পুঁজিবাজারে মিউচ্যুয়াল ফান্ড খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে বড় ধরনের কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। দেশের অন্যতম সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান এলআর গ্লোবাল বাংলাদেশ অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডকে তার পরিচালিত ছয়টি মিউচুয়াল ফান্ডের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব থেকে অপসরণ করা হয়েছে। একইসঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধন সনদ বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু করেছে কমিশন।
এলআর গ্লোবাল বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ফান্ড ব্যবস্থাপনায় গুরুতর আর্থিক অনিয়ম, বিনিয়োগ বিধিমালা লঙ্ঘন, স্বার্থসংঘাত এবং ইউনিটহোল্ডারদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন ও আর্থিক ক্ষতির দায়ে এমন কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে।
এলআর গ্লোবাল বাংলাদেশ অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের পরিচালিত মিউচুয়াল ফান্ডগুলো হলো: ১. ডিবিএইচ ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, ২. গ্রিন ডেল্টা মিউচুয়াল ফান্ড, ৩. এআইবিএল ফার্স্ট ইসলামিক মিউচুয়াল ফান্ড, ৪. এলআর গ্লোবাল বাংলাদেশ মিউচুয়াল ফান্ড-১, ৫. এনসিসিবিএল মিউচুয়াল ফান্ড-১ এবং ৬. এমবিএল ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড।
এ সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি কোম্পানিটির প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তার (চিফ ইনভেস্টমেন্ট অফিসার) দায়িত্বে রয়েছেন রিয়াজ ইসলাম। আর কোম্পানিটির উপদেষ্টার হিসেবে রয়েছেন ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান ও ক্রীড়া সাংবাদিক রেজাউর রহমান সোহাগ।
কমিশনের মতে, সম্পদ ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার পাশাপাশি একাধিক ক্ষেত্রে সিকিউরিটিজ আইন ও মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা লঙ্ঘন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এসব কর্মকাণ্ডে ইউনিটহোল্ডারদের স্বার্থ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে মনে করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত মিউচুয়াল ফান্ড খাতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। বিএসইসির এই কঠোর পদক্ষেপ পুঁজিবাজারে সুশাসন ফেরাতে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
বিএসইসির সিদ্ধান্ত সামগ্রিক অনিয়ম ও চরম অব্যবস্থাপনার পরিপ্রেক্ষিতে বিএসইসি মনে করে, আইন ও বিধিবিধান লঙ্ঘন করে সম্পদ ব্যবস্থাপক হিসেবে এলআর গ্লোবাল বাংলাদেশ তার অর্পিত দায়িত্ব পালন ও ইউনিটহোল্ডারদের স্বার্থ সংরক্ষণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। একইসঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি তাদের দক্ষতা, সততা ও জবাদিহিতা প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে। তাই জনস্বার্থে এবং বিনিয়োগকারীদের টাকা রক্ষায় ছয়টি ফান্ডের সম্পদ ব্যবস্থাপক পদ থেকে প্রতিষ্ঠানটির নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট ফান্ডের ট্রাস্টিকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধন সনদ বাতিলের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এ বিষয়ে কমিশনের ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্ট ডিভিশন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “সম্পদ ব্যবস্থাপক হিসেবে এলআর গ্লোবাল বাংলাদেশের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা, সিকিউরিটিজ আইন ও মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা লঙ্ঘন, মানিলন্ডারিং এবং ইউনিটহোল্ডারদের স্বার্থ মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ প্রমাণতি হয়েছে। তাই বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় ছয়টি ফান্ডের সম্পদ ব্যবস্থাপক পদ থেকে এলআর গ্লোবাল বাংলাদেশের নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধন সনদ বাতিলের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।”
