অর্থনীতি

টেকসই অর্থায়নের বাজার ১.১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়ার পূর্বাভাস

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালে টেকসই অর্থায়নের বাজার ৯১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে এবং ২০২৬ সালে ১.১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। বাংলাদেশের বাজারেও এর ইতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে দেশে টেকসই অর্থায়নের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৩.৭৫ বিলিয়ন টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩৫.৮৭ শতাংশ। এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক গতিশীলতাকেই বিশেষভাবে ইঙ্গিত দেয়।

তবে এই গতিশীলতাকে জোরদার করতে মিশ্র ও টেকসই অর্থায়ন জরুরি। এতে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলা ও জনকল্যাণমূলক কাজ সম্প্রসারিত হবে।

বৃহস্পতিবার (১৪ মে) রাজধানী ঢাকার একটি হোটেলে ‘সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স সামিট ২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

বাংলাদেশস্থ সুইজারল্যান্ড দূতাবাস, ইউএন ক্যাপিট্যাল ডেভলপমেন্ট ফান্ড ইউএনসিডিএফ, নেদারল্যান্ডসভিত্তিক ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রতিষ্ঠান ট্রুভালু বাংলাদেশ ও স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেড এর সহযোগিতায় ম্যানেজমেন্ট কনসালটিং প্রতিষ্ঠান লাইটক্যাসল পার্টনার্স এই সামিটের আয়োজন করে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মিশ্র অর্থায়ন (ব্লেন্ডেড ফাইন্যান্স) সংগ্রহ ও টেকসই অর্থায়নের (সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স) বাজার সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ঢাকায় দিনব্যাপী এই ‘সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স সামিট ২০২৬’ অনুষ্ঠিত হয়।

এই দিন সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বাংলাদেশস্থ সুইজারল্যান্ড দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত রেতো রেংলি। অনুষ্ঠানে গেস্ট অব অনার হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীনে এটুআই প্রকল্পের প্রধান প্রযুক্তি উপদেষ্টা মাসুদ রহমান।

তিনটি প্যানেলে সামিটে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। প্যানেল-১ পর্বে অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন  লাইটক্যাসল পার্টনার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহেদুল আমিন। এতে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশস্থ সুইজারল্যান্ড দূতাবাসের ডেপুটি হেড অব মিশন দিপক এলমার, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থাপন পরিচালক নুজহাত আনোয়ার, স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেড এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুরুল হাই, ব্রামার অ্যান্ড পাটনার্সের ঊর্ধ্বতন পরিচালক কেরি ব্রিন, সাউথ এশিয়া টেক এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজাত চৌধুরী, ইনফিউশন পার্টনার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাবিলা নওরীন ও অন্যান্য কর্মকর্তারা।

এই প্যানেলে উন্মুক্ত ফোরাম সঞ্চালনা করেন লাইটক্যাসল পার্টনাসের সিনিয়র বিজনেস কনসালট্যান্ট আমীরা ফাইরুজ।

গেস্ট অব অনার হিসেবে বক্তব্যে মাসুদ রহমান বলেন, “বাংলাদেশ এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে উদ্ভাবন, প্রযুক্তির পাশাপাশি টেকসই অর্থায়নকে একসাথে এগিয়ে যেতে হবে। এই প্রেক্ষাপটে ডিজিটাল অবকাঠামো শক্তিশালী করার মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের সহায়তা প্রদানের বিষয়টিকে সরকার বেশ গুরুত্ব দিচ্ছে।”

উদ্বোধনী বক্তব্যে সুইজারল্যান্ড দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত রেতো রেংলি বাংলাদেশ ও সুইজারল্যান্ডের পারস্পরিক সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “টেকসই অর্থায়ন এখন আর কোনো ছোট এজেন্ডা নয়। বরং অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলার জন্য এটি (টেকসই অর্থায়ন) অপরিহার্য।”

তিনি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলা ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এগিয়ে নিতে বাংলাদেশের কার্যক্রমের প্রশংসা করেন। পাশাপাশি বিনিয়োগের সুযোগ ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে এই সামিট বিশেষ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে বলে অভিমত ব্যক্ত করেন।

সামিটে ‘প্রতিশ্রুতি থেকে প্রকল্পে: টেকসই অর্থায়নে পরবর্তী ট্রিলিয়ন অবমুক্তকরণ’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন লাইটক্যাসেল পার্টনার্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) বিজন ইসলাম।

মূল প্রবন্ধে তিনি বলেন, “বাংলাদেশে টেকসই অর্থায়নের পরবর্তী ধাপ নির্ভর করবে বিনিয়োগের একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর, যা বেসরকারি পুঁজিকে আকর্ষণ করতে সক্ষম হবে।এজন্য প্রয়োজন বিনিয়োগ-উপযোগী শক্তিশালী পাইপলাইন, কাঠামোগত উন্নয়ন এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব।”

সামিটে তিনটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম প্যানেলে আলোচনার শিরোনাম ছিল: ‘পরীক্ষামূলক উদ্যোগ থেকে বিনিয়োগ তহবিল: বাংলাদেশে ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টিং ও মিশ্র অর্থায়ন (ব্লেন্ডেড ফাইন্যান্স)  কে মূলধারায় আনা।’  দ্বিতীয় প্যানেলের শিরোনাম ছিল: ‘ভবিষ্যৎ অর্থায়ন: বাংলাদেশের ইএসজি  ক্যাপিটাল স্ট্যাক নির্মাণ।’

সমাপনী অধিবেশনে তৃতীয় প্যানেল আলোচনার শিরোনাম ছিল: ‘বাংলাদেশে কর্পোরেট সোশ্যাল রিসপনসিবিলিট’র (সিএসআর) ভবিষ্যৎ: দায়বদ্ধতা  থেকে কৌশলগত হাতিয়ার।’

এছাড়া বাংলাদেশের ‘সাসটেইনেবিলিটি এবং কর্পোরেট সিএসআর প্রেক্ষাপট’ শীর্ষক আর একটি প্রবন্ধ উপস্থাপিত হয়। এতে সিএসআর কীভাবে প্রথাগত কার্যক্রম থেকে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির একটি কৌশলগত হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে তা তুলে ধরা হয়।

সম্মেলনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল-নতুন দুটি বিনিয়োগ তহবিলের ঘোষণা। লাইটক্যাসেল পার্টনার্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) বিজন ইসলাম এবং ট্রুভ্যালু বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শারাওয়াত ইসলাম যৌথভাবে ‘ওআরই-২ ফান্ড’ ও ‘বাংলাদেশ ইমপ্যাক্ট ফান্ড’-এর উন্মোচন করেন।

দেশের সম্ভাবনাময় ক্ষুদ্র ও ক্রমবর্ধমান ব্যবসাগুলোর জন্য সহজলভ্য মূলধন নিশ্চিত করাই এ তহবিলের প্রধান লক্ষ্য। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এই উদ্যোগ উদ্যোক্তাদের টেকসই প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সম্মেলনে নীতি-নির্ধারক, অর্থায়নকারী, উদ্যোক্তা এবং ইকোসিস্টেম সংশ্লিষ্ট ২০০ জনেরও অধিক প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন।