সংসদ প্রতিবেদক : নতুন অর্থবছরের (২০১৯-২০ ) ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার বাজেট জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে।
টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম বছরের প্রথম বাজেট এবং টানা ১১তম বাজেট এটি। আর অর্থমন্ত্রী হিসেবে আ হ ম মুস্তফা কামালের প্রথম বাজেট।
রোববার জাতীয় সংসদে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশন সকাল ১০টায় শুরু হয়।
এতে এক জুলাই শুরু নতুন অর্থবছরের জন্য পাঁচ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার জাতীয় বাজেট কণ্ঠভোটে পাস হয়।
এর আগে অধিবেশনের শুরুতে বাজেটের ওপর আলোচনায় বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা ৫২০টি ছাঁটাই প্রস্তাব এবং ৫৯টি দাবি উত্থাপন করেন।
গত ১৩ জুন অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল সংসদে বাজেট উপস্থাপনের পর মোট ২৫৫ জন সংসদ সদস্য ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে ৫১ ঘণ্টা ৫২ মিনিট আলোচনা করেন। সরকারি দলের সদস্যদের কণ্ঠভোটে ছাঁটাই প্রস্তাবগুলো নাকচ হয়ে যায়।
রোববার দুপুরে সংসদ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে অর্থমন্ত্রী বাজেট পাস করার জন্য উপস্থাপন করেন। পরে কণ্ঠভোটে বাজেট পাস হয়। এ সময় সরকার দলীয় সংসদ্যরা টেবিল চাপড়ে অর্থমন্ত্রীকে সমর্থন ও স্বাগত জানান।
২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম দিন ১ জুলাই সোমবার থেকে এ বাজেট কার্যকর হবে।
বাজেটে সংযুক্ত তহবিল থেকে ৬ লাখ ৪২ হাজার ৪৭৮ কোটি ২৭ লাখ ২০ হাজার টাকার নির্দিষ্টকরণ বিল পাস করা হয়। স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী অধিবেশনের শুরুতেই মঞ্জুরির দাবিতে আলোচনা করার কথা জানান। সরকার, বিরোধী দল ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা এসব দাবিতে আলোচনা করেন।
গত ১৩ জুন জাতীয় সংসদে ২০১৯-২০ অর্থবছরের ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।
এতে মোট রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। উন্নয়ন ব্যয় ২ লাখ ১১ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে মূল এডিপির পরিমাণ ২,০২,৭২১ কোটি টাকা। আর সরকারের পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩,১০,২৬২ কোটি টাকা।
বিশাল আকারের এই বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ১,৪৫,৩৮০ কোটি টাকা। নতুন এই অর্থবছরে মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ২ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ।
বাজেট পাসের আগে শনিবার (২৯ জুন) বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন ছাড়াই পাস করা হয় অর্থবিল-২০১৯। তবে অর্থবিলে সঞ্চয়পত্রে ১০ শতাংশ উৎসে করই বহাল রাখা হয়েছে। আগে ৫ শতাংশ ছিল।
বাজেটে মোট রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা, এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সূত্রে আয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এছাড়া এনবিআর বহির্ভূত সূত্র থেকে কর রাজস্ব ধরা হয়েছে ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। কর বহির্ভুত খাত থেকে রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ৩৭ হাজার ৭১০ কোটি টাকা। বাজেটে পরিচালনসহ অন্যান্য খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ২০ হাজার ৪৬৯ কোটি টাকা। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে ২ লাখ ২ হাজার ৭২১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
বাজেটে সার্বিক ঘাটতি ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা দেখানো হয়েছে, যা জিডিপির ৫ শতাংশ। এ ঘাটতি অর্থায়নে বৈদেশিক সূত্র থেকে ৬৮ হাজার ১৬ কোটি টাকা, অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ৭৭ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য ব্যাংক বহির্ভূত উৎস থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা সংস্থানের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৮.২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া মূল্যস্ফীতি ৫.৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাজেটে সামাজিক অবকাঠামো খাতে মোট ১ লাখ ৪৩ হাজার ৪২৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা মোট বরাদ্দের ২৭.৪১ শতাংশ। এর মধ্যে মানবসম্পদ খাতে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য খাতে ১ লাখ ২৯ হাজার ৫৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ বরাদ্দের মধ্যে শিক্ষা খাতে ২৪ হাজার ৪০ কোটি টাকা রয়েছে। ভৌত অবকাঠামো খাতে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। যার মধ্যে সার্বিক কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন খাতে ৬৬ হাজার ২৩৪ কোটি টাকা, বৃহত্তর যোগাযোগ খাতে ৬১ হাজার ৩৬০ কোটি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ২৮ হাজার ৫১ কোটি টাকা রয়েছে। সাধারণ সেবা খাতে ১ লাখ ২৩ হাজার ৬৪১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা মোট বরাদ্দের ২৩.৬৩ শতাংশ।
এছাড়া সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) এবং বিভিন্ন শিল্পে আর্থিক সহায়তা, ভর্তুকি, রাষ্ট্রায়ত্ত, বাণিজ্যিক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের জন্য ব্যয় বাবদ ৩৩ হাজার ২০২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা মোট বরাদ্দের ৬.৩৫ শতাংশ। সুদ পরিশোধ বাবদ ৫৭ হাজার ৭০ কোট টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা মোট বরাদ্দের ১০.৯১ শতাংশ। নিট ঋণদান ও অন্যান্য ব্যয় খাতে ১ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা মোট বরাদ্দের ০.২৪ শতাংশ।
নতুন বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা, যোগাযোগ অবকাঠামো, ভৌত অবকাঠামো, আবাস, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, কৃষি, মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। রাইজিংবিডি/ঢাকা/৩০ জুন ২০১৯/আসাদ/এনএ/শাহনেওয়াজ