বিএসইসির পর্যবেক্ষণ (১) এলআর গ্লোবাল বাংলাদেশ অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড তাদের ব্যবস্থাপনাধীন ছয়টি ফান্ড থেকে পদ্মা প্রিন্টার্স অ্যান্ড কালার লিমিটেডের (বর্তমান নাম কোয়েস্ট বিডিসি পিএলসি) ৫১ শতাংশ শেয়ার ক্রয়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করে। প্রাথমিকভাবে প্রায় ২৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং পরবর্তীতে আরও ৪৫ কোটির বেশি টাকা শেয়ারমানি হিসেবে বিনিয়োগ করা হয়, যা পরে সাধারণ শেয়ারে রূপান্তরিত হয়। তবে কমিশন মনে করে, কোম্পানিটির ভূমি মূল্যায়ন সম্পন্ন হওয়ার আগেই বিনিয়োগ করা হয়।
বিনিয়োগের সময় কোম্পানির কার্যক্রম বন্ধ ছিল, আর্থিক সূচক নেতিবাচক ছিল এবং বাজারে শেয়ারের লেনদেন মূল্য ছিল মাত্র ১৩ টাকার কিছু বেশি। অথচ উল্লেখযোগ্য প্রিমিয়ামসহ শেয়ার প্রতি প্রায় ২৮৯ টাকায় তা কেনা হয়। এ ধরণের কর্মকাণ্ড সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (মিউচ্যুয়াল ফান্ড) বিধিমালা, ২০০১ এর বিধি ৫৬ এর লঙ্ঘন এবং সিকিউরিটিজ আইনের অধীনে দন্ডনীয় অপরাধ। এছাড়া, উপর্যুক্ত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ইউনিটহোল্ডারদের ব্যাপক আর্থিক ক্ষতি সাধন করা হয়েছে, যা ইউনিটহোল্ডারদের স্বার্থ পরিপন্থি।
(২) কোয়েস্ট বিডিসিকে শেয়ার প্রতি ১০ টাকা মূল্যে শেয়ার ইস্যুর সম্মতি দেয়া হলেও এলআর গ্লোবাল বাংলাদেশ তা শেয়ার প্রতি ১৫.৮৮ টাকায় উক্ত শেয়ার ক্রয় করে। এছাড়া এলআর গ্লোবাল বাংলাদেশের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান এলআরজি ভেঞ্চার লিমিটেড একই শেয়ার শেয়ার প্রতি ১০ টাকায় ক্রয় করে। বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে,এলআরজি ভেঞ্চারের লভ্যাংশ এলআর গ্লোবাল বাংলাদেশ প্রাপ্য হবেন, অর্থাৎ বর্ণিত ফান্ড ছয়টির কোন ইউনিটহোল্ডার উক্ত মুনাফা প্রাপ্য হবেন না। সুতরাং, উক্ত শেয়ার ক্রয়ে এলআর গ্লোবাল বাংলাদেশের দ্বৈতনীতি পরিলক্ষিত হয়। উল্লিখিত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এলআর গ্লোবাল বাংলাদেশ ফান্ডসমূহ পরিচালনায় যৌক্তিক, নিরপেক্ষ ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়ে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (মিউচ্যুয়াল ফান্ড) বিধিমালা, ২০০১ এর বিধি ৩৩(১) লঙ্ঘন করেছে।
(৩) পদ্মা প্রিন্টার্স অ্যান্ড কালার লিমিটেডের ৫১ শতাংশ শেয়ার ক্রয়ের সম্মতি দেয়ার ক্ষেত্রে কমিশন এলআর গ্লোবাল বাংলাদেশকে সিকিউরিটিজ আইন অনুসরণের নির্দেশনা দেয়া হলেও উক্ত সম্পদ ব্যবস্থাপক তা অনুসরণ করেনি। উল্লিখিত কর্মকান্ডের মাধ্যমে উক্ত সম্পদ ব্যবস্থাপক কোন একক ফান্ড হতে কোন একক কোম্পানির পরিশোধিত মূলধনের ১৫ শতাংশের অধিক শেয়ার ক্রয়ের মাধ্যমে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (মিউচ্যুয়াল ফান্ড) বিধিমালা, ২০০১ এর পঞ্চম তফসিল (বিনিয়োগে বাধা নিষেধ) এর শর্ত ৩ লঙ্ঘন করেছে।
(8) পদ্মা প্রিন্টার্স অ্যান্ড কালারের শেয়ার অধিক দামে ক্রয়ের মাধ্যমে উক্ত সম্পদ ব্যবস্থাপক ইউনিটহোল্ডারদের বাপক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন করেছেন ও তাদের স্বার্থ সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়েছেন এবং উহার মাধ্যমে সম্পদ ব্যবস্থাপক তার উপর অর্পিত দায়িত পালনে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। যা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (মিউচ্যুয়াল ফান্ড) বিধিমালা, ২০০১ এর বিধি ৩৩(৭) এর লঙ্ঘন।
