আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হিসাববিদদের ‘স্বপ্রণোদিত নিয়ন্ত্রণ’ বা সেলফ-রেগুলেশনের আহ্বান জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, দেশে সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং পুঁজিবাজার ও আর্থিক খাতের প্রতি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে শতভাগ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
বুধবার (২০ মে) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে এফএআর সামিটে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি) এবং ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমবি) যৌথভাবে এই সামিট আয়োজন করে। এবারের সামিটের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘ট্রান্সঅর্থি ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং: হোয়াট রিয়েলি ম্যাটার্স’।
অনুষ্ঠানে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস ও কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টসদের পেশাগত সততা বজায় রেখে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের সঠিক ও প্রকৃত আর্থিক চিত্র বা ফেয়ার পিকচার তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দেন অর্থমন্ত্রী।
তিনি বলেন, বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি অস্থির সময় পার করেছে। আমাদের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা, তদারকি ব্যবস্থা ওয়াচডগ বডিগুলো অলমোস্ট অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। যার কারণে আর্থিক খাতে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। মিথ্যা রিপোর্টিং বা ফলস রিপ্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে দুর্বল কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে। ফলে ভালো ও মৌলিক কোম্পানিগুলো বাজারে আসার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে।
আর্থিক খাতের বর্তমান সংকট উত্তরণে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমরা এখন একটি ক্রসরোডে দাঁড়িয়ে আছি। বর্তমান সরকার এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায় যেখানে পূর্ণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকবে। এফআরসি, আইসিএবি এবং আইসিএমএবি-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে কাজ করছে, তার ওপরই আমাদের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। কোনো রেগুলেটরি বডির পক্ষেই প্রতিদিন ডে-টু-ডে গিয়ে ভুলত্রুটি ধরা সম্ভব নয়। তাই হিসাববিদদের নিজেদের এবং সংশ্লিষ্ট বডিগুলোকে সবার আগে সেলফ-রেগুলেট বা স্বপ্রণোদিত নিয়ন্ত্রণের ভূমিকা নিতে হবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে নিজের অতীত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে আমির খসরু বলেন, বেসরকারি খাতের ওপর বিশ্বাস রেখে অতীতে বিজিএমইএ-কে যেভাবে ইউডি সার্টিফিকেট প্রদানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ও তারা সফল হয়েছিল। ঠিক তেমনি আইসিএবি ও আইসিএমএবি-কে কেবল বার্ষিক সাধারণ সভা বা ডিনারের আয়োজক হিসেবে সীমাবদ্ধ না থেকে, তাদের মেম্বাররা কীভাবে পারফর্ম করছে এবং সঠিক অডিট করছে কি না, তা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
অর্থমন্ত্রী আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতি তৈরি হওয়া নতুন সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে বলেন, সারা বিশ্বের বড় বড় ফান্ড ম্যানেজার এবং বিনিয়োগকারীরা এখন বাংলাদেশের প্রতি ব্যাপক আগ্রহ দেখাচ্ছে। জেপি মরগ্যানসহ বিশ্বখ্যাত ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে আসতে চায়। আমরা হংকং ও লন্ডনে বাংলাদেশ ডেডিকেটেড ফান্ড ফ্লোট করার পরিকল্পনা করছি, পাশাপাশি ডোমেস্টিক বন্ড চালু করতে যাচ্ছি। কিন্তু এই বিশাল বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রথম শর্তই হলো নির্ভরযোগ্য অডিট রিপোর্ট। বিনিয়োগকারীরা যদি অডিট রিপোর্টের ওপর আস্থা না পায়, তাহলে কোনো সংস্কারই কাজে আসবে না।
তিনি স্বল্পমেয়াদি সুবিধার চিন্তা বাদ দিয়ে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে একটি বৈশ্বিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে আর্থিক ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার জন্য পুঁজিবাজার, এনবিআর এবং আর্থিক খাতের চলমান সংস্কার কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট সব স্টেকহোল্ডারদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
অর্থ সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। অতিথিদের মধ্যে আরো উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য ও বিটিএমএর সহসভাপতি মো. আবুল কালাম, বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, আইসিএবির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মো. রোকনুজ্জামান, আইসিএমএবির সভাপতি মো. কাওসার আলম প্রমুখ। মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন এফআরসি চেয়ারম্যান ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূইয়া।