বিনোদন

‘মহানগর ৩’ আদৌ হবে কি না জানি না: আশফাক নিপুণ

আমার মনে হয় না, আমি খুব সাহসী কিছু করেছি। কারণ আমি যে গল্পই বলতে চাই না কেন, তার সুযোগ আমাদের সংবিধানেই করে দেওয়া আছে। আমি কেবল, আমার মতো করে একটা সময়ের গল্প বলতে চেয়েছি। 

ঈদুল ফিতরে মুক্তি পেয়েছে ওয়েব সিরিজ ‘মহানগর ২’। আশফাক নিপুণ পরিচালিত সিরিজটি ওটিটি প্ল্যাটফর্ম হইচইয়ে মুক্তির পর দারুণ সাড়া ফেলেছে। প্রশংসায় ভাসছেন নির্মাতা-অভিনয়শিল্পীরা। এ সিরিজ নির্মাণসহ নানা বিষয়ে রাইজিংবিডির সিনিয়র সহ-সম্পাদক আমিনুল ইসলাম শান্তর সঙ্গে কথা বলেছেন আশফাক নিপুণ।

রাইজিংবিডি: ‘মহানগর টু’-এর সাফল্য নিশ্চয়ই উপভোগ করছেন।

আশফাক নিপুণ: অনেক উপভোগ করছি। ‘মহানগর’ করার পর দর্শকদের প্রশ্ন ছিল ‘মহানগর ২’ কবে আসবে? কোথাও গেলে, সোশ্যাল মিডিয়ায় বা ব্যক্তিগতভাবে আমাকে এ প্রশ্ন অনেকেই করেছেন। এটা বিশাল চাপ! আমার মনে হয় না, কোনো বিশেষ একটি কনটেন্টের জন্য মানুষ এতটা অপেক্ষা করেছেন। এতে আমার মধ্যে এক ধরনের চাপ তৈরি হয়েছিল। কারণ প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হলে দর্শক বিষয়টি কীভাবে নেবেন! ফলে আমরা অসম্ভম পরিশ্রম করেছি। তাড়াহুড়ো করিনি। এখন প্রথমে যে অনুভূতি হচ্ছে সেটা হলো স্বস্তির। প্রশান্তি কাজ করছে যে, দর্শক হতাশ হননি। অনেক দর্শক বলেছেন— ‘মহানগর ২’ প্রথমটির চেয়েও ভালো হয়েছে। সুতরাং এটা আরো বেশি আনন্দের। 

দর্শক কীভাবে নেবেন শুরুতে আমরা এ নিয়ে খুব চিন্তিত ছিলাম। ফাইনালি দর্শক ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করার পর স্বস্তি পাচ্ছি। যত দিন গড়াচ্ছে আনন্দের মাত্রা তত বাড়ছে। কারণ আমি আমার পুরো টিম সৎ থেকে কাজটি করার চেষ্টা করেছি। আমি, অভিনয়শিল্পী বা টিমের অন্য যারা আছেন তাদের কেউ ফাঁকি দেননি। আমরা শর্টকাটে কিছু করার চেষ্টা করিনি। এজন্য আনন্দের মাত্রা আরো বাড়ছে।

‘মহানগর ২’ এর একটি দৃশ্য

রাইজিংবিডি: নির্মাতা হিসেবে ‘মহানগর ২’-এর সাফল্যের কারণ কী বলে মনে করেন?

আশফাক নিপুণ: সাফল্যের কারণ নির্মাতারা জানেন না। যদি জানতেন তবে প্রত্যেক নির্মাতা সফল কাজটি করতেন। বিশেষ কোনো কারণ নেই। তবে আমার মনে হয়, দর্শক গল্পটি পছন্দ করেছেন। আমরা যে গল্পটি বলার চেষ্টা করেছি, সেই গল্পটি দর্শকের পছন্দ হয়েছে। দিন শেষে দর্শক একটি গল্প দেখতে চান, ওটিটি প্ল্যাটফর্মের ক্ষেত্রে এটি আরো কঠিন। কারণ এখানে ফ্রিতে দেখা যায় না। পয়সা খরচ করে মানুষকে দেখতে হয়। ঈদের সময়ে আমরা ৪০ মিনিটের নাটক দেখে অভ্যস্ত, ওটিটির এই কনটেন্ট সেটাও না। এটি ২০০ মিনিটের কনটেন্ট। আর সেই কনটেন্ট দর্শক এক বসায় দেখছেন, তারা সময়টা এখানে ব্যয় করছেন। এই সময়টা খুবই মূল্যবান। সুতরাং দর্শক যখন বুঝতে পারেন তার সময়টা নষ্ট হয়নি, সে যা চাচ্ছিলেন তার চেয়েও অনেক বেশি পেয়েছেন। আর তখন গিয়ে এটি সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছায়। আর এটা সম্ভব তখনই যখন আপনি আপনার গল্প, কনটেন্টের প্রতি সৎ থাকবেন। সততা কোথাও না কোথাও গিয়ে রিফ্লেক্ট করে। আর সেটা দর্শকরাই শুধু টের পান। নির্মাতা বা অভিনয়শিল্পীরাও এটা বুঝতে পারেন না। 

