কয়েক দিন আগে মারা গেছেন ভারতীয় বাংলা সিনেমার জনপ্রিয় অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজ চক্রবর্তী পরিচালিত ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’ সিনেমা ২০০৮ সালে মুক্তি পায়। এতে রাহুলের বিপরীতে অভিনয় করেন প্রিয়াঙ্কা সরকার। সিনেমাটি করতে গিয়েই বাস্তব জীবনে প্রেমের সম্পর্কে জড়ান তারা।
রাহুল-প্রিয়াঙ্কা যখন প্রেমের সম্পর্কে জড়ান তখন তাদের বয়স খুবই কম। অল্প বয়সে প্রেমে পড়ে তারাও কাঁটার আঘাত সয়েছেন; ভালোবাসার জন্য সংগ্রাম করেছেন। সবকিছু উপেক্ষা করে সাহসী সিদ্ধান্ত নেন তারা। জীবনের আকাশ থেকে কালো মেঘ সরে যায়, পরিণয় লাভ করে তাদের প্রেম। সময়ের সঙ্গে সুখে ভরে উঠে এ দম্পতির সংসার।
‘চিরদিনই তুমি যে আমার’ সিনেমার দৃশ্যে রাহুল-প্রিয়াঙ্কা
জীবন থেকে কালো মেঘ চিরতরে কখনো দূর হয় না, কারণ জীবনের ভাঁজে ভাঁজে থাকে বিচিত্র সব মোড়। ফলস্বরূপ দাম্পত্য জীবনে ভাঙনের সুর বেজে ওঠে, বেদনায় নীল হন প্রিয়াঙ্কা-রাহুল। কণ্টকাকীর্ণ এই পথ পাড়ি দিয়ে এক হয় তাদের দুটো হৃদয়। কিন্তু প্রকৃতি তাদের চিরতরে আলাদা করে দিয়েছে। চলুন প্রিয়াঙ্কার মুখ থেকে জেনে নিই, তাদের প্রেম, সংগ্রাম ও বিচ্ছেদের গল্প—
রাহুলের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ানোর প্রথম দিকের ঘটনা স্মরণ করে প্রিয়াঙ্কা সরকার বলেন, “মানুষ প্রেমে পড়লে প্রায়োরোটির ব্যাপারটি বদলাতে থাকে। রাহুলের সঙ্গে আমার সম্পর্কের ব্যাপারটি বাবা-মা জানতে পেরে যান। এটা জানার পর বাবা আমাকে কড়াভাবে বকেছিলেন। কেবল আমাকে নয়, রাহুলকেও ডেকে এনে বকাবকি করেছিলেন। এতে আমারও খুব খারাপ লেগেছিল।”
প্রিয়াঙ্কা সরকার
শুধু বকাবকিই নয়, প্রিয়াঙ্কার অভিনয়ই বন্ধ করে দিয়েছিলেন তার বাবা। স্মৃতির পাতা উল্টে প্রিয়াঙ্কা সরকার বলেন, “এ ঘটনার পর বাবা আমাকে বলেছিল, ‘এবার কাজ (অভিনয়) করা বন্ধ করে দাও। সিনেমার কাজ শেষ হয়েছে, তোমাদের শখ ছিল তা পূর্ণ হয়েছে। এবার কাজ বন্ধ করে পড়াশোনায় মন দাও।’ কিন্তু আমি সেটা কোনোভাবেই পারতাম না। কারণ ইতোমধ্যে আমার কাজের নেশা হয়ে গেছে। এরপর আমি একদিন শুটিংয়ে যাই, বাবা জানতে পারেন আমরা দুজনেই শুটে আছি। ফেরার সময়ে বাবার ফোন আসে। বাবা আরো কড়া ভাষায় আমাদের বকা দেন। তখন আমি বুঝতে পারি, আজ যদি আমি বাড়ি যাই, তাহলে বাবা আমার কাজটা সত্যি বন্ধ করে দেবেন এবং আর হয়তো বাড়ি থেকে বের হতে দেবেন না।”
এ ঘটনার পর প্রিয়াঙ্কা আর বাড়ি ফিরেননি। তা জানিয়ে এই অভিনেত্রী বলেন, “তারপর আমি রাহুলকে বললাম, ‘আমি বাড়ি যাব না।’ রাহুলও বলল, ‘বাড়ি যেতে হবে না।’ তারপর বাড়ির সঙ্গে অনেক দিন আমার যোগাযোগ ছিল না। আমি এক জায়গায় একা ১ বছরের মতো থাকি। তখন বাবা-মা আমার বিরুদ্ধে স্টেপ নিতে পারতেন, কিন্তু নেননি। এখন বুঝতে পারি, উনারা আমার ভালোটাই চেয়েছিলেন।”
