অর্থনীতি

শুল্ক কমলেও চড়া খেজুর, সাধারণের নাগালের বাইরে ইফতারের ফল

আজ চাঁদ উঠলে আগামীকাল থেকে রোজা শুরু। রমজান ঘিরে প্রতিবছরই খেজুরের চাহিদা বেড়ে যায়। সরকার শুল্ক কমানোর ঘোষণা দিলেও বাজারে তার তেমন প্রভাব পড়েনি বরং আগের তুলনায় আরো চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের খেজুর।

রমজানের আগে খেজুরের দাম বেড়েছে জাতভেদে কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত। আপেল, মাল্টা লেবুসহ অন্যান্য ইফতার সামগ্রীর ফলের দাম এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। পবিত্র রমজান মাসে‌র জন্য প্রয়োজনীয় ফল সংগ্রহ করতে না পেরে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে সাধারণ ক্রেতারা।

বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) ঢাকার কারওয়ান বাজার, নিউমার্কেট ও ফলের পাইকারি বাজার বাদামতলী ঘুরে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে বাজারে খেজুরের দাম কেজিপ্রতি মানভেদে ৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। তবে পাইকারি বাজার থেকে খুচরা বাজারে দাম বেশি বেড়েছে। পাইকারি বাজারে এখন যে খেজুরের দাম ২০ টাকা বেড়েছে, একই মানের খেজুর খুচরা বাজারে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

শুল্ক কমলেও বেড়েছে খেজুরসহ অন্যান্য ফলের দাম

সরকার রমজান মাসের কথা চিন্তা করে গত ২৩ ডিসেম্বরে খেজুর আমদানিতে শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করে যা আগামী ৩১ মার্চ পর্যন্ত বহাল থাকবে। এই সুযোগে ব্যবসায়ীরা পর্যাপ্ত পরিমাণে খেজুর আমদানি করেছে। কিন্তু বাজারে খুচরা পর্যায়ে দাম কমেনি, বরং আগের চেয়ে বেড়েছে।

বাজারে বেড়েছে সব ধরনের খেজুরের দাম। ছবি: রায়হান হোসেন

তবে ব্যবসায়ীরা বলছে, সরকার শুল্কছাড় দিলেও সেটা কার্যকর হতে সময় লেগেছে এবং কিছুদিন চট্টগ্রাম বন্দরে ধর্মঘটের কারণে খেজুর সময়মতো খালাস না করতে পারায় এবং নির্বাচনের ছুটিতে মানুষ গ্রামের বাড়িতে যাওয়া সময় খেজুর নিয়ে গেছে, তাতে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এখন দাম বেড়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে বলছে, দেশের বাজারে রমজানে খেজুরের চাহিদা ৬০ থেকে ৮০ হাজার টন। শুল্কছাড়ের আগে ও পরে শেষ চার মাসে ৪৭ হাজার টন খেজুর আমদানি হয়েছে। এতে বাজারে খেজুরের সংকট থাকার কথা না।

এখন বাজারে সবচেয়ে কম দামে বিক্রি হচ্ছে বাংলা খেজুর ২২০ টাকা কেজিতে। জাহিদি খেজুর ২৬০ থেকে ২৮০ টাকা এবং দাবাস ৫৫০ থেকে ৫৭০ টাকা, বরই ৪৮০ থেকে ৬০০ টাকা, কালমি ৭০০-৮০০ টাকা, সুক্কারি ৮০০-১০০০ টাকা, মাবরুম ৮৫০ থেকে ১২০০ টাকা, মরিয়ম ১১০০ থেকে ১৪০০ টাকা এবং মেডজুল ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত সপ্তাহের তুলনায় এ সপ্তাহে খুচরা বাজারে এসব খেজুরের দাম ৫০ থেকে ২০০ টাকা বেড়েছে এবং পাইকারি বাজারে বেড়েছে ২০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত।

বাজরে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে পেঁপে। ছবি: রায়হান হোসেন

