এই ঈদের তৃতীয় এবং শেষ সিনেমা—‘বনলতা এক্সপ্রেস’। কোনো একটি বিশেষ কারণে বইটি, এই সিনেমার গল্প, পাত্রপাত্রী, শুটিংয়ের তথ্য আমার আগেই জানা। তাই ভেবেছিলাম ভালো যদিও লাগে, আমাকে এই সিনেমা খুব বেশি অবাক করতে পারবে না। পরিবার নিয়ে দলেবলে টিকিট কেটে দেখতে গিয়েছিলাম, আর ভাবছিলাম কার কেমন লাগবে। বিশেষ করে আম্মা আর কন্যার। আমি আসলে কারোর কোনো খবর নিতে পারি নাই। শুধু সিনেমার শুরুতে, বিরতিতে আর সিনেমার শেষে ছাড়া—সবাই ঠিক আছো? ওই পর্যন্তই!
একই পরিচালকের হলেও ‘উৎসব’ আর ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ আলাদা। উৎসবের সাথে নব্বই দশক, কোথাও না কোথাও দর্শকের ব্যক্তিগত আবেগ জড়িত ছিল, আর বনলতা এক্সপ্রেস সবার জন্য একটা সফর, যাত্রীদের সাথে দর্শকদের। এর মধ্যেই দেশে-বিদেশে দর্শকদের মনে জায়গা করে নিয়েছে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’। প্রধান কারণ হিসেবে আমি মনে করি, সিনেমাটির সহজ উপস্থাপনা। কোনো প্রচলিত মার মার কাট কাট রেসিপি নেই, যা একটা সিনেমাকে জনপ্রিয় করে তুলতে পারে। পুরোটাই আসলে দর্শকের সামনে রাখা মূল্যাতীত আবেগের ডালি।
কেউ শৈশব পেয়েছে যেখানে বাবা বা মা বকা দিতো, ভর্তি পরীক্ষা, জানি মনে মনে পছন্দ করে কিন্তু বলতে না পারা, পেয়েছে প্রিয় লেখককে, তার চরিত্রগুলোকে, তাদের মুখের সংলাপগুলো, পেয়েছে আইয়ুব বাচ্চুকে, সানির গান, রবীন্দ্রসংগীত, অর্থহীন, পেয়েছে প্রিয় অভিনয়শিল্পীদের। আর তানিমের সাথে একটা কাজ করেই বুঝেছি, ছেলেটা মনে মুখে কাজে এক, ভণিতা নেই, সহজ—যা ওর সিনেমাতেও প্রতিফলিত হয়। এই পুরো টিমটার প্রতি আমার অন্যরকম একটা ভালোবাসা কাজ করে, তাই একটু বেশি বেশি বলে ফেলার সম্ভাব্য ঝুঁকি আছে।
তবে একজন অভিনেতা হিসেবে তখন খুব ভালো লাগে, যখন দেখি সবাই কি দারুণ অভিনয় করে যাচ্ছে। কাকে রেখে কার কথা বলব। সিনেমা শেষে সিঁড়িতে নামতে নামতে কেউ বলছে, মোশাররফ করিম ভাই রে ভাই কি করল! ওরে চঞ্চল আর মোশাররফ পুরাই যুদ্ধ, শ্যামল মাওলা জোশ, এ কে আজাদ সেতু একদম ট্রেনের লোক, মা (শামিমা নাজনীন) হুমায়ূন আহমেদের গল্পের নিখুঁত মা, নুহাশের গলা না? পকেটমারটা (জাহাঙ্গীর) সেইরাম দোস্ত, এই পিচ্চি তো বড়দের সাথে সমানতালে...ইস! কেন যে এক্সিট চলে আসলো....। আরো শুনতাম—মম, বাঁধন, জিলানী, লাবণ্য, দিনার ভাই, সাবিলা, রাজ…শুনতাম আর আমি আনন্দে ভাসতাম।
সিনেমা হলে ঢোকার সময় ভিড় দেখে যেমন আনন্দ পাই, এমনই চাই আমরা! তাই টিকিট না পাওয়ারও একটা আনন্দ আছে, সেই আনন্দ দ্বিগুণ হয়, যখন দেখি আম্মা আর আমার কন্যা সিনেমা হল থেকে বেরিয়েও চোখ চকচক করে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এর গল্প বলে যাচ্ছে দুজন দুজনকে!
অভিনন্দন তানিম নূর এবং তার সিনেমার সাথে সংশ্লিষ্ট সবাইকে, বিশেষ করে টেকনিক্যাল টিমকে, কষ্ট যারা বেশি করে। কিন্তু আমরা তাদের চেহারা এবং কষ্ট কোনোটাই দেখতে পাই না।
লেখক: অভিনেত্রী