‘অসম্ভবকে সম্ভব করাই অনন্তের কাজ’—পর্দায় অনন্ত জলিলের এমন সংলাপ এখনো মানুষ মনে রেখেছে। পর্দার সংলাপের মতো ঢাকাই সিনেমার অনেক অসম্ভবকেই সম্ভব করেছেন এই চিত্রনায়ক, প্রযোজক।
বিশ্ব যখন প্রযুক্তির ছোঁয়ায় ডিজিটাল সিনেমা নির্মাণ শুরু করে, তখনও দেশে অ্যানালগ পদ্ধতিতে সিনেমা নির্মিত হতো। বিষয়টি অনুধাবন করেন অনন্ত জলিল। তিনিই প্রথম ডিজিটাল সিনেমা নির্মাণ করে দেশের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিকে তাক লাগিয়ে দেন।
এই চিত্রনায়কের ক্যারিয়ারে মাত্র ছয়টি সিনেমা। সব ক’টি সিনেমাতেই বাজিমাত করেছেন অনন্ত। সর্বশেষ তাকে ২০১৫ সালে পর্দায় দেখা গিয়েছিল। এখন তার ‘দিন- দ্য ডে’ প্রেক্ষাগৃহে চলছে। তার শুরুটা হয় ২০০৮ সালে ‘খোঁজ দ্য সার্চ’ সিনেমার মধ্য দিয়ে। এই সিনেমা নির্মাণের পেছনেও রয়েছে গল্প।
সিনেমা নির্মাণের প্রস্তুতি ছিল না উল্লেখ করে অনন্ত জলিল রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘আমি আসলে সিনেমা করার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। আমাদের কোম্পানি যাত্রা শুরু করে ১৯৯৬ সালে। এ সময় থেকে ২০০০ পর্যন্ত আমি ছিলাম ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটিতে। সেখান থেকে আমি বিবিএ করি। তখন ভাইয়া ছোট একটা ফ্যাক্টরি করলো, নাম দিলো এজেআই। তখন এক বায়ারের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল। তাদের অনেক বড় কোম্পানি। তার মাধ্যমে এক আঙ্কেলের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। তিনি আমাকে বললেন, বাংলাদেশের মুভি এক্সপোর্ট করে এমন কাউকে আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দাও। আমি খুঁজে কাউকে পেলাম না। তারপর আমি সিডিতে কয়েকটি সিনেমা পাঠালাম। সিডি দেখে তিনি বললেন, স্ক্রিনে বৃষ্টিরে মতো ঝিরঝির, আর সাউন্ড খুবই খারাপ! তখন প্রথম আমার মাথায় আসে নিউ টেকনোলজিতে বাংলাদেশে সিনেমা তৈরি করা যায় কিনা।’
এখান থেকেই অনন্ত জলিলের সিনেমা ভাবনার সূচনা। এরপর বর্ষার সঙ্গে পরিচয়। ‘বর্ষার সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর আমার মাথায় আসে ভালো মুভি করলে এক্সপোর্ট করা যাবে। এরপরই আমরা ‘খোঁজ দ্য সার্চ’ তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেই। এর আগে আমি দেখতে চেয়েছিলাম ওয়ার্ল্ডে কীভাবে সিনেমা বানানো হয়। তখন আমরা হলিউডে গেলাম, ইউনিভার্সাল স্টুডিও, ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটেও গিয়েছি। সেই অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশে প্রথম ডিজিটাল সিনেমা বানালাম ‘খোঁজ দ্য সার্চ’। বলেন অনন্ত জলিল।
কিন্তু এখানেই শেষ নয়। বরং এ হলো সূচনা। এই চিত্রনায়ক পরিচালক প্রযোজক বলেন, ‘পরে সাউন্ড ডেভেলপ করি। এই যে এখনও বন্দুকের মধ্যে তার লাগিয়ে একজন প্যানেল থেকে সুইচ অন করে, তখন বন্দুকের মাথা দিয়ে ধোঁয়া বের হয়। কিন্তু আমাদের সিনেমায় এমন দৃশ্যে ধোঁয়া নয়, স্পার্ক হতো। আমার মনে আছে, যখন ‘খোঁজ দ্য সার্চ’ সেন্সরে যায়, তখন সেন্সর বোর্ড থেকে একজন জানতে চেয়েছিলেন, গুলি করলে তো ধোঁয়া বের হবে, আপনার মুভিতে স্পার্ক হচ্ছে কেন? আমি তাকে উল্টো প্রশ্ন করেছিলাম, বন্দুক দিয়ে গুলি করলে ধোঁয়া তো বের হওয়ার কথা নয়।’
ঢালিউডে প্রথম বিশ্বমানের সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার করেন অনন্ত জলিল। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে যারা সিনেমা বানিয়েছেন তাদের দোষ নেই। তারা সেরাটা দিয়ে ভালো সিনেমা বানিয়েছেন। কিন্তু টেকনোলজি আসেনি। সর্বশেষ আমাদের ২০১৫ সালে ‘মোস্ট ওয়েলকাম-টু’ মুক্তি পায়। ওটায় ডলবি ৫.১ মিক্সিং ছিল। টু-কে রেজুলেশন মুভি ছিল। তখন মিডিয়া এতো স্ট্রং ছিল না, আমরা কাউকে সেভাবে বলিনি। এবার তো ফোর-কে রেজুলেশন মুভি আর ডলবি এটমোস নিয়ে এসেছি।’
ঈদুল আজহায় মুক্তি পাওয়া ‘দিন দ্যা ডে’ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অনন্ত জলিল বলেন, ‘দিন দ্য ডে’র নতুনত্ব শুধু বাংলাদেশে নয়। বিশ্বের বিগবাজেটের সিনেমায় যে টেকনোলজি ব্যবহার করা হয়েছে এখানেও তাই। টম ক্রুজের সিনেমায় যেমন সাউন্ড পাওয়া যায় এখানেও তেমন ফিল পাওয়া যাবে। সিনেপ্লেক্সে গেলে ফোর-কে রেজুলেশন আর ডলবি এটমোস পাচ্ছেন। তবে গ্রামের হলে গেলে সেটা পাবেন না। এ জন্য তো আমি দায়ী নই।’
ইরানের সঙ্গে যৌথ প্রযোজনার সিনেমা ‘দিন দ্য ডে’। ব্যক্তি উদ্যোগে শতকোটি টাকা বাজেটের সিনেমা বাংলাদেশে এটিই প্রথম। বাংলাদেশ, তুরস্ক, আফগানিস্তান, ইরান এই চার দেশ মিলিয়ে ‘দিন দ্য ডে’ সিনেমায় উঠে আসবে রোমহর্ষক সব প্রেক্ষাপট। সিনেমাতে অনন্ত ছাড়াও আছেন তার স্ত্রী ও চিত্রনায়িকা বর্ষা। এটি পরিচালনা করেছেন ইরানি নির্মাতা মুর্তজা অতাশ জমজম ও অনন্ত জলিল।