ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সবুজ আঙিনার ভেতর, যেখানে বাতাসে বইতে থাকে জ্ঞান আর তারুণ্যের স্পন্দন, সেখানেই যেন ধীরে ধীরে নিঃশব্দে বদলে যাচ্ছে পানির গল্প। শহীদুল্লাহ হল পুকুর ও জাতীয় জাদুঘর পুকুরকে ঘিরে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে এমন এক বাস্তবতা, যা সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক নীরব বিপন্নতার কথা বলে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, শহীদুল্লাহ হল পুকুর দ্রুত ইউট্রোফিকেশনের দিকে এগোচ্ছে, ফলে সেখানে জীববৈচিত্র্য গভীর ঝুঁকির মুখে।গবেষণাটি পরিচালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাহিন মহিদের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি গবেষক দল। ২০২৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি মাঠপর্যায়ে নমুনা সংগ্রহের মাধ্যমে গবেষণাটি সম্পন্ন হয় এবং ২০২৪ সালে তা ঢাকা ইউনিভার্সিটি জার্নাল অব বায়োলজিক্যাল সায়েন্সে প্রকাশিত হয়।
গবেষণায় দুই পুকুরের পানি ও প্ল্যাংকটন—অর্থাৎ পানিতে ভেসে থাকা ক্ষুদ্র জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণী বিশ্লেষণ করা হয়। বিজ্ঞানীদের ভাষায়, এই ক্ষুদ্র জীবই জলজ খাদ্যশৃঙ্খলের প্রথম সুর, যার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে পুরো পানির বাস্তুতন্ত্র। তাই তাদের পরিবর্তন মানে পুরো পরিবেশের নিঃশব্দ রূপান্তর।
গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ‘ইউট্রোফিকেশন’। সহজ ভাষায়, পানিতে অতিরিক্ত নাইট্রোজেন ও ফসফরাস জমে গেলে শৈবালের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার ঘটে। তখন পানি তার স্বচ্ছতা হারায়, অক্সিজেনের ভারসাম্য ভেঙে পড়ে এবং জলজ প্রাণের জন্য তৈরি হয় এক অদৃশ্য সংকটের দেয়াল।
তথ্য বলছে, গত প্রায় তিন দশকে শহীদুল্লাহ হল পুকুরের পানির তাপমাত্রা বেড়েছে প্রায় ৪.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। একইসঙ্গে বেড়েছে দ্রবীভূত অক্সিজেন, নাইট্রেট, ফসফরাস ও ক্লোরোফিল এ-এর মাত্রা।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিবর্তন ধরা পড়েছে স্বচ্ছতায়—পানির স্বচ্ছতা কমেছে প্রায় ৬৭ সেন্টিমিটার। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও শৈবাল বায়োমাস যথাক্রমে প্রায় ১.৯, ১.৮২, ২.২৩ ও ২.২১ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা স্পষ্টতই দ্রুত ইউট্রোফিকেশনের দিকে ইঙ্গিত করে।
অন্যদিকে, জাতীয় জাদুঘর পুকুরে পরিবর্তন তুলনামূলক ধীর। সেখানে কিছু উপাদানের ওঠানামা থাকলেও সামগ্রিক অবস্থা শহীদুল্লাহ হল পুকুরের মতো সংকটাপন্ন নয়। তবে এখানেও ইউট্রোফিকেশনের ছাপ একেবারে অনুপস্থিত নয়।
গবেষণায় আরো উঠে এসেছে এক সূক্ষ্ম ভারসাম্যহীনতা—দুই পুকুরেই জুপ্ল্যাংকটনের সংখ্যা ফাইটোপ্ল্যাংকটনের তুলনায় বেশি। এই অতিরিক্ত চাপ ফাইটোপ্ল্যাংকটনের বৈচিত্র্য কমিয়ে দিচ্ছে, যেন বাস্তুতন্ত্রের ভেতরে ধীরে ধীরে নিভে যাচ্ছে এক অদৃশ্য আলো।
গবেষকদের মতে, শহীদুল্লাহ হল পুকুরের অবস্থান দুইটি আবাসিক হলের মাঝখানে হওয়ায় মানুষের ব্যবহার, বর্জ্য ও দৈনন্দিন কার্যক্রমের প্রভাব সেখানে বেশি পড়ছে। বিপরীতে, মিউজিয়াম পুকুরে প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত থাকায় চাপ তুলনামূলকভাবে কম।
তবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) ও উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আল মোজাদ্দেদী আলফেসানী গবেষণার ফলের সঙ্গে একমত নন। তার মতে, এখনই পুকুরকে ইউট্রোফিকড বলা যাবে না; দীর্ঘদিন ধরেই এটি প্রায় একই অবস্থায় আছে।
তিনি আরো বলেন, “প্রকৃত ইউট্রোফিকেশনের লক্ষণ হিসেবে পানির গভীরতা কমে যাওয়া, ঘন ঘন ফেনা ওঠা এবং নির্দিষ্ট জলজ উদ্ভিদের বিস্তার দেখা যায়, যার কোনোটি এখানে স্পষ্ট নয়।”
অন্যদিকে, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আশফাক আহমেদ মনে করেন, পুকুরে ফসফরাস বৃদ্ধির উৎস আগে শনাক্ত করা জরুরি। বিশেষ করে উত্তর দিকের নর্দমা লাইনের বর্জ্য এর জন্য দায়ী কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘পুকুর ব্যবস্থাপনায় আমাদের বিভাগকে যথাযথভাবে সম্পৃক্ত করা হয়নি।”
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি পুকুরপাড়ের ডাস্টবিন অপসারণ করেছেন। তার মতে, দূষণ রোধ শুধু প্রশাসনের নয়, এটি সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।
তিনি আরো বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী পুকুরঘিরে ওয়াকওয়ে ও সৌন্দর্যবর্ধনের পরিকল্পনা রয়েছে।”
গবেষণায় সতর্ক করে বলা হয়েছে, ঢাকার অনেক পুকুর ইতোমধ্যে হারিয়ে গেছে। তাই শহীদুল্লাহ হল পুকুরের মতো জলাধারগুলোকে রক্ষা করা এখন শুধু পরিবেশগত নয়, বরং এক ধরনের অস্তিত্বের প্রশ্ন।
শেষ পর্যন্ত গবেষকেরা একটাই বার্তা দেন—সময় থাকতেই যদি কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তবে এই জলাধারগুলোও ধীরে ধীরে নিঃশব্দে হারিয়ে যাবে, যেমন হারিয়ে যাচ্ছে অনেক শহুরে জলজ স্মৃতি।