তৈরি করতে হবে। শুধু বিদেশমুখী চিন্তা করলে হবে না।” মো. শরফুদ্দিন শিক্ষার্থীদের গবেষণা, প্রকাশনা ও ভালো ফলাফলের প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “প্রথম বর্ষের ফলাফল ভবিষ্যৎ একাডেমিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।”

সন্ধ্যা ৭টায় ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের শিক্ষার্থীদের নিয়ে তৃতীয় সেশন অনুষ্ঠিত হয়। এ সেশনে প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এইচ এম মোশাররফ হোসেন, খাস ফুডের সিইও হাসিবুল মুস্তফা আরমান এবং মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম এফসিএ (আইসিএবি), এসিএ। তারা শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার পরিকল্পনা, উচ্চশিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন বিষয়ে বিভিন্ন পরামর্শ দেন।

দিনব্যাপী প্রতিটি সেশনে নবীন শিক্ষার্থীদের মধ্যে আল-কোরআন, ব্যাগ, নোটপ্যাড, কলম ও চাবির রিংসহ বিভিন্ন উপহারসামগ্রী বিতরণ করা হয়। পাশাপাশি হালকা নাস্তা পরিবেশনের মাধ্যমে প্রতিটি সেশন শেষ হয়।