(৫) সিকিউরিটিজ আইন ও বিধি-বিধান লঙ্ঘন করে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শরিফ আহসানকে এআইবিএল ফার্স্ট ইসলামিক মিউচুয়াল ফান্ড হতে কোয়েস্ট বিডিসির পরিচালক হিসেবে মনোনয়ন প্রদান করা হয়। ৩ লাখ টাকা মাসিক বেতনে তাকে কোয়েস্ট বিডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। উল্লেখ্য তিনি একই সময়ে সোনালী সিকিউরিটিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)/প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। উল্লিখিত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে উক্ত সম্পদ ব্যবস্থাপক সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (মিউচ্যুয়াল ফান্ড) বিধিমালা, ২০০১ এর বিধি ১৩ লঙ্ঘন করেছে।
(৬) কোয়েস্ট বিডিসির উল্লিখিত শেয়ার ক্রয়ের পরে পরিচালক মনোনয়ের মাধ্যমে উক্ত কোম্পানি পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (মিউচ্যুয়াল ফান্ড) বিধিমালা, ২০০১ এর বিধি ৩২(খ) এ উল্লিখিত সম্পদ ব্যবস্থাপকের কাজের মধ্যে পড়ে না এবং এ নিয়োগের বিষয়ে ট্রাস্টি এবং কমিশনের অনুমোদনও গ্রহণ করেনি। যা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (মিউচ্যুয়াল ফান্ড) বিধিমালা, ২০০১ এর বিধি ৩২ (খ) এর স্পষ্ট লঙ্ঘন।
(৭) কোয়েস্ট বিডিসির বিনিয়োগকৃত অর্থ থেকে ২০২২ থেকে অদ্যবধি ফান্ডগুলো কোন মুনাফা পায়নি। এ ছাড়া উক্ত কোম্পানি ওটিসি মার্কেটের হওয়ায় উক্ত শেয়ার বিক্রয় করার সুযোগ সীমিত, যার ফলে ইউনিটহোল্ডারদের ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে।
যে সব ফান্ড থেকে বিনিয়োগ হয়েছে, সেসব ফান্ড হচ্ছে ক্লোজড-এন্ড ফান্ড অর্থাৎ যেগুলোর মেয়াদ নির্দিষ্ট বা সীমিত। এরকম নির্দিষ্ট বা সীমিত মেয়াদের ফান্ড থেকে সহজে বিক্রয় করা সম্ভব নয়, এ ধরনের কোম্পানির শেয়ার ক্রয় করায় মেয়াদান্তে এসব শেয়ার বিক্রির সুযোগ সীমিত থাকবে। ফলে এ ধরনের ওটিসি কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ সম্পদ ব্যবস্থাপকের বিনিয়োগ দায়িত্বে অবহেলার পর্যায়ে পড়ে।
উপর্যুক্ত নিয়মবহির্ভূত কর্মকাণ্ড সম্পদ ব্যবস্থাপক হিসেবে এলআর গ্লোবাল বাংলাদেশের যোগ্যতা, দক্ষতাকে ও জবাদিহিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এ অবস্থায় ইউনিট হোল্ডারদের স্বার্থ সুরক্ষায় এসব ফান্ড সম্পদের ব্যবস্থাপক পরিবর্তন আবশ্যক।
এ বিষয়ে কোয়েস্ট বিডিসির পরিচালক ও এলআর গ্লোবাল বাংলাদেশের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা রিয়াজ ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
এরে আগে ২০২৫ সালের ২১ অক্টোবর অনিয়ম, দুর্নীতি ও আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে কোয়েস্ট বিডিসির পরিচালক ও এলআর গ্লোবাল বাংলাদেশের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা রিয়াজ ইসলাম ও বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামকে পুঁজিবাজার-সংক্রান্ত কার্যক্রম থেকে আজীবন নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।
একইসঙ্গে এলআর গ্লোবাল বাংলাদেশের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা রিয়াজ ইসলামসহ তার সহযোগী পরিচালনা পর্ষদের ৫ সদস্য ও ট্রাস্টিকে মোট ১০৯ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়। পাশাপাশি মানিলন্ডারিং সংঘটিত হওয়ায় দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ প্রেরণ এবং নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয় বিএসইসি।