বাজারে এখন জাতভেদে প্রতি কেজি আপেল বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকায়, ভালোমানের কমলা প্রতি কেজি ৩৫০ থেকে ৪৩০ টাকা, মাল্টা প্রতি কেজি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা, আঙুর জাতভেদে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা, ডালিম বড় আকারের ৬০০ টাকা, মাঝারি আকারের ৫৫০ টাকা ও ছোট ৫০০ টাকা, পাকা পেঁপে ১৮০ থেকে ২০০ টাকা, পেয়ারা ১৪০ টাকা, কুল বড়ই ২৬০ টাকা, বেল বড় আকারের ৩০০, মাঝারি আকারের ২০০ এবং ছোট আকারের ১০০ টাকা, তরমুজ ৭০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।

এখন বাজারে বড় আকারের এক ডজন লেবু বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকা, মাঝারি আকারের এক ডজন লেবু বিক্রি হচ্ছে ১৮০ টাকা এবং ছোট আকারের এক ডজন লেবু বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকায়।

আমদানি বাড়ায় কমেছে ছোলার ও ডালের দাম

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য মতে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত আমদানিকৃত ছোলা খালাস হয়েছে ২ লাখ ৩ হাজার ৬৭ টন। যা গত অর্থবছরের একই সময়ে আমদানি হয়েছিল ১ লাখ ৩২ হাজার ৬৬৯ টন। এই হিসেবে গত অর্থবছরের তুলনায় এ বছরের একই সময়ে ৭০ হাজার ৩৯৮ টন ছোলা বেশি আমদানি হয়েছে।

এ সপ্তাহে মানভেদে প্রতি কেজি ছোলা বিক্রি হচ্ছে ৯০ থেকে ১১০ টাকা, মসুর ডাল বড় দানা প্রতি কেজি ১০০ থেকে ১০৫ টাকা, মাঝারি দানা প্রতি কেজি ১১৫ থেকে ১৪০ টাকা এবং ছোট দানা (দেশি) প্রতি কেজি ১৬০ থেকে ১৭০ টাকায়। এখন বাজারে মানভেদে প্রতি কেজি খোলা চিনি বিক্রি হচ্ছে ১১০ থেকে ১১৫ টাকা এবং কোম্পানিভেদে প্যাকেটজাত চিনি ১২৫ থেকে ১৩৫ টাকায়।

রমজান মাস সামনে রেখে ভর্তুকি মূল্যে পণ্য বিক্রি করে সরাসরি প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। এখন বাজারে টিসিবি প্রতি কেজি চিনি বিক্রি করছে ৮০ টাকা, মসুর ডাল প্রতি কেজি ৭০ টাকা, সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ১১৫ টাকা এবং রমজান উপলক্ষ্যে টিসিবির প্রতি কেজি ছোলা ৬০ টাকা এবং খেজুরের দাম মানভেদে প্রতি কেজি ১৬০ টাকায়।

অস্বস্তি মাছ-মাংস-সবজিতে

এ সপ্তাহে বাজারে মানভেদে প্রতি কেজি বেগুন বিক্রি হচ্ছে ১০০ থাকে ১২০ টাকা, সিম ৬০ টাকা, মূলা ৪০ টাকা, দেশি শশা ১২০ টাকা, করলা ১০০ টাকা, গাজর (দেশি) ৪০টাকা, চিচিঙ্গা ৮০ টাকা, বরবটি ১২০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৪০ টাকা, কাঁচা পেঁপে ৪০ টাকা, টমেটো ৫০ থেকে ৬০ টাকা, শালগম ৫০ টাকা, কাঁচমরিচ ১৬০ থেকে ২০০ টাকা, ফুলকপি ও বাঁধাকপির পিস ৪০ থেকে ৫০টাকা এবং প্রতিটি পিস জালি কুমড়া ও লাউ ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

বেড়েছে অধিকাংশ সবজির দাম। ছবি: রায়হান হোসেন

গত সপ্তাহের তুলনায় এ সপ্তাহে বাজারে বেড়েছে মাছ মুরগীর দাম। বাজারে এখন মাঝারি আকারের চাষের রুই মাছ বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৪২০ টাকা কেজি দরে। যা গত সপ্তাহে ছিল ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায়। চাষের পাঙাস আকার অনুযায়ী কেজি ২০০ থেকে ২২০ টাকা, তেলাপিয়া ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, মাঝারি আকারের কৈ মাছ ৩০০ থেকে ৩২০, দেশি শিং ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা, মাঝারি সাইজের পাবদা ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা, চিংড়ি ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা, দেশি পাঁচমেশালি ছোট মাছ ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা কেজি ও ৪০০ গ্রাম ওজনের পদ্মার ইলিশ ১২০০ টাকা এবং চট্টগ্রামের ইলিশ ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

