অর্থনীতি

নির্বাচনি ইশতেহারে পুঁজিবাজার উন্নয়নে প্রস্তাব রাখার দাবি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে পুঁজিবাজারের উন্নয়নে বিনিয়োগবান্ধব কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট প্রস্তাব রাখার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদ।

বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্টস ফোরামের (সিএমজেএফ) অডিটরিয়ামে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এ দাবি জানান সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মো. সাজ্জাদুল হক। এ সময় সংগঠনটির সভাপতি কাজী মো. নজরুলসহ অন্যান্য নেতা উপস্থিত ছিলেন।

সাজ্জাদুল হক বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ২০১০ সালের ৬ ডিসেম্বর পুঁজিবাজারকে আইসিইউতে ঢুকিয়ে দিয়েছে, যা ওই সরকারের পতনের দিন পর্যন্ত (২০২৪ সালের ৫ আগস্ট) অব্যাহত ছিল। তারই ধারাবাহিকতায় বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেই আইসিইউতে প্রবেশ করে সংস্কারের নামে পুঁজিবাজারের বিনিযোগকারীদের অর্থনৈতিক গণহত্যার শিকারে পরিণত করেছে। এর সবচেয়ে বড় প্রতিফলন বর্তমান ভয়াবহ দুর্বিসহ বাজার পরিস্থিতি।

তিনি বলেন, ফ্যাসিস্ট সরকার ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট দায়িত্ব গ্রহণের সময় ডিএসইএক্স সূচক ছিল ৬০১৫ পয়েন্ট, যা ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর নেমে এসেছে ৪৮৫০ পয়েন্টে। অর্থাৎ বিগত ১৭ মাসে সূচকের পতন হয়েছে ১১৫০ পয়েন্টের উপরে। দৈনিক লেনদেন ১৪০০-১৫০০ কোটি টাকা থেকে ৩৫০ কোটিতে নেমেছে। এছাড়া, মার্কেট পিই৯ পয়েন্টের নিচে, যাহা বিশ্বের কোনো পুঁজিবাজারে নেই। পৃথিবীতে বাংলাদেশই একমাত্র দেশ যেখানে শেয়ারবাজার ১২ বছর আগে যেখানে ছিল, তার চেয়েও খারাপ অবস্থায় গেছে। 

সাজ্জাদুল হক আরো বলেন, দায়িত্বপ্রাপ্ত লোকগুলো যদি তাদের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করতেন, তাহলে এতটা ভয়াবহ দিন দেখতে হতো না। পুঁজিবাজারে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি না করে ১০ হাজার কোটি টাকার ফান্ড কেন, ১০ লাখ কোটি টাকা দিলেও কোনো ফল পাওয়া যাবে না। উল্টো সরকার আরো বিব্রতকর অবস্থায় পড়বে। বিগত ১৭ মাসে বিএসইসি, বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআর শেয়ারবাজারে উৎসাহমূলক কোনা একটা কাজ দেখাতে পারেনি, নিরুৎসাহিতমূলক কর্মকাণ্ড প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনোভাবে করেছে। এর জ্বলন্ত প্রমাণ হলো— আন্তর্জাতিক মার্জার রুলস অনুসরণ না করে পাঁচটি ব্যাংক মার্জার করে ব্যাংকের আমানতকারী ও শেয়ারহোল্ডার বিনিয়োগকারীদের দুর্বিষহ পরিস্থিতির মধ্যে নিক্ষেপ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিগত ১৭ মাসে একটাও গ্রহণযোগ্য আকর্ষণীয় কোম্পানিকে আইপিওতে আনার সক্ষমতা দেখাতে পারেনি। 

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পুঁজিবাজারের উন্নয়নে কিছু প্রস্তাব ও সুপারিশ ধরেছে পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদ। সেগুলো হলো— ১. আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে বিনিয়োগকারী সংগঠনের সঙ্গে গঠনমূলক আলোচনা করে বিনিয়োগকারীদের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে সময়োপযোগী যুগান্তকারী প্রস্তাবনা থাকতে হবে। দলগুলোর ইশতেহারে সুনির্দিষ্টভাবে ব্যাংকিং সেক্টরে, পুঁজিবাজারে এবং ইন্সুরেন্স সেক্টরে কী কী সংস্কার করবে, কী কী বিনিয়োগবান্ধব পদক্ষেপ রাখবে, তা পরিষ্কার করতে হবে। 

২. পুঁজিবাজারে দৈনিক শেয়ার লেনদেনের ক্ষেত্রে একই শেয়ার দিয়ে নিটিং সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করতে হবে। এই নিয়ম ২০০৭ সালে বাজারে ইতিবাচকভাবে প্রচলিত ছিল। এতে বাজারে প্রতিটি কোম্পানির শেয়ারের একটি শক্তিশালী ও টেকসই মূল্যস্তর বজায় থাকবে। এই নিয়মটি মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকার হাউজের অনৈতিক কমিশনপ্রাপ্তির লোভের কারণে পুঁজিবাজারে বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। 