প্রিয়াঙ্কা-রাহুল
পরবর্তীতে ভাড়া বাসা থেকে রাহুলের বাড়িতে চলে যান প্রিয়াঙ্কা। তা জানিয়ে এ অভিনেত্রী বলেন, “এরপর আমি রাহুলের বাবা-মায়ের কাছে শিফট করি। সেখানে এক বছর লিভ-ইন করি। তারপর আমরা বিয়ে করি। এর মাঝে বাবা-মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। মায়ের সঙ্গে কথা হতো, আমার বোন অনেক ছোট ছিল, ফলে ওর সঙ্গে আমার নিয়মিত যোগাযোগ হতো। তবে আমি আমার বাড়িতে দুই বছর যাইনি।”
রাহুল-প্রিয়াঙ্কার বিয়েতে প্রিয়াঙ্কার বাবা-মা উপস্থিত ছিলেন না। কিন্তু এ অভিনেত্রীর মামা, দাদু-দিদা এসেছিলেন। রাহুলের সঙ্গে সম্পর্ক ও কাজের কারণে প্রিয়াঙ্কার বাবা-মায়ের সঙ্গে তার যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, তা মিটে এই দম্পতির সন্তান সহজের জন্মের পর। প্রিয়াঙ্কা বলেন—“প্রেমের কারণে রাহুল বাবার বকাঝকা খেয়েছিল, এতে ওরও ব্যক্তিত্বে আঘাত লেগেছিল। কিন্তু রাহুল বাবা হওয়ার পর বিষয়টি অনুধাবন করতে পারে, আমার বাবা-মায়ের কনসার্ন কোথায় ছিল। পরে সহজকে নিয়েই আমি আর রাহুল বাবার বাড়িতে যাই। পরে বাবাও আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন।”
পুত্র সহজের সঙ্গে রাহুল-প্রিয়াঙ্কা
রাহুল-প্রিয়াঙ্কার সংসার জীবন বেশ ভালোই কাটছিল। পুত্র সহজের জন্মের পর তাদের সংসারে ফাটল ধরতে শুরু করে। সর্বশেষ ২০১৭ সালে আলাদা থাকার সিদ্ধান্ত নেন তারা। তারপর পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করে বহুবার খবরের শিরোনাম হয়েছেন। সঞ্চালক জানতে চান, সহজকে নিয়ে আলাদা থাকার কারণ কী ছিল?
জবাবে প্রিয়াঙ্কা সরকার বলেন, “আমি-রাহুল কেন আলাদা থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, সে বিষয়ে যাচ্ছি না। আমরা সহজের জন্য আলাদা হই। কারণ একটা পর্যায়ে বুঝতে পারলাম যে, আমরা যদি ২৪ ঘণ্টা একসঙ্গে থাকি, বাইরে থেকে বাড়ি ফিরে পরস্পরের মুখ দেখতে হবে, তাহলে আমাদের মাঝে নেতিবাচকতা চলে আসবে। ফলে আমরা ঝগড়াটা করবই। বাবা-মায়েদের অশান্তি দেখেছি; যেটা সব পরিবারেই কিছু না কিছু থাকেই। আমি আর রাহুল যদি একসঙ্গে থাকি, তাহলে কিছু জিনিস সহজের সামনে চলেই আসবে। আমরা না চাইলেও হয়তো বাজে কিছু এক্সপ্রেস করে ফেলব। আমরা চাইনি এটা আমাদের বাচ্চা দেখুক। এরচেয়ে বরং এটা দেখুক যে, আমরা আলাদা আছি, ভালো আছি, শান্তিতে রয়েছি।”
প্রিয়াঙ্কা সরকার
‘চিরদিন তুমি যে আমার’ সিনেমার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে পা রাখেন প্রিয়াঙ্কা। এতে রাহুলের সঙ্গে জুটিবদ্ধ হয়ে অভিনয় করেন তিনি। এ সিনেমাটি ব্যবসায়ীকভাবে সফল হয়েছিল। এ ছাড়া ‘শোন মন বলি তোমায়’, ‘বউ বউ খেলা’, ‘রান’, ‘ভালোবাসা জিন্দাবাদ’, ‘লাভ সার্কাস’, ‘গেম’ প্রভৃতি সিনেমায় রাহুলের সঙ্গে জুটিবদ্ধ হয়ে অভিনয় করেছেন প্রিয়াঙ্কা।