ক্যাম্পাস

অব্যবহৃত সৌরশক্তির নতুন ব্যবহার নিয়ে কর্মশালা

‘নবায়নযোগ্য শক্তি ও ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারে কৃষির টেকসই রূপান্তর’ প্রতিপাদ্যে বাংলাদেশে সৌরচালিত সেচপাম্পের অব্যবহৃত বিদ্যুৎ কৃষি উৎপাদন, সংরক্ষণ ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে কাজে লাগানোর লক্ষ্য নিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘স্মার্ট-সিপ প্লাস’ প্রকল্পের বার্ষিক কর্মশালা।

মঙ্গলবার (১৯ মে) সকাল ১০টায় ঢাকার গুলশান-২ এর লেক শোর গ্র্যান্ডে দিনব্যাপী এ কর্মশালার উদ্বোধন করেন বাকৃবি উপাচার্য অধ্যাপক এ কে ফজলুল হক ভূঁইয়া। যুক্তরাজ্যের গবেষণা ও উদ্ভাবন সংস্থার (ইউকেআরআই) অর্থায়নে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগে চলমান ‘স্মার্ট-সিপ প্লাস: বাংলাদেশে সৌরচালিত সেচপাম্পের উদ্বৃত্ত শক্তির বহুমুখী ব্যবহারে উদ্ভাবনী উদ্যোগ’ প্রকল্পের আওতায় এ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।

স্বাগত বক্তব্য দেন স্মার্ট-সিপ প্লাস প্রকল্পের ইন-কান্ট্রি লিড এবং বাকৃবির কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের অধ্যাপক চয়ন কুমার সাহা।

উদ্বোধনী অধিবেশনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বার্মিংহাম সিটি ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও স্মার্ট-সিপ প্লাস প্রকল্পের প্রধান ড. লিনসি মেলভিল। তিনি বলেন, “বাংলাদেশে মোট পানির ব্যবহারের প্রায় ৮৬ শতাংশই সেচকাজে ব্যবহৃত হয় এবং এর মধ্যে ৭০ শতাংশ ধানচাষে লাগে। শুকনা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের কারণে অনেক এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ১৫ শতাংশ পর্যন্ত নিচে নেমে গেছে। এই সংকট মোকাবিলায় সৌরশক্তির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করাই প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য।”

তিনি জানান, প্রকল্পটির সঙ্গে ডিজিটাল টুইন প্রযুক্তি, ডিসিশন সাপোর্ট সিস্টেম (ডিএসএস), জিআইএসভিত্তিক ম্যাপিং টুলস, বিজনেস মডিউল এবং স্মার্ট এনার্জি সিস্টেম যুক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে কৃষক, গবেষক, বেসরকারি সংস্থা ও সরকারি নীতিনির্ধারকদের একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।

ড. মেলভিল আরো বলেন, “বর্তমানে দেশে প্রায় ১৬ লাখ সেচপাম্প ব্যবহৃত হচ্ছে, যার মধ্যে প্রায় ১২ লাখই ডিজেলচালিত। এসব পাম্প পরিবেশ দূষণ ও গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে ভূমিকা রাখছে। তাই নবায়নযোগ্য শক্তিনির্ভর সৌরচালিত সেচপাম্প ব্যবহারের গুরুত্ব বাড়ছে। তবে সেচ মৌসুমের বাইরে এসব পাম্প থেকে উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ অব্যবহৃত থেকে যায়।”

বর্তমানে দেশে ৩ হাজার ৪০০-এর বেশি সৌরচালিত সেচপাম্প রয়েছে। সেচ মৌসুমের বাইরে এসব পাম্পের উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৫৭ শতাংশ অব্যবহৃত থাকে। স্মার্ট-সিপ প্লাস প্রকল্পের মাধ্যমে এই উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করে কোল্ড স্টোরেজ, ফসল শুকানো, মাড়াই, ইলেকট্রিক যানবাহন চার্জিং, পানি বিশুদ্ধকরণ এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

কর্মশালায় বাকৃবি উপাচার্য অধ্যাপক এ কে ফজলুল হক ভূঁইয়া বলেন, “পানি, শক্তি ও খাদ্য—এই তিনটি বিষয় মানুষের জীবনধারণের প্রধান উপাদান। এগুলোর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারলে ভবিষ্যতে বড় সংকট তৈরি হতে পারে। এই প্রকল্পে গবেষকেরা সৌরশক্তির বহুমুখী ব্যবহারের নতুন সম্ভাবনা তুলে ধরেছেন।”

তিনি আরো বলেন, “সৌরচালিত সেচপাম্প শুধু সেচের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ধান মাড়াই কল, ড্রায়ার, কোল্ড স্টোরেজ, আবহাওয়া কেন্দ্র, এমনকি গ্রামে মোবাইল ও বিদ্যুৎচালিত যানবাহন চার্জিংয়েও ব্যবহার করা যেতে পারে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে জ্বালানি ও পানির ক্রমবর্ধমান চাহিদা মোকাবিলায় এ ধরনের কার্বনমুক্ত ও টেকসই জ্বালানি সমাধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”

উদ্বোধনী অধিবেশন শেষে পোস্টার উপস্থাপনা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় প্রকল্পসংশ্লিষ্ট গবেষক ও শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন গবেষণাভিত্তিক পোস্টার উপস্থাপন করেন।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ সিস্টেমের (বাউরেস) পরিচালক অধ্যাপক এম হাম্মাদুর রহমানের সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) সদস্য পরিচালক (ক্ষুদ্রসেচ) ও অতিরিক্ত সচিব মো. ইউসুফ আলী, বাংলাদেশে খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ডেপুটি রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. দিয়া সানু, ঢাকাস্থ ব্রিটিশ হাইকমিশনের ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিলর ও ডেপুটি ডেভেলপমেন্ট ডিরেক্টর মার্টিন ডসন এবং বাকৃবির কৃষি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের ডিন অধ্যাপক মো. আব্দুল মজিদ।

এছাড়া, যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম সিটি ইউনিভার্সিটির (বিসিইউ) একটি গবেষক দলও, দেশি-বিদেশি গবেষক, নীতিনির্ধারক, উন্নয়ন সহযোগী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কৃষি বিশেষজ্ঞ, বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি ও উন্নয়নকর্মীরা অংশ নেন।