৩. বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও বিএসইসির চেয়ারম্যানের পদমর্যাদা, ক্ষমতা ও প্রটোকল সমান করতে হবে। এতে দেশের পুরো আর্থিক খাত এবং পুঁজিবাজারে বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নরের অযাচিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত মুরুব্বিয়ানা দূর হয়ে সমন্বিত আর্থিক ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠবে। 

৪. পাঁচটি ব্যাংক মার্জারের ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংক যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেই পাঁচটি ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডারদের ফেসভ্যালু ১০ টাকা দিতে হবে অথবা নতুন সম্মিলিত ব্যাংকের সমপরিমাণ শেয়ার প্রত্যেক শেয়ারহোল্ডারকে দিতে হবে। বর্তমান সরকারের দুই মাস মেয়াদে ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়ন-সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রম অনতিবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। নতুন নির্বাচিত সরকার ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির পর মার্জার ও অবসায়ন-সংক্রান্ত যাবতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। আগামী দুই মাস বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান গভর্নর আহসান এইচ মনসুর কেবল তার রুটিন ওয়ার্ক করতে পারবেন।

৫. আগামী ৩ মাসের মধ্যে ‘পদ্মা বহুমুখী সেতু’ পুঁজিবাজারে সরাসরি তালিকাভুক্ত করতে সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সাথে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে সেতু বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর বিন্দুমাত্র শৈথিল্য বরদাশত করা হবে না। এছাড়া, নেসলে বাংলাদেশ, ইউনিলিভারসহ অন্যান্য মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি, মেটলাইফ, অপসোনিন, এসকেএফ, নাসির গ্লাস, পিএইচপি গ্লাস ফ্যাক্টরি, সরকারি লাভজনক স্বায়ত্তশাসিত কোম্পানি, দেশের অন্যান্য লাভজনক কোম্পানি বাজারে অবিলম্বে তালিকাভুক্ত করলে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে যাবে। পাশ্ববর্তী দেশগুলোতে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির বাইরে থাকতে পারে না।

৬. কোনো কোম্পানি ৫০ কোটি টাকা ক্যাপিটাল রেইজ করতে হলে কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংকে ঋণের জন্য আবেদন করতে পারবে না। তাকে অটোমেটিক্যালি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়ে ক্যাপিটাল রেইজ করতে হবে। এতে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় খেলাপি ঋণ উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে এবং পুঁজিবাজারে ভালো ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়ে বাজারকে টেকসই ও গতিশীল ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করবে।

৭. কোনো কোম্পানির ইপিএস, এনএভি, নিট অপারেটিং ক্যাশ ফ্লো পজিটিভ থাকার পরও ‘নো ডিভিডেন্ড’ বা ১০ পয়সা, ২৫ পয়সা লভ্যাংশ ঘোষণা করলে, ওই কোম্পানিকে ‘জেড’ গ্রুপে না পাঠিয়ে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে কোম্পানির সব পরিচালকের শেয়ার ‘ফ্রিজ' করে দিয়ে পুরো বোর্ড ভেঙে নতুন বোর্ড গঠন করতে হবে। এতে অন্যান্য কোম্পানি এ ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারি করার ধৃষ্টতা দেখানোর সাহস করবে না।

৮. বিএসইসির কাজের স্বচ্ছতা, আইপিও অনুমোদনের স্বচ্ছতা এবং বাজারে ইতিবাচক অবদান রাখার জন্য একটি শক্তিশালী অ্যাডভাইজারি কমিটি গঠন করতে হবে। এই কমিটিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দুজন, হাইকোর্ট বিভাগের দুজন আইনজীবী, অডিট ফার্ম থেকে দুজন, লিস্টেট কোম্পানি অ্যাসোসিয়েশন থেকে দুজন, বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদ থেকে দুজন ও দুটি স্টক এক্সচেঞ্জ থেকে দুজন প্রতিনিধিকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

৯. বিগত ১৭ বছরে রাষ্ট্রের আর্থিক কাঠামোর পলিসি তৈরীতে গুরুত্বপূর্ণ স্পর্শকাতর জায়গাগুলোতে উল্লেখ করার মতো যোগ্য একজনও দায়িত্বে আসেনি, যিনি দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী ভিত্তির ওপর প্রতিস্থাপন করবেন। আগামী দিনগুলোতে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ও মতামতের ভিত্তিতে একটি মেধাভিত্তিক সার্চ কমিটির মাধ্যমে (নির্বাচন কমিশনের আদলে) বিএসইসি চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের নিয়োগ দিতে হবে।

১০. বিএসইসি ‘বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিল’ থেকে ২০১০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত যেসব বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদেরকে ওই তহবিল থেকে নতুন ফান্ড বরাদ্দ করতে হবে।