রাইজিংবিডি: এই সিরিজের প্রত্যেক অভিনয়শিল্পী প্রশংসা কুড়াচ্ছেন। তাদের কাছ থেকে এই পারফরম্যান্স বের করে আনাটা নিশ্চয়ই কঠিন ছিল? 

আশফাক নিপুণ: চরিত্রের প্রয়োজনে যাদের নিয়ে কাজ করি, তারা অসম্ভব গুণী শিল্পী। প্রথমে এ বিষয়টি আমি নিশ্চিত করি। কারণ আমি যা বলতে চাই বা দেখাতে চাই সেটা আসলে আমার অভিনেতা-অভিনেত্রীরা ফুটিয়ে তুলবেন। আমি বিশ্বাস করি, আমাদের দেশে বিশ্বমানের অভিনয়শিল্পী রয়েছেন। মোশাররফ ভাই, চঞ্চল ভাই, নিশো, অপি করিম, তিশা, মেহজাবীন— এদের সবাইকে আমি বিশ্বমানের অভিনয়শিল্পী মনে করি। কারণ এরা গ্লোবালি প্রতিযোগিতা করতে পারবেন। এখানে দুটি বিষয় কাজ করে। এক. তারা গুণী অভিনয়শিল্পী।  দ্বিতীয়ত তারা পুরোপুরি আমার কাছে আত্মসমর্পণ করেন। আমি শুটিংয়ের আগে স্ক্রিপ্ট দিই না, সেটে বসে স্ক্রিপ্ট লিখি। এ পরিস্থিতিতে কোনোরকম দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়াই পরিচালকের কাছে আত্মসমর্পণ করা ব্যাতীত কোনো অপশন নেই। আমিও তাদের কাছে এটা চাই। অভিনয়শিল্পীরা যদি আমার কাছে সারেন্ডার করেন, আমি এতটুকু নিশ্চয়তা দিতে পারি, আমি আপনাদের একটা জায়গায় নিয়ে যাব। কোনো একটি জায়গায় চরিত্রটি ল্যান্ড করবে, আর দর্শক সেটা স্মরণীয় করে রাখবেন।  

রাইজিংবিডি: তার মানে মোশাররফ করিম, ওপার বাংলার অনির্বাণ ভট্টাচার্যর মতো অভিনেতাকে নিয়ে শুটিং করতে গিয়ে কোনো চাপ অনুভব করেননি?

আশফাক নিপুণ: না, কোনো ধরনের চাপ পাইনি। কারণ মোশাররফ ভাই থেকে শুরু করে তরুণ দিব্য পর্যন্ত সবাই আমার কাছে প্রশ্নাতীতভাবে সারেন্ডার করেছিলেন। তাদের ভাষ্য— তুমি যা বানাতে চাও বানাও, আমরা তোমার সঙ্গে আছি। তারা কোথাও কোনোরকম প্রশ্নও করেননি। যার ফলে রসায়নটা তৈরি হয়েছে। যে কোনো কনটেন্টে পরিচালকের ভূমিকা কোচের মতো। কোচ প্ল্যান করেন কোন খেলোয়াড়কে দিয়ে কোথায় খেলাবেন। কোচ ঠিক করেন বদলি খেলোয়াড় হিসেবে কাকে মাঠে নামাবেন। খেলা চলতে চলতে এটা ঠিক করেন কোচ। আর খেলোয়াড়রা কোচের এই সিদ্ধান্ত প্রশ্নাতীতভাবে মেনে নেন। কারণ পুরো প্ল্যানটা কোচের মাথায় আছে। যদি খেলোয়াড়রা প্রশ্ন করতে শুরু করেন তবেই ঝামেলাটা বাঁধে। আমার বেলায়ও ব্যাপারটা একই। তারা ধরেই নেন, শুটিং সেট একটি মাঠ আর এই মাঠে আমরা পারফর্ম করব। আর পেছনে একজন কোচ রয়েছেন, উনি পুরো সিনেমার গল্পটা জানেন। মোশাররফ ভাই, বাবু ভাই, অনির্বাণ অনেক বড় তারকা। এটা করলে ভালো হবে, এটা করা যাবে না— এ ধরনের ভাবনা তারা সেটে আসার সময় বাসায় ফেলে এসেছেন। যে কারণে তাদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে কোনোরকম চাপ অনুভব করিনি।