এ সপ্তাহে ব্রয়লার মুরগী বিক্রি হচ্ছে ১৯০ টাকা কেজি দরে। সোনালি জাতের মুরগির বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায়। গরুর মাংস ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকা এবং খাসির মাংস বিক্রি হচ্ছে ১২৫০ থেকে ১৩০০ টাকায়। প্রতি ডজন ফার্মের মুরগির ডিম বিক্রি হচ্ছে ১১০ থেকে ১১৫ টাকায়।

কমেছে মসলার দাম

সাধারণত রমজানে মসলার চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দাম বাড়তি থাকে। তবে এবছর ব্যতিক্রমী দেখা যাচ্ছে। আমদানি ভালো থাকায় এলাচ ছাড়া কমেছে সকল প্রকার মসলার দাম। বর্তমানে ভালো মানের প্রতিকেজি জিরা বিক্রি হচ্ছে ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকায়, যা গত বছরের একই সময় ৬৭০ থেকে ৭৫০ টাকার মধ্যে ছিল। এখন এক কেজি লবঙ্গ বিক্রি হচ্ছে ১৪০০ থেকে ১৫০০ টাকায়, প্রতি কেজি দারুচিনি বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকায়। তবে গত বছরের তুলনায় এ বছর এলাচের দাম বেড়েছে। এখন বাজারে প্রতি কেজি এলাচ বিক্রি হচ্ছে ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার ৫০০ টাকায়, যা গত বছর একই সময়ে ছিল ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকার মধ্যে।

বাজারে এখন বোতলজাত প্রতি লিটার সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ১৯০ থেকে ১৯৫ টাকায়। খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ১৭৫ থেকে ১৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতি লিটার খোলা পামওয়েল তেল বিক্রি হচ্ছে ১৫৫ থেকে ১৬২ টাকায়।

এছাড়া, মুদি বাজারে চালসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম স্থিতিশীল রয়েছে। এখন নতুন আলু বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ২৫ টাকায়। দেশি পেঁয়াজ ৫০ থেকে ৫৫ টাকা, রসুন ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা, দেশি আদা ১৭০ থেকে ১৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

যা বলছেন ক্রেতা বিক্রেতারা

ঢাকার বাদামতলীর খেজুর বিক্রেতা মো. ইব্রাহীম রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “গত সপ্তাহের তুলনায় এ সপ্তাহে খেজুরের দাম কিছুটা বাড়তি। আগামীকাল থেকে রমজান শুরু তাই এখন মানুষ ইফতারের জন্য খেজুর কিনছে বেশি। তবে বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। পাইকারি পর্যায়ে তেমন দাম বাড়েনি। খুচরা পর্যায়ে কিছু দাম বেড়েছে চাহিদা বাড়ার কারণে। তবে আশা করি, এবার রমজানে সাধারণ মানুষ স্বস্তিতে থাকতে পারবে।”

কারওয়ান বাজারে ফল কিনতে আসা গৃহিণী সাজেদা সুলতানা রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, "এখন ফলের গায়ে আগুন। সাধারণ মানুষ ইফতারের যে একটু ফল খাবে সেই অবস্থা নেই, সাথে লেবুর দামও বেড়ে গেছে। প্রতিবছর রমজান আসলে আমাদের দেশের অসাধু ব্যবসায়ীদের দাম বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু অন্যান্য মুসলিম দেশের দাম কমানো প্রতিযোগিতা হয়। আমাদের দেশের এই ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট কারা ভাঙতে পারবে সেটা বলা যায় না। কোনো সরকারই ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট ভাঙতে পারিনি। অন্তত নিম্ন আয়ের মানুষের কথা চিন্তা করে রমজান মাসে ইফতার সামগ্রী দাম কম রাখা উচিত।”