ক্যাম্পাস

নঈমের লেন্সে মানুষ ও জীবনের গল্প

কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা মহেশখালী। পাহাড়, সমুদ্র আর প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ঘেরা এই জনপদেই জন্ম ও বেড়ে ওঠা মুহাম্মদ নঈম উদ্দীনের। ব্যবসায়ী বাবা ও গৃহিণী মায়ের চার সন্তানের মধ্যে সবার ছোট নঈমের শৈশব কেটেছে প্রকৃতির সান্নিধ্যে। ছোটবেলা থেকেই সংস্কৃতি চর্চা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের প্রতি ছিল তাঁর গভীর আগ্রহ। সেই আগ্রহ থেকেই একসময় হাতে তুলে নেন ক্যামেরা।

২০১৬ সালের শুরুতে শখের বশে ছবি তোলার মধ্য দিয়ে আলোকচিত্রের জগতে তার যাত্রা শুরু। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই শখই রূপ নেয় স্বপ্নে, আর স্বপ্ন থেকেই গড়ে ওঠে তার পরিচয়। প্রকৃতি, মানুষ এবং জীবনের নানা গল্পকে ফ্রেমবন্দি করতে করতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একজন ফ্রিল্যান্স আলোকচিত্রী হিসেবে।

নঈমের 'তৃতীয় চোখে অন্য জীবন’- আলোকচিত্র প্রদর্শনী দেখছেন এক শিক্ষার্থী

গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী নঈম বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে যেন নিজের ভেতরের শিল্পীসত্তাকে আরও বিকশিত করার সুযোগ খুঁজছিলেন। একটা পর্যায়ে তিনি যুক্ত হন গণ বিশ্ববিদ্যালয় ফটোগ্রাফিক সোসাইটি (জিবিপিএস)-এর সঙ্গে। ২০২১-২২ সেশনে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। বর্তমানে সংগঠনের লিড মেন্টর হিসেবে নতুন প্রজন্মের আলোকচিত্রীদের পথ দেখাচ্ছেন।

ফটোগ্রাফি সম্পর্কে নঈম বলেন, “ক্যামেরা শুধু ছবি তোলে না, এটি মানুষকে নতুনভাবে দেখতে শেখায়। আমি ছবি দিয়ে মানুষের গল্প বলতে চাই।”

সব ধরনের আলোকচিত্রে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করলেও ল্যান্ডস্কেপ ফটোগ্রাফির প্রতি তার রয়েছে বিশেষ ভালোবাসা। পাশাপাশি পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফিও তার অন্যতম পছন্দের ক্ষেত্র। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ক্যামেরাবন্দি করেছেন তিনি। তাদের মধ্যে রয়েছেন অঞ্জন দত্ত, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, খুরশীদ আলম, সলিমুল্লাহ খান, সাবিনা খাতুন, অপি করিম, মোস্তফা সরয়ার ফারুকী এবং সাবিনা ইয়াসমিনসহ আরও অনেকে।

তবে নঈমের আলোকচিত্র কেবল প্রকৃতির সৌন্দর্য বা তারকাদের মুখাবয়বে সীমাবদ্ধ নয়। সমাজের প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রামও তার কাজের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের জীবন, সংগ্রাম ও কর্মদক্ষতাকে সামনে এনে তিনি অর্জন করেছেন স্বতন্ত্র পরিচিতি।

বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো গণ বিশ্ববিদ্যালয় তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিদের নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে নিয়োগ দিয়ে আলোচনায় আসে। এই উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে সমাজের সামনে তুলে ধরার লক্ষ্যে কাজ শুরু করেন নঈম। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি আয়োজন করেন একক আলোকচিত্র প্রদর্শনী ‘তৃতীয় চোখে অন্য জীবন’। প্রদর্শনীটিতে গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত ছয়জন তৃতীয় লিঙ্গের নিরাপত্তাকর্মীর জীবন, সংগ্রাম, আত্মমর্যাদা ও স্বপ্নের গল্প তুলে ধরা হয়।

গণ বিশ্ববিদ্যালয়, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র এবং জাতীয় স্মৃতিসৌধে প্রদর্শিত এই আয়োজন দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। অনেকের মতে, প্রদর্শনীটি তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের প্রতি সমাজের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে।

আলোকচিত্রের পাশাপাশি বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছেন নঈম। মহেশখালী উপজেলা প্রশাসনের প্রকাশিত ‘মহেশখালী: মোহনীয় দ্বীপ’ ব্র্যান্ডিং গ্রন্থে আলোকচিত্রী হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। এছাড়াও বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর।

ভবিষ্যৎ নিয়েও রয়েছে তার বড় পরিকল্পনা। ফটোগ্রাফির ওপর উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি সুযোগ পেলে বিদেশে গিয়ে এ বিষয়ে আরও গভীরভাবে অধ্যয়ন করতে চান। দীর্ঘমেয়াদে আলোকচিত্রকেই পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জীবন, সংস্কৃতি ও বাস্তবতাকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরাই তাঁর লক্ষ্য।

নঈমের ভাষায়, “বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জীবনসংগ্রাম, সংস্কৃতি ও বাস্তবতাকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে চাই। ছবি দিয়েই মানুষের জন্য কাজ করতে চাই।”

মহেশখালীর এক তরুণের হাতে ধরা ক্যামেরা আজ শুধু ছবি তোলে না; বরং তুলে আনে সমাজ, মানুষ ও জীবনের অদেখা গল্প। আর সেই গল্প বলার মধ্য দিয়েই এগিয়ে চলেছেন আলোকচিত্রী মুহাম্মদ নঈম উদ্দীন।