দীর্ঘদিনের চরম আর্থিক সংকট ও আস্থাহীনতার গণ্ডি পেরিয়ে পুনরুজ্জীবনের পথে হাঁটছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড (পিএলএফএসএল)। আদালতের সরাসরি তত্ত্বাবধান এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর নজরদারিতে প্রতিষ্ঠানটি এখন অনেকটাই সুসংগঠিত। তবে পুরোপুরি সচল হতে সরকারের পক্ষ থেকে বড় অংকের আর্থিক জোগান বা স্টিমুলাস প্যাকেজ প্রয়োজন বলে মনে করছে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ।
সম্প্রতি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান পরিচালনা কর্মকর্তার (সিআরও) কাছে পাঠানো এক ব্যাখ্যাপত্রে কোম্পানির বর্তমান অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরেছেন পিপলস লিজিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. সাগির হোসেন খান।
আমানতকারীদের অর্থ ফেরত ও ঋণ আদায় প্রসঙ্গে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, বিগত ৫ বছর ছিল পিপলস লিজিংয়ের জন্য অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। চিঠিতে জানানো হয়েছে, ২০২১ সালের ১২ জুলাই হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশনার পর থেকে পর্ষদ পুনর্গঠনের মাধ্যমে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ চলছে। এই সময়ে খেলাপি ঋণ থেকে প্রায় ২০০ কোটি টাকা আদায় করতে সক্ষম হয়েছে নতুন ব্যবস্থাপনা। সংগৃহীত অর্থ থেকে ইতোমধ্যে পর্যায়ক্রমে আমানতকারীদের ১০০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। বর্তমানে আমানত ফেরতের তৃতীয় ধাপের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
জালিয়াতির দায় ও আর্থিক সহায়তার আবেদন প্রসঙ্গে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটি স্বীকার করেছে যে, আগের ব্যবস্থাপনার অনিয়ম, দুর্বল করপোরেট সুশাসন এবং লাগামহীন খেলাপি ঋণই তাদের ডুবিয়েছিল। ফরেনসিক অডিটে সাবেক পরিচালকদের দুর্নীতির প্রমাণও মিলেছে। এই ধ্বংসস্তূপ থেকে কোম্পানিকে টেনে তুলতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে ৭৫০ কোটি টাকার আর্থিক সহায়তা চেয়েছে পিপলস লিজিং।
চিঠিতে ব্যয় সংকোচন ও নতুন করে ঋণ বিতরণের বিষয়ে বলা হয়, আর্থিক শৃঙ্খলা ফেরাতে পিপলস লিজিং এখন বেশ কঠোর। ব্যয় সংকোচনের পাশাপাশি ঋণ পুনঃতফসিল এবং আইনি প্রক্রিয়ায় বড় খেলাপিদের পেছনে লেগেছে কর্তৃপক্ষ। এরই মধ্যে আদালতের অনুমতি নিয়ে সীমিত পরিসরে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড শুরু করেছে তারা। সম্পূর্ণ জামানতভিত্তিক প্রায় ২৫ কোটি টাকার নতুন ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। আগামীতে এসএমই এবং সুরক্ষিত ঋণের মাধ্যমে আয় বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
নতুন কিছু কৌশল প্রসঙ্গে বলা হয়, পিপলস লিজিং এখন তাদের দায়ের ওপর ভিত্তি করে নতুন কিছু কৌশল বিবেচনা করছে। এর মধ্যে রয়েছে—পাওনা বা দায়কে শেয়ারে (ইকুইটি) রূপান্তর করা, সাবেক উদ্যোক্তাদের শেয়ারের বৈধতা যাচাই এবং স্টেকহোল্ডারদের সাথে সমঝোতার মাধ্যমে দায় পুনর্গঠন। ২০১৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত জমে থাকা সব বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) আদালতের অনুমতিক্রমে সম্পন্ন করা হয়েছে, যা স্বচ্ছতার পথে বড় একটি ধাপ।
কোম্পানি কর্তৃপক্ষ আরো জানিয়েছে, যদি সরকারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় আর্থিক ও নিয়ন্ত্রক সহায়তা পাওয়া যায়, তবে তারা আমানতকারীদের পাওনা পরিশোধ অব্যাহত রাখতে পারবে। ঋণ আদায় জোরদার এবং পূর্ণাঙ্গ ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালুর মাধ্যমে আর্থিক খাতে হারানো ইমেজ পুনরুদ্ধারে তারা বদ্ধপরিকর। আদালত ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মেনেই এই পুনরুজ্জীবন প্রক্রিয়া সফল করতে চায় পিপলস লিজিং।
এ বিষয়ে জান চাইলে পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. সাগির হোসেন খান রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ পিপলস লিজিংয়ের পুনর্গঠন ও পুনরুজ্জীবনের কার্যক্রম সংক্রান্ত বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়েছে। আমার তাদেরকে যথা সময়ে ব্যাখা দিয়েছি। আমারা হাইকোর্ট ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধান এবং নতুন ব্যবস্থাপনার উদ্যোগে প্রতিষ্ঠানটিকে পুনরুজ্জীবন দিতে উল্লেখযোগ্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছি। বিশেষ করে গত প্রায় পাঁচ বছরে খেলাপি ঋণ থেকে প্রায় ২০০ কোটি টাকা আদায় করা হয়েছে। একই সময়ে আমরা আমানতকারীদের প্রায় ১০০ কোটি টাকা পরিশোধ করেছি। এটা আমাদের সবচেয়ে মাইলফলক কাজ।”