বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালি সময়ের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ওয়াসিম। এই কিংবদন্তি নায়ককে হারানোর পাঁচ বছর পূর্ণ হলো আজ। ২০২১ সালের এই দিনে প্রয়াত হন ‘সিনেমার রাজপুত্র’ খ্যাত এই তারকা। সময়ের দূরত্ব তার শারীরিক অনুপস্থিতি তৈরি করলেও, তার জনপ্রিয়তা ও প্রভাব আজও একইভাবে অনুভূত হয়।
সত্তর ও আশির দশকে ফোক ফ্যান্টাসি ও অ্যাকশন ঘরানার চলচ্চিত্রে একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল ওয়াসিমের। প্রায় দেড় শতাধিক সিনেমায় অভিনয় করা এই ড্যাশিং নায়ক ছিলেন বাণিজ্যিক সিনেমার নির্ভরতার প্রতীক। তার উপস্থিতি মানেই ছিল দর্শক টানার নিশ্চয়তা।
তবে তার অভিনয় ক্যারিয়ারের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক ছিল তিন নায়িকার সঙ্গে গড়ে ওঠা অবিস্মরণীয় জুটি— অলিভিয়া, অঞ্জু ঘোষ ও শাবানা। এই তিন নায়িকার সঙ্গে তার রসায়ন শুধু জনপ্রিয়তাই পায়নি, বরং বাণিজ্যিক সাফল্যের নতুন মানদণ্ড তৈরি করেছিল।
অলিভিয়ার সঙ্গে ওয়াসিমের জুটি ছিল রোমাঞ্চ ও বাণিজ্যিক সাফল্যের প্রতীক। ‘দি রেইন’ দিয়ে শুরু করে ‘বাহাদুর’, ‘লুটেরা’, ‘লাল মেম সাহেব’ ও ‘বেদ্বীন’—একটির পর একটি হিট সিনেমা উপহার দেন তারা। দর্শকের কাছে এই জুটি ছিল এক ধরনের নিশ্চয়তা, যেখানে বিনোদন ও আকর্ষণের ঘাটতি থাকত না।
অন্যদিকে, শাবানার সঙ্গে ‘রাজ দুলারী’ চলচ্চিত্রে তাদের অভিনয় দর্শকদের গভীরভাবে স্পর্শ করে। পর্দায় তাদের আবেগঘন রসায়ন আর গান—সব মিলিয়ে সেই সময়ের দর্শকসংস্কৃতিতে আলাদা জায়গা তৈরি করে নেয়।
আর অঞ্জু ঘোষের সঙ্গে ওয়াসিমের জুটি ছিল বাণিজ্যিক সাফল্যের আরেক শক্ত ভিত। ‘সওদাগর’, ‘নরম গরম’, ‘আবেহায়াত’, ‘চন্দনদ্বীপের রাজকন্যা’, ‘পদ্মাবতী’ ও ‘রসের বাইদানী’সহ একাধিক সুপারহিট সিনেমায় তারা একসঙ্গে কাজ করে দর্শকপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছান। এই জুটির সিনেমাগুলোতে গ্রামীণ আবহ, লোকজ গল্প আর নাটকীয়তার মিশেলে তৈরি হতো এক বিশেষ আবেদন, যা তখনকার দর্শকদের কাছে ছিল ভীষণ আকর্ষণীয়।
অবশ্য এই তিন নায়িকা ছাড়াও ববিতা, কবরী, সুচরিতা, অঞ্জনা ও নূতন-এর মতো শীর্ষ নায়িকাদের সঙ্গেও অভিনয় করেছেন ওয়াসিম। তবে জনপ্রিয়তা ও ধারাবাহিক সাফল্যের বিচারে অলিভিয়া-অঞ্জু-শাবানা—এই ত্রয়ীই তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে আছে।
১৯৭২ সালে এস এম শফী-এর সঙ্গে পরিচয়ের মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রজগতে যাত্রা শুরু করেন তিনি। ‘ছন্দ হারিয়ে গেল’ সিনেমায় সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি ছোট চরিত্রে অভিনয়ও করেন। পরে মোহসিন পরিচালিত ‘রাতের পর দিন’ চলচ্চিত্রে নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে দ্রুতই জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে যান।
অভিনয়ের পাশাপাশি ‘ডব্লিউ আর প্রোডাকশন’ নামে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন ওয়াসিম। ‘হিসাব চাই’, ‘মোহন বাঁশি’, ‘নয়া তুফান’ ও ‘সীমাবদ্ধ’সহ কয়েকটি চলচ্চিত্র প্রযোজনা করলেও প্রযোজক হিসেবে তেমন সফলতা পাননি।
১৯৫০ সালের ২৩ মার্চ চাঁদপুরে জন্ম নেওয়া এই অভিনেতা ইতিহাস বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। ১৯৬৪ সালে বডি বিল্ডিংয়ে ‘মিস্টার ইস্ট পাকিস্তান’ খেতাব অর্জন করে তিনি নিজেকে আলাদা উচ্চতায় নিয়ে যান।