অর্থনীতি

পুঁজিবাজারের কোম্পানিগুলোর কস্ট অডিটে অনাগ্রহ বিএপিএলসির 

রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়াতে আর্থিক বা ফাইন্যান্সিয়াল অডিটের পাশাপাশি কস্ট অডিট (ব্যয় নিরীক্ষা) বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন আগে গেজেট প্রকাশ করা হলেও কস্ট অডিট কার্যকর না হওয়ায় তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তবে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে কস্ট অডিট বাস্তবায়নকে অপ্রয়োজনীয় ও দ্বৈত অডিট হিসেবে আখ্যায়িত করেছে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজ (বিএপিএলসি)।

পুঁজিবাজারের স্বার্থে এ ধরনের উদ্যোগকে অপ্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে তা থেকে বিরত থাকার জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা   বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) আহ্বান জানিয়েছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর এ সংগঠনটি।কস্ট অডিটের ওপর বিএপিএলসির অনাগ্রহের বিষয়টি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে অবহিত করেছে কমিশন।

সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর এ বিষয়ে বিএসইসি থেকে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।এর আগে গত বছরের ডিসেম্বরে কস্ট অডিট বাস্তবায়নকে অপ্রয়োজনীয় ও দ্বৈত অডিট আখ্যা দিয়ে বিএসইসিকে চিঠি দেয় বিএপিএলসি।

বিএপিএলসির চিঠিতে বলা হয়েছে, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর (পিএলসি) ক্ষেত্রে কোম্পানিও অ্যাক্ট, ১৯৯৪ এর ধারা ২২০ অনুযায়ী ‘কস্ট অডিট’ সম্পাদনের বিষয়ে বিবেচনা ও প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণের জন্য মতামত উপস্থাপন করা হয়েছে।

মতামতে বলা হয়েছে, বিভিন্ন শিল্প, বাণিজ্যিক ও সেবা খাতভুক্ত সব পাবলিকাল লিস্টেড কোম্পানি (পিএলসি) কোম্পানিজ অ্যাক্ট, ১৯৯৪ অনুযায়ী নিবন্ধিত এবং বিএসইসি কর্তৃক সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯ এবং সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ আইন, ১৯৯৩ অনুযায়ী পরিচালিত হয়। বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং পুঁজিবাজারের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে বিএসইসি তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে বিভিন্ন প্রকাশনা, তথ্য সরবরাহ এবং সুশাসন কাঠামোর আওতায় পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করে।

বিএসইসির নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিটি তালিকাভুক্ত কোম্পানিকে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস দ্বারা নিরীক্ষিত বার্ষিক হিসাব উপস্থাপন করতে হয়, যা উৎপাদন ব্যয়, কাঁচামাল, শ্রম, বিদ্যুৎ, অবচয়, প্রশাসনিক বায়, বিপণন ব্যয়, আর্থিক ব্যয়সহ সব খরচকে অন্তর্ভুক্ত করে। এছাড়াও তালিকাভুক্ত কোম্পানিকে কর্পোরেট গভর্ন্যান্স কোড অনুযায়ী একজন স্বতন্ত্র পরিচালকের নেতৃত্বে অডিট কমিটি গঠন করতে হয়, যার দায়িত্ব হলো-পরিচালনা পর্ষদের নিকট কোম্পানির আর্থিক বিবরণী ও কোম্পানির অবস্থার সঠিক চিত্র তুলে ধরা।

এছাড়া বিএসইসির নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি শিল্পের নেবে কমপক্ষে এক পঞ্চমাংশ স্বতন্ত্র পরিচালক থাকা বাধ্যতামূলক, যারা সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থরক্ষায় কাজ করেন। এসব কার্যক্রম তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য গৃহীত, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং সব স্টেকহোল্ডারসহ সরকারের স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ এবং যথেষ্ট।

সেই সঙ্গে কোম্পানি আইন ১৯৯৪ এর ধারা ২২০ অনুযায়ী সরকার যখন প্রয়োজন মনে করবে, তখন কোনো কোম্পানির কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট দ্বারা নিরীক্ষা করাতে পারবে।এখানে সরকারের প্রয়োজনীয়তা কিভাবে নির্ধারণ করা হয় সে বিষয়ে প্রশ্ন তুলে বিএপিএলসি জানিয়েছে, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো বিএসইসি কর্তৃক কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় এবং তাদের আর্থিক বিবরণী আন্তর্জাতিক হিসাবমান (আইএএস) এবং ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টং কাউন্সিল (এফআরসি) অনুযায়ী প্রস্তুত করা হয়। এছাড়া, কস্ট অডিট রিপোর্টে প্রয়োজনীয় প্রায় সব তথ্যই কোম্পানির বার্ষিক আর্থিক বিবরণীতে অন্তর্ভুক্ত থাকে। তাই অতিরিক্ত কস্ট অডিট পরিচালনা করা হলে এটি দ্বৈত অডিট হিসেবে বিবেচিত হবে, যা সময়সাপেক্ষ, ব্যয়সাপেক্ষ এবং অনাবশ্যক। ফলশ্রুতিতে ভালো কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তিতে আগ্রহ হারাবে।

এছাড়া অডিট রিপোর্ট শেয়ারহোল্ডারদের নিকট উপস্থাপন করা হলেও, প্রস্তাবিত কস্ট অডিট রিপোর্ট কেবল কোম্পানির বোর্ড এবং সরকারের নিকট প্রদান করা হয়।ফলে এটি শেয়ারহোল্ডারদের প্রতি দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করে না এবং কার্যত এটা অকার্যকর ও অযৌক্তিক হিসেবে গণ্য হয়। করোনা পরবর্তী পরিস্থিতি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিতিশীলতার কারণে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো ইতিবাচক আর্থিক ক্রমোন্নতি ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। এ অবস্থায় কোম্পানিগুলোর ওপর কস্ট অডিট বাস্তবায়ন করা হলে তাদের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হবে এবং পরিণামে পুজিবাজারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে, পুঁজিবাজারের স্বার্থে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর কস্ট অডিটকে অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ বলে মনে করছে বিএপিএলসি এবং এ ধরনের পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছে।