অর্থনীতি

দুই কোম্পানির শেয়ার কারসাজি: জড়িতদের ৩.৪৮ কোটি টাকা জরিমানা

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত দুই কোম্পানি অগ্নি সিস্টেমস পিএলসি এবং ফাইন ফুডস লিমিটেডের শেয়ার কারসাজির মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানোর অভিযোগে অভিযুক্তদের ৩ কোটি ৪৮ লাখ ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।  

সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘন করে অভিযুক্ত ব্যক্তি ও কোম্পানির বিরুদ্ধে শেয়ার কারসাজির অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হওয়ায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এই জরিমানা করেছে। 

সম্প্রতি বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বাধীন নতুন কমিশন এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএসইসির একাধিক কর্মকর্তা এ তথ্য রাইজিংবিডিকে জানিয়েছেন।

সূত্র বলছে, পুঁজিবাজারে ২০২৪ সালের শেষের দিকে অগ্নি সিস্টেমস এবং ফাইন ফুডসের শেয়ার নিয়ে কারসাজির গুঞ্জন চাউর হয়। কোম্পানির ব্যবসা ও আর্থিক অবস্থার উন্নতির কারণে নয়, বরং কারসাজির মাধ্যমে শেয়ারের দাম বাড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত সাপেক্ষে কোম্পানির শেয়ার কারসাজির সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় এনেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি।

জানা গেছে, অগ্নি সিস্টেমসের শেয়ার নিয়ে কারসাজির অভিযোগে ব্যক্তিদের মধ্যে মো. সানোয়ার খানকে ১ কোটি ৫১ লাখ টাকা, মোসাম্মত আসমাউল হুসনাকে ১৫ লাখ টাকা, মো. আনোয়ার পারভেজ খানকে ২ লাখ টাকা জারিমানা করা হয়েছে। বিএসইসি’র তদন্তে জানা যায়, কারসাজিতে নেতৃত্ব দেন মো. সানোয়ার খান।

এ ছাড়া একই কোম্পানির শেয়ার কারসাজির অভিযোগে মো. আবু তাহের সিকদারকে ৬২ লাখ টাকা, উম্মে সালমা নিপাকে ২ লাখ টাকা, বিপ্লব শেখকে ৪ লাখ ৩০ হাজার টাকা জারিমানা করা হয়েছে। বিএসইসি বলছে, এ কারসাজিতে নেতৃত্ব দেন মো. আবু তাহের সিকদার। ফলে অগ্নি সিস্টেমসের শেয়ার কারসাজির অভিযোগে ছয় ব্যক্তিকে মোট ২ কোটি ৩৬ লাখ ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

এ দিকে ফাইন ফুডসের শেয়ার নিয়ে কারসাজির অভিযোগে ব্যক্তিদের মধ্যে অভিজিৎ দাসকে ৫৮ লাখ টাকা, মো. সানোয়ার খানকে ২৫ লাখ টাকা, মোসাম্মত আসমাউল হুসনাকে ৯ লাখ টাকা, মো. আনোয়ার পারভেজ খানকে ২ লাখ টাকা, ফাইন ফুডসের পরিচালক সালাউদ্দিন হয়দারকে ১ লাখ টাকা জারিমানা করা হয়েছে। 

অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এসএসএস হোল্ডিংস লিমিটেডকে ১৭ লাখ টাকা জারিমানা করা হয়েছে। ফলে ফাইন ফুডসের শেয়ার কারসাজির অভিযোগে মোট ১ কোটি ১২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

শেয়ার কারসাজির সময়

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালের জুন থেকে নভেম্বর পর্যন্ত অগ্নি সিস্টেমসের শেয়ারের দাম কারসাজি করে বাড়ানো হয়। পরে সুবিধামতো সময়ে শেয়ার বিক্রি করে মুনাফা হাতিয়ে নেয় চক্রটি। ২০২৪ সালের ২৪ জুন কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ছিল ২৪.৪০ টাকা। ৯ অক্টোবর কোম্পানির শেয়ারের দাম বেড়ে দাঁড়ায় ৪১.৩০ টাকা। চার মাসের ব্যবধানে কোম্পানির শেয়ারের দাম বেড়ে দাঁড়ায় ১৬.৯০ টাকা বা ৬৯.২৬ শতাংশ।

