ঢাকাই চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যারা শুধু অভিনেতা নন—একটা সময়, একটা আবেগ, একটা প্রজন্মের স্বপ্ন। চিত্রনায়ক মান্না তেমনই এক নাম। যিনি ছিলেন দর্শকের চোখের জল, বুকের ভেতরের ক্ষোভ, প্রতিবাদের ভাষা আর ভালোবাসার নায়ক।
২০০৮ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি—বাংলা চলচ্চিত্রের আকাশে নেমে আসে আঁধারের ছায়া। লাখো ভক্তকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে না ফেরার দেশে চলে যান ঢালিউড কিং মান্না। সেদিন অনেকেই বিশ্বাস করতে পারেননি, এত দ্রুত থেমে যাবে পর্দার সেই বজ্রকণ্ঠ, সেই দাপুটে উপস্থিতি। তারপর সময় অনেক গড়িয়েছে, কিন্তু তার চলে যাওয়ার শূন্যতা আজও তীব্র।
মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) জনপ্রিয় এই চিত্রনায়কের ১৮তম মৃত্যুবার্ষিকী। দিনটি ঘিরে সোশ্যাল মিডিয়ায় তার অগণিত ভক্ত, সহকর্মী এবং শুভানুধ্যায়ী স্মরণ করছেন প্রিয় নায়ককে। কেউ শেয়ার করছেন পুরোনো সিনেমার দৃশ্য, কেউ লিখছেন আবেগঘন স্ট্যাটাস, কেউ আবার তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া চাইছেন। একইসঙ্গে পরিবারের পক্ষ থেকেও আয়োজন করা হয়েছে দোয়া মাহফিলের।
চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে ‘মান্না’ নামেই পরিচিত তিনি। তবে তার পুরো নাম এস এম আসলাম তালুকদার। ১৯৬৪ সালে টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে জন্মগ্রহণ করেন এই প্রতিবাদী নায়ক। গ্রামের সহজ-সরল পরিবেশ থেকে উঠে এসে তিনি হয়ে উঠেছিলেন কোটি মানুষের স্বপ্নের প্রতিনিধি।
১৯৮৪ সালে ‘নতুন মুখের সন্ধানে’ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে পা রাখেন মান্না। এরপর ধীরে ধীরে নিজের অভিনয় দক্ষতা, ব্যক্তিত্ব এবং পরিশ্রম দিয়ে জায়গা করে নেন চলচ্চিত্রাঙ্গনের শীর্ষে। সময়টা ছিল প্রতিযোগিতাময়, কিন্তু মান্না ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি শুধু নায়ক হতে চাননি, তিনি চেয়েছিলেন নায়ক হয়ে দর্শকের কথা বলতে।
নব্বই দশকে যখন অশ্লীল চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু হয় এবং সিনেমার গুণগত মান নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে, তখন যে কয়েকজন শিল্পী প্রথম থেকেই প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করেছিলেন, মান্না ছিলেন তাদের অন্যতম। শুধু প্রতিবাদ নয়—তিনি অশ্লীলতার বিরুদ্ধে রীতিমতো যুদ্ধ করেছেন। শিল্পের মর্যাদা ফিরিয়ে আনার লড়াইয়ে তিনি ছিলেন এক অনড় সৈনিক। অনেকেই তখন নীরব ছিলেন, কিন্তু মান্না ছিলেন উচ্চকণ্ঠ। আর সেই কারণেই তিনি শুধু জনপ্রিয় নায়ক নন, হয়ে উঠেছিলেন একজন আদর্শ শিল্পীও।
‘দাঙ্গা’, ‘লুটতরাজ’, ‘তেজী’, ‘আম্মাজান’, ‘আব্বাজান’সহ অসংখ্য চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি অর্জন করেন আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা। তার অভিনীত ‘আম্মাজান’ সিনেমাটি বাংলাদেশের সর্বাধিক ব্যবসাসফল চলচ্চিত্রগুলোর অন্যতম। এই সিনেমায় তার অভিনয় শুধু দর্শককে মুগ্ধ করেনি, অনেকের চোখে এনে দিয়েছিল অশ্রু। কারণ মান্না অভিনয় করতেন শুধু পর্দায় নয়—তিনি অভিনয় করতেন দর্শকের হৃদয়ের ভেতর।
জীবদ্দশায় মান্না অভিনয় করেছেন দুই শতাধিক চলচ্চিত্রে। মান্নার জনপ্রিয়তা শুধু প্রেক্ষাগৃহে নয়, ছিল মানুষের মনে। সেই ভালোবাসার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি নানা সম্মান। ২০০৬ সালে তিনি সেরা অভিনেতা হিসেবে লাভ করেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। পাশাপাশি তার অর্জনের ঝুলিতে যুক্ত হয়েছে মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারসহ অনেক সম্মাননা। তবে তার সবচেয়ে বড় পুরস্কার ছিল দর্শকের ভালোবাসা। সেই ভালোবাসা আজও অটুট।
১৮ বছর পেরিয়ে গেলেও তার অনুপস্থিতি দর্শক হৃদয়ে আজও কষ্টের দাগ কেটে যায়। তার মৃত্যুবার্ষিকীতে ভক্তরা শুধু স্মরণ করছে না—একটা শূন্যতাকেও অনুভব করছে। কারণ ঢাকাই চলচ্চিত্রে অনেক নায়ক এসেছে, অনেকেই গেছে, কিন্তু মান্নার মতো করে হৃদয়ের আসনে বসতে পারেনি কেউই।