অর্থনীতি

খেলাপি ঋণ কমাতে একগুচ্ছ একগুচ্ছ প্রস্তাবনা এবিবির

ব্যাংকিং খাতে বিগত দিনে নামে বেনামে খেলাপি ঋণের কারণে সংকটে পড়েছে। সংকটে উত্তোরণ করতে না পারায় পাঁচ ব্যাংক একীভূত করা হয়েছে।বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি ও সুশাসনের অভাবের কারণে খেলাপি ঋণের পরিমাণ উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। এসব খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে  একগুচ্ছ প্রস্তাবনা দিয়েছে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি)। প্রস্তাবনায় ব্যাংকগুলোকে খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের নাম, ছবিসহ তালিকা প্রকাশ করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন চেয়ে এবিবি। এছাড়া ঋণ খেলাপিরা যাতে কোনো ব্যবসায়ি সমিতির নির্বাচন না করতে পারে সেই ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, গত বছরের শেষ দিকে  বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে  এবিবির বৈঠক হয়েছিল।ওই বৈঠকের খেলাপি ঋণ কমানোর বিষয়ে সংগঠনটির পক্ষ থেকে একটি প্রস্তাবনা দেওয়ার কথা ছিল। সেই আলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে সম্প্রতি খেলাপি ঋণ কমানোর একগুচ্ছ প্রস্তাবনা দেয় এবিবি।

খেলাপি ঋণ কমানোর এবিবির প্রস্তাবনার যেসব বিষয় রয়েছে সেগুলো হলো: ১. আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের বিচারে খেলাপি ঋণগুলো আংশিক অবলোপনের সুবিধা প্রদান, ২. লিয়ন করা শেয়ার নগদায়ন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তাৎক্ষণিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা, ৩. মৃত্যু, মরণব্যাধি, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত ঋণ, গৃহ ঋণ, ক্রেডিট কার্ড কিংবা তার একক মালিকানাধীন কুটির, ক্ষুদ্র এবং ছোট প্রতিষ্ঠানের সুদ মওকুফের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঋণ আদায়ের উদ্দেশ্যে হেড অব আইসিসির মতামত গ্রহণের শর্ত লাঘব করা।

এছাড়া দেওয়া হয়েছে ১. খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের ব্যাংক অথবা আদালতের নির্দেশনা ছাড়া বিদেশ যাওয়ায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া, ২. ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণ গ্রহীতার নাম, ছবিসহ তালিকা প্রকাশের অনুমোদন প্রদান, খেলাপি ঋণ গ্রহীতাদের যেকোনো ব্যবসায়ী সমিতির নির্বাচনে অংশগ্রহণের অনুপযোগী ঘোষণা প্রদান।

প্রস্তাবনায় সম্পদ বিক্রি করে ঋণ আদায় করতে বলা হয়েছে।এ সংক্রান্ত প্রস্তাবনাগুলোর মধ্যে রয়েছে-১. ব্যাংকের নিলামে বিক্রয় বা কেনা সম্পত্তি হস্তান্তরের সব ধরনের আয়কর ও ভ্যাট প্রত্যাহার করা। ২. নিলামের সম্পদ কেনা উৎসাহিত করতে নিলাম ক্রেতার আয়কর রেয়াত কিংবা অন্যান্য প্রণোদনা প্রদান। ৩. স্থানভেদে নিলামে বিক্রিত সম্পদ কেনায় জেলা প্রশাসকের অনুমোদনের প্রয়োজনীয়তা বাতিল করা, ৪. নিলামে বিক্রিত সম্পদ হস্তান্তরে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সর্বোচ্চ সহযোগিতা নিশ্চিত করা, ৫. নিলামে বিক্রয়ের সুবিধার্থে, বন্ধকদাতা অনুপস্থিতিতে ব্যাংক কর্তৃক জমির খাজনা ও জরিপ সম্পন্ন করার সব সুবিধা নিশ্চিত করা, ৬. আদালত কর্তৃক ব্যাংকের নামে মালিকানা হস্তান্তর করা জমির (অর্থঋণ আদালত আইনের ৩৩(৭) ধারা মোতাবেক) নামজারি, বায়নানামার ভিত্তিতে বিনা খরচে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করা।

এছাড়া ১. খেলাপি ঋণগ্রহীতা এবং সংশ্লিষ্ট ঋণের জামানতদাতাদের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রক্ষিত আমানত, সঞ্চয়পত্রের তথ্য, মালিকানাধীন সম্পদের তথ্য, আয়কর রিটার্নের তথ্য, ওয়ারিশ সনদ, জন্মসনদ, মৃত্যুসনদ, পাসপোর্টের তথ্য আদালতের হস্তক্ষেপ ছাড়া চাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রাপ্তির সুবিধা নিশ্চিত করা, ২. ব্যাংকের বা আদালতের যেকোনো পদক্ষেপের বিপরীতে আদালতে গমনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিমাণ ডাউনপেমেন্ট জমা প্রদানের শর্ত আরোপ করা, ৩. সিআইবি প্রতিবেদনের বিপরীতে উচ্চ আদালতের মাধ্যমে স্টে-অর্ডার প্রাপ্তির সুবিধা আইনগতভাবে রহিত করা, ৪. উচ্চ আদালত থেকে প্রদত্ত স্টে-অর্ডার কিস্তিভিত্তিক উল্লেখযোগ্য হারে অর্থ প্রদানের শর্ত নিশ্চিত করা এবং উক্ত নির্দেশনা পরিপালনে ব্যর্থ হলে আদালতের হস্তক্ষেপ ব্যতিত উক্ত স্টে-অর্ডার বাতিল হিসেবে বিবেচনা করা। ৫. উচ্চ আদালত কর্তৃক স্টে-অর্ডার প্রদানের ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের শুনানি নিশ্চিত করা। ৬. যেসব জেলায় খেলাপি ঋণ গ্রহীতার সংখ্যা বেশি, সেসব জেলায় অবিলম্বে পৃথক অর্থ ঋণ আদালত স্থাপন। ৭. থানায় খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের আটকাদেশগুলো জরুরি ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা। ৮. আদালত থেকে থানায় সাত দিনের মধ্যে আটকাদেশ প্রেরণ নিশ্চিত করা। ৯. অর্থঋণ মামলায় ব্যক্তিগতভাবে হাজিরা ছাড়া মামলা পরিচালনার সুযোগ রহিত করা। ১০. অর্থঋণ মামলায় দেওয়ানি আটকাদেশের পরিমাণ ছয় মাসের পরিবর্তে ঋণের পরিমাণভেদে সাত বছরে উন্নীত করা। ১১. স্বল্পতম সময়ে অর্থ ঋণ আইনের প্রস্তাবিত সংশোধন প্রণয়ন করতে বলেছে এবিবি।

খেলাপি ঋণ যাতে না বাড়ে এমন কিছু প্রস্তাবনাও দিয়েছে এবিবি। সেগুলো হলো-১. জরুরি ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে ভূমি জরিপকারী ও মূল্যায়ন কারীর তালিকা প্রকাশ। ২. নিবন্ধক কিংবা তহবিল অফিসে বন্ধকী সম্পদের তালিকা সহজে যাচাই করার সুবিধা নিশ্চিত করা। ৩. সিআইবি ডেটাবেজের ন্যায় ব্যক্তিগত সম্পদের ডেটাবেজ প্রণয়ন এবং সহজে তা যাচাই করার সুবিধা প্রদান।