এ ছাড়া ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ফাইন ফুডসের শেয়ারের দাম কারসাজি করে বাড়ানো হয়। পরে সুবিধামতো সময়ে শেয়ার বিক্রি করে মুনাফা হাতিয়ে নেওয়া হয়। ২০২৪ সালের ২০ অক্টোবর কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ছিল ১৫২.৫০ টাকা। ২২ ডিসেম্বর কোম্পানির শেয়ারের দাম বেড়ে দাঁড়ায় ২২৮ টাকায়। দুই মাসের ব্যবধানে কোম্পানির শেয়ারের দাম কারসাজির মাধ্যমে বেড়ে দাঁড়ায় ৭৫.৫০ টাকা বা ৪৯.৫১ শতাংশ।

বিএসইসির সিদ্ধান্ত

২০২৪ সালের ১ জুন থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত অগ্নি সিস্টেমসের শেয়ার কারসাজি প্রমাণিত হওয়ায় সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯ এর সেকশন ১৭(ই)(২), সেকশন ১৭(ই)(৩) ও সেকশন ১৭(ই)(৫) ভঙের দায়ে উল্লিখিত অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। 

এ ছাড়াও ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ফাইন ফুডসের শেয়ার কারসাজি প্রমাণিত হওয়ায় সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯ এর সেকশন ১৭(ই)(২) ও সেকশন ১৭(ই)(৫) এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ লিস্টিং রেগুলেশনস, ২০২৫ এর রেগুলেশন ৩৪(১) ভঙের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে উল্লিখিত অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করার সিদ্ধান্ত হয়। উভয় বিষয়েই বিএসইসির সংশ্লিষ্ট বিভাগ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

শেয়ারধারণ পরিস্থিতি

আইটি খাতে তালিকাভুক্ত কোম্পানি অগ্নি সিস্টেমস পিএলসি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় ২০০৩ সালে। ‘বি’ ক্যাটাগরির এ কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন ৭২ কোটি ৫৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা। সে হিসাবে কোম্পানির শেয়ার সংখ্যা ৭ কোটি ২৫ লাখ ৫৬ হাজার ১৯২টি। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কোম্পানির উদ্যোক্তা পরিচালকদের হাতে ৩০.০৩ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ১১.৫৭ শতাংশ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ৫৮.৪০ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।

খাদ্য ও আনুষাঙ্গিক খাতে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ফাইন ফুডস লিমিটেড পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় ২০০২ সালে। ‘এ’ ক্যাটাগরির এ কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন ১৩ কোটি ৯৭ লাখ ৪০ হাজার টাকা। সে হিসাবে কোম্পানির শেয়ার সংখ্যা ১ কোটি ৩৯ লাখ ৭৩ হাজার ৯১৮টি। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত কোম্পানির উদ্যোক্তা পরিচালকদের হাতে ১৩.৯২ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ২২.২৬ শতাংশ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ৬৩.৮২ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।

আর্থিক অবস্থা

সর্বশেষ ২০২৫ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত হিসাব বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে শেয়ার হোল্ডারদের জন্য অগ্নি সিস্টেমসের পরিচালনা পর্ষদ ২.৫০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে। এদিকে চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক (জুলাই-সেপ্টেম্বর, ২০২৫) অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি মুনাফা হয়েছে ০.৩৪ টাকা। 

আগের হিসাব বছরের একই সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি মুনাফা ছিল ০.৩২ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য দাঁড়িয়েছে ১৭.২৯ টাকা।

এ দিকে সর্বশেষ ২০২৫ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত হিসাব বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে শেয়ার হোল্ডারদের জন্য ফাইন ফুডসের পরিচালনা পর্ষদ ১৪ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক (জুলাই-সেপ্টেম্বর, ২০২৫) অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি মুনাফা হয়েছে ২.৫৭ টাকা। আগের হিসাব বছরের একই সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি মুনাফা ছিল ০.৬২ টাকা। 

২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য দাঁড়িয়েছে ১৭.২২ টাকা।