‘মহানগর ২’ এর ৩টি খণ্ডচিত্র

রাইজিংবিডি: আপনি যে গল্প নিয়ে ‘মহানগর’ বানিয়েছেন, এমন গল্প নিয়ে কাজ করাকে দর্শক সহসী পদক্ষেপ বলছেন- বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখেন?

আশফাক নিপুণ: শিল্পী হিসেবে আমার দায়বদ্ধতা শিল্পের প্রতি, আমার দায়বদ্ধতা দেশের মানুষের প্রতি, সময়ের প্রতি। সুতরাং আমি আমার গল্পে বাংলাদেশের সময়টাকে ধরতে চেয়েছি। এই সময় ধরতে গিয়ে আমি একটি গল্প তৈরি করেছি। যার মধ্যে অনেকগুলো উপাদান রয়েছে, যার সঙ্গে হয়তো দর্শক কানেক্ট করতে পেরেছেন। কিন্তু পুরোটাই আমার কল্পনাপ্রসূত। এটা তো ডকুমেন্টারি না, দিন শেষে এটা একটা গল্প। দর্শক গল্প দেখতে বসে ডকুমেন্টারি দেখতে পছন্দ করেন না। আমি চিন্তা করে চরিত্র, গল্প তৈরি করেছি। এখন দর্শকেরও তো এক ধরনের কল্পনাশক্তি রয়েছে। নির্মাতার কল্পনাশক্তিকে যখন দর্শকের কল্পনাশক্তি ছুতে পারে বা অতিক্রম করে যায়, তখন এই কল্পনাকে সত্যের চেয়েও সত্য মনে হয়। যার ফলে দর্শক আমাকে সাহসী বলছেন। তারা মন্তব্য করছেন, ‘আশফাক নিপুণ অনেক বড় কাজ করেছেন বা আশফাক নিপুণের কলিজা কত বড়’। এটা দর্শকদের ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। দর্শকের এই ভালোবাসাকে সম্মান করি। কিন্তু আমার মনে হয় না, আমি খুব সাহসী কিছু করেছি। কারণ আমি যে গল্পই বলতে চাই না কেন, তার সুযোগ আমাদের সংবিধানেই করে দেওয়া আছে। প্রত্যেক নাগরিকের চিন্তা বা মত প্রকাশের স্বাধীনতার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। বিষয়টি আমাদের সংবিধানেই রয়েছে। এখানে বাড়তি সাহসের কিছু নেই। আমি কেবল আমার মতো করে একটা সময়ের গল্প বলতে চেয়েছি। 

রাইজিংবিডি: ‘মহানগর’-এ যারা ছিলেন, তাদের অনেকে দ্বিতীয় পার্টে নেই। ‘মহানগর ৩’-তে কি এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে?

আশফাক নিপুণ: তৃতীয় পার্টে কি গল্প হবে তা আমি এখনো জানি না। তৃতীয় পার্ট আদৌ হবে কিনা তাও জানি না। যখন ‘মহানগর’ বানাই তখন ‘মহানগর ২’ নির্মাণের কোনো পরিকল্পনা মাথায় ছিল না। সিরিজের পরের পার্ট আসবে কি আসবে না তা নির্ভর করে দর্শক চাহিদার উপরে। দর্শক যদি পরের সিজন দেখতে চান তবেই নির্মাতা-প্রযোজকরা পরিকল্পনা সাজান। দর্শক এখন তৃতীয় পার্ট দেখার আগ্রহ প্রকাশ করছেন। দর্শকের আগ্রহ এতটাই যে, পারলে আগামীকালই তৃতীয় পার্ট মুক্তি দিতে বলছেন। কিন্তু তৃতীয় পার্টের গল্প কী হতে পারে, কারা অভিনয় করবেন, পুরোনো চরিত্র কোনটা থাকবে— এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত তখন নেব যখন ‘মহানগর ৩’ নিয়ে বসব। গল্পের প্রয়োজনে চরিত্র থাকবে, এমনো হতে পারে পুরোনো সবাই থাকবেন কিংবা নতুন চরিত্র যুক্ত হবে।