অর্থনীতি

পুঁজিবাজার উন্নয়নে সিএসইর একগুচ্ছ প্রস্তাব

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটকে কেন্দ্র করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে কর সংক্রান্ত একগুচ্ছ প্রস্তাবনা দিয়েছে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই)।

দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে নবনির্বাচিত সরকার আর্থিক খাতের সংস্কার এবং পুঁজিবাজারের উন্নয়নকে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করে এসব প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

বুধবার (১ এপ্রিল) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে প্রাক-বাজেট আলোচনা সভায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিসার) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খানের কাছে এসব প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়েছে। সিএসই থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

সিএসই মনে করে, প্রস্তাবনাসমূহ বাস্তবায়ন করা হলে দেশের পুঁজিবাজার আরো গতিশীল, গভীর এবং বিনিয়োগবান্ধব হয়ে উঠবে।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে নবনির্বাচিত সরকার আর্থিক খাতের সংস্কার এবং পুঁজিবাজারের উন্নয়নকে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করেছে। সরকারের নীতিগত অগ্রাধিকারের মধ্যে একটি শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও আধুনিক পুঁজিবাজার গড়ে তোলা অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যাতে দেশের শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য একটি কার্যকর অর্থায়ন প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়।

বর্তমানে বাংলাদেশের আর্থিক খাত এখনো অনেকাংশে ব্যাংকনির্ভর হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ক্ষেত্রে পুঁজিবাজারের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এ বাস্তবতায় অর্থবাজার ও পুঁজিবাজারের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও সমন্বিত আর্থিক কাঠামো গড়ে তোলা সময়ের দাবি। সরকারের ঘোষিত সংস্কার কর্মসূচি, বাজার উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পুঁজিবাজারকে আরো গভীর, গতিশীল ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করে গড়ে তোলা প্রয়োজন।

এই প্রেক্ষাপটে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ থেকে আসন্ন জাতীয় বাজেট ২০২৬-২০২৭ এ পুঁজিবাজারের উন্নয়ন, বাজারের গভীরতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগকারীদের আস্থা শক্তিশালীকরণ এবং বিকল্প অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে কিছু নীতিগত সংস্কার ও কর-সংক্রান্ত প্রণোদনা বিবেচনার জন্য বিনীতভাবে সুপারিশ করছি।

প্রস্তাব- ১. চট্টগ্রামে কমোডিটি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠা: বাংলাদেশের প্রথম কমোডিটি এক্সচেঞ্জ স্থাপনের জন্য সিএসই টেকনলজিক্যাল এবং রেগুলেটরি কাঠামো ইতিমধ্যে সমাপ্ত করেছে, যা উদ্বোধনের অপেক্ষায় রয়েছে। একটি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বমানের এক্সচেঞ্জ স্থাপনের জন্য প্রচুর বিনিয়োগের প্রয়োজন যা চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ তার সীমিত আয়ের মাধ্যমে সংস্থান করেছে। উপরোক্ত বিবেচনায় চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জর কমোডিটি সেগমেন্টকে আগামী ৫ বছরের জন্য কর অবকাশ প্রদান করা হলে একটি যুগপোযোগী মার্কেট গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

২. ডেরিভেটিভও কমোডিটি কন্ট্রাক্ট লেনদেন চালুকরণ ও উৎসাহিতকরণ: বিদ্যমান আয়কর আইন ২০২৩ এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা নেই। তাই পুঁজিবাজারে কমডিটি ডেরাইভেটিভসসহ অন্যান্য ডেরাইভেটিভস পণ্য চালুকরণ, সহজীকরণ ও উৎসাহিত করার লক্ষ্যে বিদ্যামান কর আইনে সুনির্দিষ্ট ধারার সংযোজন করা যেতে পারে।

৩. লভ্যাংশের উপর উৎসে কর কর্তন: লভ্যাংশ করের উপর দ্বৈত করের বিধান প্রত্যাহার করে লভ্যাংশ আয়কে করমুক্ত ঘোষণা করা। এতে পুনরায় লভ্যাংশ বিতরনের সময় কর কর্তন দ্বৈত করের সৃষ্টি করে। এরূপ উৎসে কর পরিহার করা হলে অধিকতর লভ্যাংশ বন্টনের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এছাড়া এক স্তর কর কাঠামোর ফলে কর আদায় প্রক্রিয়া সহজতর হবে।

৪. কর্পোরেট করহারের পুনর্বিন্যাস: তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির প্রদেয় কর হারের ব্যবধান কোনোরূপ শর্ত ছাড়া ১০ শতাংশ করা যেতে পারে। তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যকার করহারের পার্থক্য বৃদ্ধি পেলে মৌলভিত্তি সম্পন্ন কোম্পানি তালিকাভুক্ত হতে উৎসাহিত হবে যা পুঁজিবাজারকে সমৃদ্ধ করবে এবং স্বচ্ছ কর্পোরেট রিপোর্টিংয়ের মাধ্যমে রাজস্ব আয় বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে।

৫. পরামর্শ বা কন্সালটেন্সি সেবা, কারিগরি বা টেকনিক্যাল সেবা ও সফ্টওয়্যার মেইনটেনেন্সের ওপর উৎসে কর কর্তন এবং মূল্য সংযোজন কর প্রদান: স্টক এক্সচেঞ্জের বৈদেশিক সফটওয়ারের বাৎসরিক মেইনটেন্যান্স চার্জের ওপর উৎসে কর কর্তনের জন্য পৃথক ধারার সংযোজন করা যেতে পারে। উৎসে উচ্চ কর কর্তনের ফলে পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি পায়, যা একটি প্রযুক্তি নির্ভর পুঁজিবাজারের উন্নয়নে প্রতিবন্ধকস্বরূপ।

৬. স্টক এক্সচেঞ্জে ব্যবহৃত শক্তিশালী সফটওয়্যার ক্রয়কালে আমদানি কর, শুল্ক ও ভ্যাট পরিশোধ: স্টক এক্সচেঞ্জে ব্যবহৃত শক্তিশালী সফটওয়্যার ক্রয়ের ওপর সুনির্দিষ্ট কর কাঠামো নির্ধারণ করে শুল্কায়ন করা যেতে পারে।

৭. উৎসে করের ক্ষেত্রে দ্বৈত কর পরিহার চুক্তির যথাযত সুবিধা প্রদান: বিভিন্ন বৈদেশিক চুক্তির জন্য চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জকে সেবা বা পণ্য মূল্য পরিশোধ করতে হয় যেখানে অর্থ প্রেরণকারী কর্তৃপক্ষ উৎসে করের বিধান প্রতিপালন করেন। এক্ষেত্রে রাজস্ব বোর্ডকে উৎসে কর কর্তন না করার জন্য সার্টিফিকেট ইস্যু করতে হয়। কিন্তু আইনের বিধানের যথাযত প্রয়োগ না থাকায় প্রযোজ্য হারের চেয়ে অতিরিক্ত হারে কর কর্তন করা হয়।

উপরোক্ত প্রস্তাবনাসমূহ বাস্তবায়ন করা হলে দেশের পুঁজিবাজার আরো গতিশীল, গভীর এবং বিনিয়োগবান্ধব হয়ে উঠবে বলে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। এর ফলে একদিকে যেমন নতুন কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে উৎসাহিত হবে, অন্যদিকে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাবে। একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার গড়ে উঠলে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বিকল্প উৎস তৈরি হবে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।